দ্য ওয়াল ব্যুরো: ২০০৪ সালে বের হয়েছিলেন বাড়ি থেকে। সাইকেলে বিশ্ব ভ্রমণ সেরে ফেরার কথা ছিল এই বছরের ডিসেম্বরে। কিন্তু তা সম্ভব হবে না। আপাতত মনে হচ্ছে ফিরতে ফিরতে আগামী বছরের মে মাস হয়ে যাবে। দেশে দেশে করোনা সংক্রমণ আর তার জেরে লকডাউনের ফলে বদলে গিয়েছে তাঁর সূচি। নিউজিলন্যান্ড থেকে এমনটাই জানিয়েছেন সুন্দরবনের ভূমিপুত্র সোমেন দেবনাথ। এখন তিনি রয়েছেন অকল্যান্ডে।
বিশ্ব ভ্রমণ আর এইডস নিয়ে সচেতনতা তৈরি এই লক্ষ্যেই সাইকেলের প্যাডেলে পা রাখেন সোমেন। দক্ষিণ ২৪ পরগণা জেলার প্রত্যন্ত সুন্দরবনের বাসন্তী ব্লকের যুবক সোমেন দেবনাথ। ২০০৪ সালে সাইকেলে যাত্রা শুরু করে এখনও পর্যন্ত অতিক্রম করেছেন পৃথিবীর ১৫৭টি দেশ। সাইকেলে চেপে পিছনে ফেলে এসেছেন প্রায় ১,৭১,৪৫০ কিলোমিটারেরও বেশি পথ। এখন আর মাত্র ৩৪টি দেশে যাওয়া বাকি রয়েছে।
আরও পড়ুন
সোমেনর এই বিশ্ব ভ্রমণের পিছনে একটা কারণ আছে। তাঁর বয়স যখন সবে মাত্র ১৪, তখন এইডস রোগের ভয়াবহতা নিয়ে খবরের কাগজে একটি প্রতিবেদন পড়ে জানতে পারেন ভবিষতে এই রোগ ক্যান্সারের থেকেও মারাত্মক আকার ধারণ করবে। কলকাতা থেকে বহু দূরে প্রত্যন্ত সুন্দরবনের বাসন্তীতে বসে অনুভব করেন এই রোগ সম্বন্ধে সচেতনতার অভাব রয়েছে গোটা বিশ্বেই। ওই প্রতিবেদনে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের সামনের বাড়ি থেকে তাড়িত, সহায়সম্বলহীন এইডস রোগীর জীবনের কাহিনি ছুঁয়ে গিয়েছিল সোমেনকে। তখনই ঠিক করেন এইডস নিয়ে মানুষকে সচেতন করবেন তিনি। প্রস্তুতি শুরু হয়। বছর খানেকের মধ্যে রাজ্য সরকারের এইডস ট্রেনিং সংস্থা, ওয়েস্ট বেঙ্গল সোসাইটি ফর এইডস কন্ট্রোল থেকে প্রশিক্ষণ নেন। তারপর নিজের স্কুলে এই রোগের বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে উদ্যোগ শুরু করেন। এরপর প্রত্যন্ত সুন্দরবনের বাসন্তীতে নিজের গ্রামের মানুষকে এইডস নিয়ে শিক্ষিত করে তোলেন। স্কুলের পাঠ শেষ করে কলেজে গিয়েও চালান একই কাজ।

কলেজে জুওলজি আর পাশাপাশি ফাইন আর্টসের ডিগ্রি শেষে তিন মাসের প্রস্তুতি। তারপর ২০০৪ সালের ২৭ মে পরিবারকেবিদায় জানিয়ে সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়েন এইডস নিয়ে প্রচারে। প্রথম দু'বছর ঘোরেন গোটা ভারত। দেখা করেন দেশের ২৫টি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ও ২৬ জন রাজ্যপালের সঙ্গে। ভারতের বহু প্রত্যন্ত প্রান্তেও গড়িয়েছে তার সাইকেলের চাকা।
ভারত ভ্রমণ শেষ করে বেড়িয়ে পড়েন বিশ্ব-পথে। দিল্লির ইন্ডিয়া গেটে তাঁকে ফ্ল্যাগ অফ করেছিলেন তৎকালীন বিদেশমন্ত্রী প্রণব মুখোপাধ্যায়।প্রতিবেশী রাষ্ট্র পাকিস্তান পার হয়ে আফগানিস্তানে ঢুকতেই বিপত্তি। কাবুল শহরের অদূরে তালিবানের হাতে আটক হন সোমেন। প্রথম কয়েকটা দিন অন্ধকার ঘরে, পাশাপাশি চলে অকথ্য শারীরিক ও মানসিক অত্যাচার। পরে ঘানা থেকে তিনি জানিয়েছিলেন, "চার দিন না খেতে দিয়ে আটকে রাখা হয়েছিল। শুধু মারধোর করত। তবে সোমেনের কথায় "আমি একদিনও হতাশ হয়নি, জেদ ছিল হার মানব না। বিশ্ব ভ্রমণের যে স্বপ্ন নিয়ে সুন্দরবনের বাসন্তী ছেড়েছিলাম তা বাস্তব করতে হবে যে। সব অত্যাচার সহ্য করেছিলাম। ধীরে ধীরে ওরা বুঝল আমার কোনও অসৎ উদ্দেশ্য নেই। তখন আমাকে রান্নার কাজে লাগালো। ১১ দিন ওদের রান্নার কাজ করলাম। আমার হাতের সুন্দরবনের রান্না খেয়ে মন গলল। ২৪ দিনের মাথায় কাটে বন্দিদশা।"

দীর্ঘ পথে সোমেনের ডাকাতের হাতে নিঃস্ব হওয়ার মতো খারাপ অভিজ্ঞতা যেমন হয়েছে, তেমনি অনেক ভাল অভিজ্ঞতাও রয়েছে। স্বাচ্ছন্দ্য, প্রাচুর্যের মাঝে দিন কাটানোর পাশাপাশি আফ্রিকায় আদিবাসীদের সঙ্গে চিতা, গণ্ডারের গায়ে গা লাগিয়ে দিন কাটানোর অভিজ্ঞতাও হয়েছে।সোমেন দেবনাথ জানিয়েছেন, এখনও পর্যন্ত ২৬টি দেশের প্রেসিডেন্ট, ৫৬টি দেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের পাশাপাশি ১০৫টি দেশে ভারতীয় হাই-কমিশনারের সঙ্গে দেখা করেছেন তিনি। দেশে দেশে এইডস-এর পাশাপাশি ভারতীয় সংস্কৃতির প্রচারেও সেমিনার করেন সোমেন। কোনও রকম স্পনশরশিপ ছাড়া শুধুমাত্র ব্যাক্তিগত উদ্যোগেই দীর্ঘ এতটা পথ পাড়ি দিয়েছেন তিনি।
পরিকল্পনা ছিল ২০২০ সালের মধ্যে বিশ্বের ১৯১টি দেশ অতিক্রম করে ২ লক্ষকিলোমিটার পথ সাইকেলে পাড়ি দেবেন। কিন্তু করোনার তাণ্ডবে দেশে দেশে লকডাউন চলায় সেই পরিকল্পনা আরও প্রায় চার মাস পিছিয়ে গেছে। তিনি জানিয়েছেন, সবকিছু ঠিকঠাক চললে ২০২১-এর মে মাস নাগাদ ফিরে আসা সম্ভব হবে।