
শেষ আপডেট: 29 June 2021 13:29
সরাসরি মুখ্যমন্ত্রীর অধীনে থাকা সরকারের এই দুর্নীতি প্রতিরোধ শাখায় এক লপ্তে ৩৪ জন সাব-ইন্সপেক্টর, নয় জন ওসি/আইসি এবং তিনজন ডিএসপি পদমর্যাদার অফিসারকে নিয়োগ করা হচ্ছে। এ জন্য সরকারি নির্দেশও জারি হয়ে গিয়েছে।
পাশাপাশি জনসাধারণের সুবিধা এবং কাজের পরিধি বৃদ্ধির কথা মাথায় রেখে শহরের গুরুত্বপূর্ণ কোনও জায়গায় এসিবি-র পৃথক অফিস খোলারও তোড়জোড় শুরু হয়েছে। সরকারি প্রকল্পের সুবিধা পেতে অনিয়ম, বঞ্চনা, দুর্নীতির গন্ধ পেলে সাধারণ মানুষ যাতে সরাসরি তা এসিবি-র নজরে আনতে পারেন সে জন্য কিছুদিনের মধ্যেই সংবাদপত্রে বিশদে বিজ্ঞাপন দেওয়া হবে। নবান্ন সূত্রে বলা হয়েছে, অভিযোগকারীদের নাম-পরিচয় গোপন থাকবে।
সরকারি কর্মচারীদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি-অনিয়মের অভিযোগের তদন্তে ব্রিটিশ আমল থেকে রাজ্যে রাজ্যে ভিজিলেন্স কমিশন আছে। কিন্তু বাকি সব রাজ্যের মতো বাংলাতেও ওই কমিশন সরকারি কর্মচারীদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের তদন্তে সক্রিয় ভূমিকা নিয়ে পারেনি নিয়মতান্ত্রিকতার কারণে। অভিযুক্ত কর্মী-অফিসারের বিরুদ্ধে তদন্তে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্তাদের মুখাপেক্ষী হয়েই থাকতে হয় কমিশনকে।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ক্ষমতায় আসার পর ১৯৮৮ সালের প্রিভেনশন অফ করাপশন আইন বলে ২০১২-র আগস্টে এসিবি গঠন করেন। ওই তদম্তকারী সংস্থার তদন্তের পরিধিও ভিজিলেন্স কমিশনের থেকে অনেক বিস্তৃত। তারা শুধু সরকারি কর্মী-অফিসারই নয়, আধা সরকারি প্রতিষ্ঠান, পঞ্চায়েত, পুরসভার কর্মীদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগেরও তদন্ত করতে পারে। এমনকী সমবায় সংস্থা এবং রাজ্য সরকারের অর্থে চলা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগেরও তদন্তের অধিকার রয়েছে ওই সংস্থার।
প্রথম থেকেই এসিবি-কে থানার মর্যাদা দেওয়া হয়েছে, যা এলাকাভুক্ত হল গোটা রাজ্য। সিবিআইয়ের মতো তারা নিজেরাই এফআইআর রুজু করে তদন্ত শুরু করতে পারে। এসিবি-র বর্তমান অফিস নিউ সেক্রেটারিয়েট বিল্ডিং। সেখান থেকে সুবিধাজনক কোনও জায়গায় এসিবি সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্তও গৃহীত হয়েছে।
মধ্যপ্রদেশ ক্যাডারের অবসরপ্রাপ্ত আইপিএস রীনা মিত্রকে সম্প্রতি এসিবির অফিসার অন স্পেশ্যাল ডিউটি হিসাবে নিয়োগ করেছে নবান্ন। এর আগে তিনি রাজ্যের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিষয়ে মুখ্য উপদেষ্টা ছিলেন। তাঁর সিবিআইয়ের মতো কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থায় কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে। মুখ্যমন্ত্রীর দুর্নীতি দমন অভিযানে তিনি উপযুক্ত ভূমিকা পালন করতে পারবেন বলে আশা করছেন নবান্নের কর্তারা।
