দ্য ওয়াল ব্যুরো: মা দশ বছর আগেই পুকুরে ডুবে মারা গিয়েছেন, বাবার মৃত্যু হয়েছে সাত মাস। তবুও বেসাহারা হয়ে যায়নি তিন অনাথ নাবালক। কারণ, গ্রামবাসীরাই এখন তাদের অভিভাবক। পড়শিদের স্নেহ-যত্নে বেড়ে উঠছে নাবালক ভাই-বোন। স্বার্থের দুনিয়ায় এই ভাবেই মানবিকতার নজির গড়েছেন পুরুলিয়ার সাঁতুড়ি ব্লকের কুলাই গ্রামের বাসিন্দারা।
তিন ভাইবোনের মধ্যে ষোল বছরের সন্দীপ সবার বড়। তার থেকে একবছরের ছোট রঞ্জিত এবার মাধ্যমিক দেবে। দুই ভাইয়ের থেকে সবচেয়ে ছোট বারো বছরের প্রিয়াঙ্কা, ক্লাস সেভেনে পড়ে। বাড়ির ভগ্নপ্রায় দশা, তাই ঝুঁকি না নিয়ে তিন ভাই-বোনকে ক্লাব ঘরে ঠাঁই দিয়েছে বাসিন্দারা। তবে, কিশোরী মেয়ের প্রিয়াঙ্কার নিরাপত্তার দিকে খেয়াল রেখে প্রতিরাতে নিজেদের বাড়িতেই শোবার ব্যবস্থা করেন প্রতিবেশীরা।
তাঁদের বক্তব্য, ''বাপ-মা মরা মেয়ে, দুই নাবালক ভাইয়ের সঙ্গে একা থাকবে কি করে ? দিনকাল তো আর ভালো নেই, তাই ঝুঁকিনিনা। সঙ্গেই রাখি। ''
স্থানীয় সূত্রে খবর, পুরুলিয়ার আশেপাশে এই তিন ভাই-বোনের কোনও আত্মীয় স্বজন নেই। তাই, বাবার মৃত্যুর পর গ্রামবাসীরা তিন অনাথের আত্মীয় হয়ে ওঠেন। রেশনকার্ড রয়েছে তাদের, প্রতিমাসে ১৫ কেজি করে চাল তাই বরাদ্দ। তবে সন্দীপ ও রঞ্জিতের আঁধারকার্ড থাকলেও প্রিয়াঙ্কার এখনও তা হয়নি।
সাঁতুড়ি থানার পুলিশ অবশ্য কয়েক হাজার টাকা দিয়েছে তাদের ভরনপোশনের জন্য। যদিও গ্রামবাসীরা তাদের ঘর সারানোর জন্য স্থানীয় ব্লক অফিসে আবেদন করে ছিলেন, কিন্তু প্রতিশ্রুতি ছাড়া কিছুই মেলেনি। তাই ওদের মাথার ওপর ছাদ দেওয়ার জন্য ক্লাবঘরটিকে খুলে দেওয়া হয়। কিন্তু এভাবে কতদিন আর এই তিন নাবালক কষ্ট করবে? প্রশাসনের কাছে উত্তর চান গ্রামের মানুষ।
তারা চান এই তিন নাবালকের দায়িত্ব প্রশাসনও কিছুটা নিক। খাওয়া-দাওয়ার তো গ্রামের মানুষই দেয়। কারণ সাত মাস ধরে এই তিন অনাথ ভাইবোনের খাওয়া-দাওয়া বাসিন্দারাই দেন। ভালো-মন্দ যা কিছু রান্না হলে, তাদের জন্যও তুলে রাখা হয়। এদিকে, তিন ভাই-বোনের পড়াশোনা যাতে থমকে না যায়, তার জন্য গ্রামের এক শিক্ষক বিনা পয়সায় পড়িয়ে যাচ্ছেন।
গ্রামবাসীদের বক্তব্য, ''নাবালক সন্দীপ এখনও ছোট। ষোল বছর বয়স হলেও তার দুনিয়া সম্পর্কে জ্ঞান কম। তাই কিভাবেই সে ছোট দুই ভাই-বোনের দায়িত্ব নেবে? আগে সে বড় হোক। এখন আমরা আছি। আমরা যখন খেতে পাচ্ছি, তখন তাদেরও দুমুঠো জোগাব।''
উল্লেখ্য, প্রায় দশ বছর আগে পুকুরে স্নান করতে নেমে তলিয়ে গিয়ে মৃত্যু হয় তিন সন্তানের মা সুনয়না সাওয়ের। তখন সন্তানেরা খুবই ছোট। এরপর সন্তানদের দায়িত্ব এসে পড়ে বাবা অদ্বৈত সাওয়ের ওপর। মাকে হারিয়ে বাবার ছায়াতেই মানুষ হচ্ছিল তিন ছেলে-মেয়ে। কিন্তু ছন্দপতন হয় গত জুন মাসে। বাড়ি তৈরির সময় দেয়াল চাপা পড়ে মৃত্যু হয় বাবা অদ্বৈতের। তখন থেকে কুলাই গ্রামের মানুষজনই ওদের অভিভাবক হয়ে দাঁড়ান।
তবে, একেবারে প্রান্তিক সীমায় বসবাস করার পেশায় কৃষিজীবী ও দিনমজুর মানুষগুলো অভিভাবক হিসাবে তিন অনাথের পাশেই রয়েছেন। কিন্তু তারা চান প্রশাসনও এই তিন ভাইবোনের পাশে দাঁড়াক। মানুষ করতে সাহায্য করুক।