দ্য ওয়াল ব্যুরো: রবিবার রাত। তারপর সোমবার রাত। পরপর দু’দিন হাওড়া কর্পোরেশনের প্রশাসকমণ্ডলীর প্রধান সুজয় চক্রবর্তী বেশি রাতে রাস্তায় নামলেন। প্রখ্যাত শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ সুজয়বাবু পুরসভার আধিকারিকদের নিয়ে সরেজমিনে দেখলেন, পঞ্চাননতলা রোডের জমা জল সরিয়ে কী ভাবে দ্রুত রাস্তা সংস্কারের কাজ সম্পন্ন করা যায়। কমিশনার, প্রধান ইঞ্জিনিয়ারদের সঙ্গে কথা বলে অকুস্থলে দাঁড়িয়েই নিলেন একাধিক কৌশলগত সিদ্ধান্ত। উদ্দেশ্য একটাই, কাজটা শেষ করতে হবে দ্রুত। যুদ্ধকালীন তৎপরতায়।
রাতেই কেন বের হলেন ডাক্তারবাবু?
দ্য ওয়াল-কে সুজয় চক্রবর্তী বলেন, আমরা যাওয়া মানে তিন-চারটে গাড়ি যাওয়া। ওখানে দাঁড়িয়ে গোটা ব্যাপারটা দেখে, কথা বলে সিদ্ধান্ত নিতে গেলে ব্যস্ত রাস্তায় যানজট হবে। তাতে সমস্যায় পড়বেন মানুষই। তার চেয়ে রাতে বের হলে কাজের কাজটা হয়! ডাক্তারবাবু যেন বুঝিয়ে দিতে চাইলেন, লোক দেখানো তাঁর উদ্দেশ্য নয়। কাজটাই আসল।
যোগীর পুলিশ আটকাতে পারল না তৃণমূলকে, লখিমপুরে পৌঁছে গেলেন দোলা সেনরা
প্রশাসনের দায়িত্বে থাকা জনপ্রতিনিধি, আমলা, পুলিশ- সকলের ক্ষেত্রেই ‘নাইট ভিজিট’ খুব একটা নতুন কিছু নয়। কিন্তু সুজয়বাবুর ক্ষেত্রে এই পদক্ষেপকে বড় ফ্রেমেই ধরতে চাইছে রাজনৈতিক মহল। সেটা কী?
উনিশের লোকসভা ভোটের পরে তৃণমূল যখন ডুবন্ত জাহাজকে টেনে তুলতে প্রশান্ত কিশোরকে ক্যাপ্টেন করে সেই জাহাজের ডেকে বসাল তখন দেখা গিয়েছিল, মানুষের ক্ষোভ সামাল দিতে পিকে 'দিদিকে বলো' কর্মসূচি চালু করেছিলেন। বিধায়ক, সাংসদ, জনপ্রতিনিধিদের পাঠিয়েছিলেন, গ্রামে, পাড়ায়, মহল্লায়। তার যে ফল মিলেছে তা একুশের ভোটেই স্পষ্ট। অনেকের মতে, প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা তৈরি হলে নতুন মুখকে যদি মানুষ দেখেন মাঠে-ময়দানে নেমে কাজ করছেন, তাহলে জনমানসে বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি হয়। হতে পারে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসার ধন্বন্তরি প্রয়াত কেদারনাথ চক্রবর্তীর চিকিৎসক-পুত্রও সেই দেওয়াল লিখন পড়ে ফেলেছেন।
শুধু তো রাস্তা সংস্কার নয়। হাওড়ার অনেক ওয়ার্ড এখনও জলমগ্ন। দ্য ওয়াল-এর তরফে তাঁকে সে ব্যাপারেও জিজ্ঞেস করা হয়। তিনি বলেন, হাওড়া কর্পোরেশনের ৭ ও ৮ নম্বর ওয়ার্ড—বেলগাছিয়া অঞ্চলে জল জমে রয়েছে। তা নামানোর জন্য অত্যাধুনিক যন্ত্র ব্যবহার করা হচ্ছে। গত পরশু যেখানে হাঁটু সমান জল ছিল, আজ সেখানে অনেকটাই নেমেছে। পুজোর আগে যাতে তা পুরোপুরি নামানো যায়, কর্পোরেশন সেই চেষ্টা করছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
শুধু তৃণমূলের আমল বলে নয়। অতীতেও হাওড়া শহরের অপরিচ্ছন্নতা, বেহাল নিকাশি ব্যবস্থা, ছাদের গায়ে ছাদ লেগে যাওয়া বহুতল, রাস্তাঘাটের বেহাল দশা নিয়ে নাগরিক ক্ষোভ ছিলই। এদিন সুজয়বাবুও জানিয়েছেন, হাওড়া শহরের গড়ে ওঠার ক্ষেত্রে কোনও সুষ্ঠু পরিকল্পনা ছিল না। গলদটা গোড়াতেই। এই শহর নিউটাউনের মতো সুসংগঠিত পরিকল্পনা করে গড়ে ওঠেনি। তবে তাঁর স্পষ্ট কথা, এগুলো থাকবে। এগুলোকে নিয়েই আমাদের চলতে হবে। সেই চলাটা কী ভাবে মসৃণ করা যায়, নাগরিকরা কী ভাবে পরিষেবা পান সেটাই আমাদের কাছে চ্যালেঞ্জ।
হাওড়ার প্রাক্তন মেয়র ডাক্তার রথীন চক্রবর্তী আগেই তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দিয়েছিলেন। সুজয়বাবু সেই পরিবারের সদস্য হলেও তাঁর আস্থা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপরেই। সুজয় চক্রবর্তীর এই দৌত্য দেখে অনেকেই বলছেন, দিদি বলেছেন উপনির্বাচন মিটলেই আমাদের ভোট আমরা করিয়ে নেব। ইঙ্গিত স্পষ্ট, দুয়ারে পুর ভোট। কৌতূহলীদের বক্তব্য, হাওড়ায় যে তৃণমূলের বোর্ড হবে তা একপ্রকার নিশ্চিত। সুজয়বাবু এখন থেকেই সেই নির্বাচনের পরে আরও বড় দায়িত্বের রিহার্সাল শুরু করে দিয়েছেন। যদিও ডাক্তারবাবু বিনয়ের সঙ্গেই জানাচ্ছেন, “মুখ্যমন্ত্রী আমায় যে সম্মান দিয়েছেন তার জন্য আমি কৃতজ্ঞ। ওঁর সম্মান রাখাই আমার একমাত্র কাজ। বাকিটা……।”
পড়ুন দ্য ওয়ালের সাহিত্য পত্রিকা 'সুখপাঠ'