
শেষ আপডেট: 29 September 2022 15:10
দ্য ওয়াল ব্যুরো, জলপাইগুড়ি: একসময় অষ্টমীর রাতে নরবলি হতো। কালের নিয়মে জ্যান্ত মানুষের বদলে এখন চালের গুঁড়ো দিয়ে মানুষের প্রতিকৃতি তৈরি করে তাকে কুশ দিয়ে বলি দেওয়া হয় জলপাইগুড়ির (Jalpaiguri) বৈকুন্ঠপুর রাজ এস্টেটের দুর্গাপুজোয় (Durga Pujo 2022)। এই রাজপরিবারের পুজো এবার ৫১৩ বছরে পা দিল।
শিশু সিংহের হাত ধরে জলপাইগুড়ির বৈকন্ঠপুর রাজ এস্টেটের সূচনা হয়। কথিত আছে দুই ভাই শিশু সিংহ ও বিশু সিংহ খেলার ছলে মাটির মূর্তি গড়ে প্রথম এই দুর্গাপুজো করেন। পরবর্তীতে শিশু সিংহ জলপাইগুড়ি বৈকন্ঠপুর রাজ এস্টেটের রাজা হন। আর বিশু সিংহ কোচবিহারের রাজা হন।
রাজত্ব না থাকলেও আজও প্রতি বছর পুরনো নিয়ম মেনেই এই রাজবাড়ির দুর্গাপুজো হয়। জন্মাষ্টমীর পরের দিন রাজপরিবারে দধিকাদো উৎসব হয়। সেইদিন কাঠামো পুজো হয়। সেই দধিকাদো উৎসবের মাটি প্রতিমা গড়ার মাটির সঙ্গে মেশানো হয়। বিশাল একচালার প্রতিমা তৈরি হয়। দেবী এখানে তপ্ত কাঞ্চন বর্ণা, সোনা গলালে যে রং হয়, এখানে প্রতিমার গায়ের রঙ তেমনই।
দুর্গার সঙ্গে বাহন হিসেবে সিংহের পাশাপাশি থাকে বাঘ। লক্ষ্মী, সরস্বতী, গণেশ, কার্তিকের পাশাপাশি থাকে ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বর, মহামায়া। এছাড়াও দুর্গার দুই সখী জয়া আর বিজয়াও থাকে।
রাজবাড়ির প্রতিমার কাঠামোতেও গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য আছে। এটা অনেকটা রথের মতো দেখতে হয়। চাকা লাগানো থাকে। দশমীর দিন প্রতিমা নিরঞ্জনের সময় এই রথ টেনে নিয়ে যাওয়া হয় রাজবাড়ির পুকুরে। নিরঞ্জনের পর আবার পুকুর থেকে সেই কাঠামো তুলে এনে নাট মন্দিরে রাখা হয়। পরের বার এই কাঠামোকেই সংস্কার করে আবার তার উপরেই নতুন প্রতিমা গড়া হয়।
ষষ্ঠীর দিন জলপাইগুড়ি রাজবাড়ির দুর্গা প্রতিমার বস্ত্রদান হয়। আগে দেবীর জন্য সেই বেনারস থেকে বেনারসি শাড়ি আসত। এখন কলকাতা থেকেই শাড়ি আসে। মাঝেমধ্যে আবার অসম থেকে অসম সিল্ক আসে দুর্গার জন্য। তবে এখানকার প্রতিমা এতটাই বড় হয় যে একটি শাড়িতে কুলোয় না। তাই দুর্গাকে দুটি শাড়ি পড়াতে হয়! এই শাড়ি পরানোটা স্থানীয় মহিলাদের কাছে উৎসবের মতো একটা বিষয়।
অসমের পাল পরিবার এই রাজবাড়ির প্রতিমা তৈরি করে। বংশানুক্রমিক এটাই হয়ে আসছে। গত পাঁচশো বছর ধরে এই নিয়ম চলছে।
মহালয়ার পরের দিন ঘট বসিয়ে পুজো শুরু হয়। টানা ন'দিন ধরে এই ঘট পুজো চলে। ষষ্ঠীর দিন দেবীর চক্ষু দান করা হয়। কালিকা পুরাণ মতে জলপাইগুড়ি রাজবাড়ির পুজো হয়। এখানে দেবীকে আমিষ ভোগ দেওয়া হয়। প্রতিদিন ৫ রকমের মাছের পাশাপাশি বলি দেওয়া পাঁঠা ও পায়রার মাংস ভোগ হিসেবে দেওয়া হয়।
এই পুজোর গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম হল অর্ধ রাত্রির পুজো। অষ্টমীর রাতে এই বিশেষ নিয়মের পুজো হয়। অতীতে এই অর্ধ রাত্রি পুজোর সময়ই নাকি নরবলি হতো। এই পুজোর সময় রাজ পরিবারের সদস্য ছাড়া আর কাউকে প্রবেশ করতে দেওয়া হয় না। নাটমন্দির ওইসময় কাপড় দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়।
নবমীর দিন নবরাত্রির পুজো হয়। পাঁঠা বলিও হয়। সেই সঙ্গে দেবীকে পোলাও কিংবা ফ্রায়েড রাইসের সঙ্গে ৫ রকমের মাছ ও বলির মাংস দিয়ে ভোগ দেওয়া হয়।
দশমীর দিন দেবীকে পান্তা ভাতের সাথে ইলিশ মাছ ভাজা, ইলিশ মুড়ো দিয়ে তৈরী কচু শাক, পুঁটি মাছ ভাজা, শাপলা ও পাঁচ রকমের মাছ দিয়ে ভোগ দেওয়া হয়। এরপর হয় বিসর্জন। বিসর্জনের নিয়মকানুনের সময় রাজ পরিবারের কেউ উপস্থিত থাকেন না। এরপর শুরু হয় দেবীর নবরত্নের গহনা সহ অন্যান্য সোনা ও রুপোর গহনা খুলে নেওয়া। শুরু হয় সিঁদুর খেলা। ঠিক বেলা ১২ টার সময় বন্দুকের গুলি ছুড়ে প্রতিমা নিরঞ্জনের শোভাযাত্রা শুরু হয়। রাজবাড়ির সদস্যরা ধ্বজা, গদা, অস্ত্র নিয়ে শোভাযাত্রায় অংশ গ্রহন করে।
পরিবারের স্বপ্না বসু দীর্ঘদিন রাজবাড়ির পুজোর দায়িত্ব সামলাতেন। তবে তিনি মারা যাওয়ার পর গত পাঁচ বছর দুর্গাপুজোয় পরিবারের কোনও মহিলা সদস্য ছিলেন না। এবার অবশ্য পরিবারের বধূ লিন্ডা হাজির থেকে বসু সেই অভাব ঘুচিয়ে দেবেন।