দ্য ওয়াল ব্যুরো: এ যেন মহানাটকীয় মঙ্গলবার!
এদিন গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থান কী ছিল কে জানে! গঙ্গার পশ্চিম পাড়ে হইহই কাণ্ড ঘটে গেল।
মঙ্গলবার বেলা গড়াতেই মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে তাঁর ইস্তফার চিঠি পাঠিয়ে দিয়েছিলেন লক্ষ্মীরতন শুক্ল। সে খবর নিয়ে যখন হাওড়া আন্দোলিত তখন আবার নবান্নে রাজ্য মন্ত্রিসভার বৈঠক পূর্ব নির্ধারিত ছিল। দেখা যায়, সেই বৈঠকে ফের গরহাজির বনমন্ত্রী রাজীব বন্দ্যোপাধ্যায়। আবার সে সবের মধ্যেই সংবাদমাধ্যমের সামনে দলের এক শ্রেণির নেতাকে নিয়ে মুখ খোলেন বালির বিধায়ক বৈশালী ডালমিয়া।
প্রয়াত বিসিসিআই প্রেসিডেন্ট জগমোহন ডালমিয়ার মেয়ে বলেন, "আমরাও ভাল জায়গায় কাজ করে এসেছি। বানতলায় লেদার কমপ্লেক্স বানিয়েছিলেন আমার বাবা, কলকাতা বিমানবন্দরের রানওয়ে নির্মাণে কাজ করেছি। দলে এসে আমরাও মর্যাদা প্রত্যাশা করি। কিন্তু মুষ্টিমেয় কিছু নেতা দলটাকে উইপোকার মতো কুরে খাচ্ছেন। ভিতর থেকে নষ্ট করে দিচ্ছেন। নতুনদের উপর অত্যাচার করছেন। এঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে বড় ক্ষতি হয়ে যাবে।"
ত্র্যহস্পর্শ বইকি! তৃণমূলের এই তিন নেতা-নেত্রীই বয়সে তরুণ। নবীন প্রজন্মের প্রতিনিধি। বড় কথা হল, রাজ্য রাজনীতিতে এই তিনজনেরই ভাবমূর্তি অনেকের তুলনায় বেশ উজ্জ্বল।
ফলে এ ঘটনার পরই অনিবার্য ভাবে যে প্রশ্নগুলি উঠছে, তা হল এঁরা কি একযোগে অন্যপথে! দুই, ভোটের আগে সামগ্রিক ভাবে এতে শাসকদলের মনোবলে কী ধাক্কা লাগতে পারে? এবং তিন, হাওড়ায় কী হবে?
এই তিন জনের মধ্যে রাজীব বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক উচ্চতা তুলনায় বেশি। রাজীব প্রথমে রাজ্য মন্ত্রিসভায় সেচমন্ত্রী ছিলেন। একাধিক জেলার পর্যবেক্ষকও ছিলেন। লোকসভা ভোটের পর কালিয়াগঞ্জের উপনির্বাচনে তৃণমূলের জয়ে তাঁর ভূমিকা রয়েছে বলেই অনেকের মত। এবং তিনি যে দলের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনায় যারপরনাই অখুশি সে কথা প্রকারান্তরে সম্প্রতি একাধিকবার জানিয়েছেন তিনি।
বৈশালীও তাঁর অসন্তোষের কথা আগে একাধিকার জানিয়েছেন। আর লক্ষ্মীরতনের তৃণমূল ছাড়াটা হাওড়ায় দলের সংগঠনের উপর ধাক্কা বলেই মনে করা হচ্ছে। কারণ, জেলা সভাপতি ছিলেন তিনি।
বস্তুত এঁরা তিন জনই বিজেপিতে যোগ দিতে পারেন বলে রাজ্য রাজনীতিতে আলোচনা রয়েছে। এঁদের দলে নেওয়ার ব্যাপারে দিলীপ ঘোষ, শুভেন্দু অধিকারীদের আগ্রহ রয়েছে প্রবল।
তৃণমূলের প্রতিক্রিয়া
লক্ষ্মীরতন ইস্তফার দেওয়ার পর এদিন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, "কেউ পদত্যাগ করতেই পারে। আপনাদের মুশকিল হল, সবটাই নেগেটিভ ভাবে দেখেন।" আর দলের মুখপাত্র কুণাল ঘোষ বলেন, "জেলা সভাপতি ছিলেন লক্ষ্ণীরতন। দল তাঁকে গুরুত্ব দিয়েছিল। এঁরা তৃণমূল ছাড়লে কোনও ক্ষতি হবে না। তবে এও ঠিক যে, ভোটের আগে একজন সেনাপতির চলে যাওয়া দায়িত্বজ্ঞানহীনতারই পরিচয় দেয়।"
হাওড়ায় কী হবে!
এদিন লক্ষ্ণীরতন তৃণমূল ছাড়ার পরে সমবায় মন্ত্রী তথা প্রাক্তন জেলা সভাপতি অরূপ রায় বলেন, "ওঁর সঙ্গে আমার ভাল সম্পর্ক ছিল। লক্ষ্মীরতন ভাল ছেলে। কেন এই সিদ্ধান্ত নিল বলতে পারব না।" তবে এতে হাওড়ায় তৃণমূলের সংগঠনে কোনও বড় ক্ষতি হবে না বলেই দাবি করেন তিনি।
তবে অনেকের মতে, হাওড়া তৃণমূলের তিন উজ্জ্বল মুখ যখন একইসঙ্গে অসন্তুষ্ট, তখন অরূপ রায়ও দায় এড়াতে পারেন কি! দীর্ঘ দিন জেলায় তৃণমূল সভাপতি ছিলেন তিনি। এ ঘটনা থেকে মনে হতেই পারে যে তাঁর প্রতিও অনাস্থা রয়েছে। অরূপ রায়কে সরিয়ে লক্ষ্মীরতন শুক্লকে গত জুলাইয়ে জেলার সভাপতি করেছিল তৃণমূল। কিন্তু অরূপ রায় কোনও সহযোগিতা যে করছিলেন না সেই অভিযোগ দলের মধ্যে থেকেই উঠছিল। আর সম্প্রতি হাওড়ার সাংসদ প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায় আবার অব্যবস্থার দায় চাপাচ্ছিলেন লক্ষ্মীর উপর। সেই সঙ্গে বলেছিলেন, "হাওড়ায় দলটা কেমন যেন হয়ে গেল।"
ভোটের আগে এ কি শুভ লক্ষণ! কে জানে!