তৃতীয়বারের জন্য রাজ্যপাটে আসীন হয়েই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দুর্নীতি প্রতিরোধের বার্তা দিতে শুরু করেছেন। সদ্য সমাপ্ত বিধানসভা ভোটের প্রচারে বিরোধীরা, বিশেষ করে বিজেপি বারে বারেই তাঁর সরকারের বিরুদ্ধে সরকারি অর্থ নয়ছয়, স্বজনপোষণের অভিযোগ করেছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর মতো নেতারাও বারে বারেই সিন্ডিকেট রাজের কথা বলেছেন। এমনকী মুখ্যমন্ত্রীর পরিবারকেও নিশানা করেন তাঁরা।
ভোট-প্রচারে মুখ্যমন্ত্রী বিরোধীদের রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করলেও দুর্নীতি-স্বজনপোষণকে তিনি যে রেওয়াত করবেন না তা স্পষ্ট করে দিয়েছেন তৃতীয়বার সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার দিন কয়েকের মধ্যেই। ইয়াসে ক্ষতিগ্রস্থদের সরকারি ত্রাণ ও ক্ষতিপূরণের কথা ঘোষণা করতে গিয়ে তিনি জানিয়ে দেন, এই কাজে কোনওভাবেই যেন আমফান-অনিয়মের পুনরাবৃত্তি না হয়। আমফানে রাজ্য সরকার ক্ষতিগ্রস্থদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে সরাসরি ক্ষতিপূরণের টাকা পাঠিয়েছিল। তাতে দেখা যায় অনেক ক্ষতিগ্রস্থ পরিবার বঞ্চিত হয়েছে। তাদের ভাগের টাকা গিয়েছে এমন পরিবারের হাতে যাদের কোনওভাবেই ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। মুখ্যমন্ত্রী তাই এবার এই ব্যাপারে সরকারের জিরো টলারেন্সের কথা বলে দিয়েছেন।
অবশ্য আমফান দুর্নীতি জানাজানি হওয়ার পর তিনি ক্ষতিগ্রস্থ কিন্তু বঞ্চিত পরিবারগুলিকে নতুন করে আবেদন করার সুযোগ করে দিয়েছিলেন। কিন্তু সরকারের অস্বস্তি বাড়িয়ে দেয় হাইকোর্টের একটি রায়। আমফান দুর্নীতি নিয়ে করা জনস্বার্থ মামলায় হাইকোর্ট কন্ট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল বা সিএজি তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে।
সোমবারই রাজ্যপাল জগদীপ ধনকড় দার্জিলিং গোর্খা টেরিটোরিয়াল অথরিটির বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ তুলে তদন্ত দাবি করে সরব হন। মুখ্যমন্ত্রী রাজ্যপালের অভিযোগকে পরিকল্পিত আখ্যা দিয়ে রাজনৈতিক জবাব দিলেও প্রশাসনে নিয়মের বাধনে বাঁধতে তিনি যে বদ্ধপরিকর তা স্পষ্ট করছেন নানা সিদ্ধান্তে।
ইয়াসের সময় বেশ কিছু জায়গায় এক বছর আগে আমফানের পর তৈরি বাঁধ ভেঙে যায়। সেই ঘটনা নিয়ে সেচ দপ্তরের কাজকর্ম খতিয়ে দেখার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। নবান্ন সূত্রের খবর, ওই কাজের সময় সেচ দপ্তরের দায়িত্বে ছিলেন বর্তমানে বিজেপি নেতা তথা বিধানসভার বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। রাজ্য সচিবালয় সূত্রে খবর, এসিবি-তে ইতিমধ্যেই শুভেন্দুর জেলা পূর্ব-মেদিনীপুর থেকে বাঁধ নির্মাণে অনিয়মের তিনটি অভিযোগ জমা পড়েছে। নবান্নের কর্তারা সেগুলি খতিয়ে দেখছেন। নিয়ম অনুযায়ী এফআইআর রুজু করে তদন্ত শুরুর আগে এসিবি-কে সরকারের সবুজ সংকেত পেতে হবে।