
শেষ আপডেট: 26 April 2022 18:59
সুকমল শীল
‘জয় হনুমান জ্ঞান গুন সাগর, জয় কপীস তিহুঁ লোক উজাগর’-এর- মতো চল্লিশটি চৌপাই বা স্তোত্র এখন কণ্ঠস্থ বহু বাঙালির। বলাই যায়, পবনপুত্রের ভক্তিরসে মজেছে আমবাঙালি। এবং রামের একনিষ্ঠ সেবক বানর দেবতার জনপ্রিয়তাও দিন দিন বাড়ছে। যেকারণে লক্ষ্মীর পাঁচালীর থেকেও শহরে বিক্রি বেড়েছে অবধি ভাষার বাংলা হনুমান চালিশার। মেয়েদের ব্রতকথা, বিশুদ্ধ নিত্যকর্ম পদ্ধতি, বারোমাসের পাঁচালীর মতো বাঙালির অতি পরিচিত বইগুলিকেও বিক্রিতে ছাপিয়ে গিয়েছে তুলসীদাসের হনুমান চালিসা।

সম্প্রতি হনুমান চালিশা নিয়ে বিজেপি ও শিবসেনার দ্বন্দ্ব প্রকট। মহারাষ্ট্র ও কর্ণাটকে হনুমান চালিশা নিয়ে বিতর্ক ক্রমেই বাড়ছে। বিজেপির সঙ্গে ‘সঠিক হিন্দুত্ব’ নিয়েও বিবাদ লেগেছে শিবসেনার। এসবের মধ্যে এরাজ্যেও কদর বাড়ছে হনুমান চালিশার। তবে কলকাতার হনুমানভক্তদের মধ্যে সম্প্রদায়গত ধর্মচেতনার চেয়ে ভক্তিভাবই বিক্রির মূল কারণ বলে মনে করছেন কলেজস্ট্রিটের বিক্রেতারা।
মঙ্গলবার কলকাতার কয়েকটি বড় ধর্মগ্রন্থের দোকান এবং প্রকাশনা সংস্থায় খোঁজ নিয়ে জানা গেল, বিভিন্ন চলতি ধর্মগ্রন্থের মধ্যে হনুমান চালিশার চাহিদা বাড়ছে। ছাপা হচ্ছে বিভিন্নভাবে। তবে বাংলা অর্থ–সহ সচিত্র বইয়ের চাহিদাই বেশি। সবথেকে কমদামের ছোট বই ছাপায় গীতা প্রেস। শিয়ালদা স্টেশনের গীতা প্রেসের দোকানি জানালেন, ছোট বইটি তিন টাকা, বড় সাত টাকা। বিক্রি ভালোই। ছোট হনুমান চালিশাই এপর্যন্ত ৭ লক্ষ ৯৫ হাজার কপি ছাপা হয়েছে।

বইপাড়ার গোপাল বুক কনসার্নের দেবেশ সাহা বললেন, ‘লক্ষ্মীর পাঁচালী–সহ অন্য বাঙালী পুজো–পাঠের বইয়ের তুলনায় বিক্রি বেশি হনুমান চালিশার। দিনে চার–পাঁচটা হনুমান চালিশা বিক্রি হয়। সেখানে লক্ষ্মীর পাঁচালীর বিক্রি একটা–দুটো। সবারই ব্যস্ততা বাড়ছে। তাই বৃহস্পতিবার উপোস করে লক্ষ্মীর পাঁচালী পড়ার চল অনেকটাই কমছে। হনুমান চালিশা পাঠ করতে সময় কম লাগে। যে কোনও সময়েই পাঠ করা যায়।’ দেবেশ আরও বললেন, ‘শুধু হনুমান চালিশা নয়, বিক্রি বেড়েছে হনুমানের ছবিরও। পঞ্চমুখী পবনপুত্রের ছবির বিক্রি বেশ বেড়েছে।’
প্রেসিডেন্সি পাবলিকেশন মূলত ধর্মগ্রন্থ ছাপায়। সেখানকার এক কর্মী জানালেন, তাঁদের বইটি ‘শ্রী শ্রী হনুমান চালিশা’ সচিত্র। দাম দশ টাকা। বিক্রি ভালই। বহু ভাষাতেই ছাপা হয়। তবে কলকাতায় বিক্রি হয় হিন্দি আর বাংলা। সারা রাজ্যেই বই যায় তাঁদের প্রকাশনী থেকে।

পুরনো বইয়ের দোকানে স্বামী অভেদানন্দের ‘মরণের পারে’ বইটি দেখছিলেন অমিত দাস। জানালেন, তিনি প্রচুর আধ্যাত্মিক বই পড়েন। বাঙালিদের মধ্যে অবধি ভাষার হনুমান চালিশার এত জনপ্রিয়তা কেন? উত্তরে অমিত বললেন, ‘আমি পড়িনা, তবে মাঝেমধ্যে ইউটিউবে শুনি। মানুষ হনুমানকে সাধারণত তাঁর সাহস ও শক্তির জন্য পুজো করে। হনুমান বজরঙ্গবলি নামেও পরিচিত, যাঁকে অমর বলে মনে করা হয়। বলা হয়, তুলসীদাস কারাগারে বন্দি থাকা অবস্থায় হনুমান চালিশা গেয়েছিলেন। যেখানে তাঁকে ৪০ দিন রাখা হয়েছিল এবং তিনি ৪০টি চৌপাই মন্ত্র পাঠ করেছিলেন।’

বইপাড়ার ফুটপাথে টেবিল পেতে পত্র–পত্রিকা বিক্রি করেন মনোজ সাহা। তিনিও রাখছেন হনুমান চালিশা। তাঁর কথায়, ‘প্রতি বৃহস্পতিবার নিয়ম করে লক্ষ্মীপুজো এখন আর ক’টা বাঙালি বাড়িতে হয়। সবাই ব্যস্ত। তাই কমছে মেয়েদের ব্রতকথা বা নিত্যকর্ম পদ্ধতির মতো বইয়ের বিক্রি। পাশাপাশি আগে বাঙালিদের মধ্যে হনুমানজয়ন্তী বা রামনবমী নিয়ে খুব একটা আগ্রহ ছিল না। কিন্ত এখন বাড়ছে। মানুষের ভালো লাগছে, তাই হনুমান চালিশার বিক্রিও বাড়ছে।'
আরও পড়ুন: নামেই মডেল বেলগাছিয়ার বস্তি, পুর-পরিষেবা নিয়ে অভিযোগের অন্ত নেই বাসিন্দাদের