
শেষ আপডেট: 3 May 2022 08:27
নয়-নয় করে এবার পঁচিশে পা দিলেন উদয়ন মাস্টার! না, বয়সের হিসেব নয়, নামাজ পড়ার বছরের হিসেব। রেড রোডের নামাজে তাঁকে সিকি শতক ধরেই দেখতে পাচ্ছেন সবাই (Harmony)। ধর্মীয় ভাবে নয় অবশ্য। কারণ জন্মসূত্রে পাওয়া ধর্ম অনুযায়ী তিনি হিন্দু। পরবর্তীকালে যে ধর্ম বদল করে মুসলিম হয়েছেন, তাও নয়। কিন্তু বাংলার তথা সারা দেশের এক অন্যতম খুশির উৎসব ইদ-উল-ফিতরে সামিল হয়ে হাজারো লোকের সঙ্গে নামাজ পড়তে ধর্ম কখনওই বাধা হয়নি দুর্গাপুরের বাসিন্দা উদয়ন মৈত্রর।
শুধু ইদের দিনের নামাজ নয়। প্রতিবছর রমজান মাসে নিয়ম করে রোজাও পালন করেন এই অধ্যাপক। এবছরও সারা মাস ধরে রোজা রেখে, গতকাল সোমবারই দুর্গাপুরের বাড়ি থেকে কলকাতায় চলে আসেন তিনি। পেশায় অধ্যাপক উদয়ন দুর্গাপুরের ইনস্টিটিউশন অফ সায়েন্সের টেকনোলোজি অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট বিভাগে পড়ান।
উদয়নের নিচু ক্লাসের পড়াশোনা দুর্গাপুরের সেন্ট জেভিয়ার্স স্কুলে। পরে কলকাতায় সেন্ট জেভিয়ার্স স্কুল ও কলেজে পড়ার সূত্রে বহু বছর কাটিয়েছেন হেস্টিংস এলাকায়। তার পরে এখন ফের দুর্গাপুরে ফিরেছেন পেশার সূত্রে।
উত্তর মিলল তাঁর কথাতেই। ৪৫ বছরের উদয়ন বললেন, 'সেন্ট জেভিয়ার্স স্কুল, কলেজ এবং হেস্টিংসের মিশ্র বসত এলাকায় বেড়ে ওঠার সুবাদেই আমার মধ্যে অবচেতনেই সব ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধা, কৌতূহল তৈরি হয়েছিল। একটু বড় হয়ে উপলব্ধি করেছি, সম্প্রীতি, ঐক্য, রক্ষায় বড় ভূমিকা নিতে পারে ধর্মীয় উৎসবে অংশগ্রহণ। আমি তাই বড় দিনে গির্জার প্রার্থনা সভা, ইদের নমাজ, দুর্গাপুজোর অষ্টমীর অঞ্জলি জমায়েত, সব কিছুতেই আছি।'
উদয়ন আরও জানান, এই ইদ পালনের জন্য তাঁকে এবং তাঁর পরিবারের সদস্যদের কম গঞ্জনা সইতে হয়নি। এখনও চলছে সে সব। তাঁর কথায়, 'কেউ কেউ আমার স্ত্রীকে এমন কথাও বলেছে, ভাল করে খোঁজ নাও। বিয়ের আগে নিশ্চয়ই ধর্ম গোপন করেছিল।'

যদিও উদয়নের স্ত্রী শুভশ্রী এসব কথা এক কান দিয়ে শুনে আর এক কান দিয়ে বের করে দেন। সংস্কৃত ভাষায় পিএইচডি করেছেন তিনি। তিনিও বোঝেন সর্বধর্মসহিষ্ণুতার মর্ম। তাই স্বামীকে বরং ভরসা দেন, ভালবাসা, ভাললাগার সম্পর্কগুলিকে আগলে আগলে চলার আশ্বাস দেন। আর বাবা-মার প্রশ্রয় তো সেই ছোট থেকেই পেয়ে এসেছেন উদয়ন। মা-বাবাই তাঁকে অন্যভাবে ভাবতে শিখিয়েছেন (Harmony)।
তাই আজ রেড রোডের প্রার্থনা শেষে উদয়ন বলছিলেন, 'এতদিন মা-ই তো ইদের আগে নতুন পাজামা পাঞ্জাবি কিনে দিতেন, নিজে ইস্ত্রি করে দিতেন। এখন বয়সের ভারে পারেন না।' শুধু তাই নয়, বছর দু'তিন হল, আসানসোল দুর্গাপুর পুলিশ কমিশনারেটের আধিকারিক মহম্মদ মইনুল হক উদয়নকে ইদের পাজামা-পাঞ্জাবি উপহার দিয়ে আসছেন।
সংখ্যালঘুদের উৎসব-অনুষ্ঠানের কমিটিগুলিতেও সসম্মানে আছেন উদয়ন। দুর্গাপুর বা কলকাতা-- সর্বত্রই তাঁকে সম্মান করেন, শ্রদ্ধা করেন বহু মানুষ। পার্কসার্কাস ময়দানে রাজ্য সরকার আয়োজিত মিলন মেলারও অন্যতম মুখ তিনি। হজ কমিটির স্বেচ্ছাসেবকের তালিকাতেও আছে তাঁর নাম।
উদয়নের কথায়, 'ধর্মের আসল পরিচয় আচরণে, সহিষ্ণুতায়। বিভেদে বা বিদ্বেষে নয়। তাই দুটি বা তিনটি ধর্মকেও এভাবেই নিজের মধ্যে বয়ে বেড়াতে পারে যে কোনও মানুষ।'
হীরকরাজার হুকুমদারীর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো উদয়ন পণ্ডিতকে সেই কবে পর্দায় জীবন্ত করে তুলেছিলেন সত্যজিৎ রায়। আজ সেই উদয়ন মাস্টারই যেন দুর্গাপুরের ব্রাহ্মণ সন্তান উদয়ন মৈত্রর উদার আচরণে ছাপ ফেলে যান নিত্য। মাস্টারমশাইয়ের তো এমনই হওয়ার কথা! ধর্মীয় গোঁড়ামি, ধর্মান্ধতা, অসহিষ্ণুতা, আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে অভিন্ন স্রোতের কথাই তো বলবেন তিনি! এই তো তাঁর নীরব ও শান্তির প্রতিবাদ (Harmony)!

বস্তুত, ঘৃণা-বিদ্বেষের মাঝে ধর্মীয় সহিষ্ণুতা, সম্প্রীতি রক্ষার দৃষ্টান্ত চারপাশে নেহাত কম নয়। তবে সেই আয়োজনে লক্ষণীয়ভাবে, সংখ্যালঘুরাই সংখ্যাগুরু। উদয়ন মাস্টারের মতো মানুষেরা সেখানে বরং এখনও সংখ্যালঘু। তাই উদয়নের এই নামাজ পড়ার রজত জয়ন্তী যেন আরও বেশি উজ্জ্বল হয়ে ওঠে এ অশান্ত সময়ে। উদয়ন বলছেন, 'সময়ই মানুষকে বুঝতে শেখায়, এত বড় ও সুন্দর পৃথিবীতে ধর্মের মতো বিষয় নিয়ে অশান্তি নিতান্তই ছেলেমানুষি।'