দ্য ওয়াল ব্যুরো: ময়দান ঝিমিয়ে পড়লে ভোকাল টনিক দেওয়ার ভদ্রলোক আর রইলেন না। দীর্ঘ রোগভোগের পর জীবনাবসান হল কিংবদন্তী ফুটবলার তথা কোচ পিকে বন্দ্যোপাধ্যায়ের। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৩ বছর। শুক্রবার দুপুর ১২টা ৪০ মিনিটে বাইপাসের ধারের বেসরকারি হাসপাতালে শেষ নিশ্বাঃস ত্যাগ করেন পিকে।
গত বেশ কয়েক বছর ধরেই হুইলচেয়ার তাঁর সঙ্গী ছিল। বাইরের অনুষ্ঠানে যাওয়াও বন্ধ হয়ে গিয়েছিল তাঁর। মাঝে হাসপাতালে ভর্তি হলেও ফিরেছিলেন বাড়িতে। কিন্তু এবার আর ফিরলেন না। নিভে গেল ময়দানের ‘প্রদীপ’।
গত বেশ কিছুদিন ধরেই তাঁর অবস্থা সঙ্কটজনক ছিল। সোমবার রাতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ মেডিক্যাল বুলেটিন প্রকাশ করে জানিয়ে দেয়, চিকিৎসায় সাড়া দিচ্ছেন না পিকে বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁকে রাখা হয়েছিল ভেন্টিলেশনে। কিন্তু এদিন শেষ হল যুদ্ধ।
ইস্টবেঙ্গল, মোহনবাগান বা মহামেডানের মতো বড় ক্লাবে খেলেননি কখনও। তবু এরিয়ানস, ইস্টার্ন রেলের মতো ক্লাব থেকে ভারতীয় ফুটবলের নক্ষত্র হয়ে উঠেছিলেন পিকে। ১৯৩৬ সালের ২৩ জুন জলপাইগুড়িতে জন্ম প্রদীপবাবুর। ছোট থেকেই ফুটবল ছিল ধ্যানজ্ঞান। একবার এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, বল না পেলে ছোবড়া সমেত নারকেল নিয়েই দু’পায়ে নাচাতেন তিনি। মাত্র ১৫ বছর বয়সে বিহারের হয়ে সন্তোষ ট্রফি খেলেছিলেন পিকে। তারপর বাবার চাকরি সূত্রে গোটা পরিবার চলে আসে কলকাতায়। পিকে যোগ দেন এরিয়ানে।
১৯৫৪ সালে এক মরশুম এরিয়ানে খেলার পর ১৯৫৫ সাল থেকে ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত পিকের ক্লাব বলতে গোটা ময়দান জানত ইস্টার্ন রেলকে। ১৯৫৮ সালে তাঁর নেতৃত্বেই কলকাতা প্রিমিয়ার লিগ জিতেছিল ইস্টার্নে রেল। তাৎপর্যপূর্ণ হল এই তারপর আর কোনও তথাকথিত ছোট ক্লাব কলকাতা লিগ জেতেনি। মাঝে কয়েকবার মহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব জিতলেও সাতের দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে সাদা-কালোর অশ্বমেধের ঘোড়া থেমে যায়।কার্যত কলকাতা লিগ হয়ে উঠেছিল ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগানের ট্রফি। কিন্তু ৫৮-র পর এবারই প্রথম ইস্ট-মোহনের বাইরে ছোট দল হিসেবে পিয়ারলেস স্পোর্টস ক্লাব কলকাতা লিগ জেতে।
ভারতের জার্সি গায়ে ৪৫টি ম্যাচ খেলেছিলেন পিকে। তাঁর বুট থেকে এসেছিল ১৪টি গোল একাধিক গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে বারবার ঝলসে উঠেছিলেন পাঁচফুট সাড়ে আট ইঞ্চির এই স্ট্রাইকার। ১৯৫৮, ৬২ এবং ৬৬-এর এশিয়াডে ভারতের জার্সি গায়ে খেলেছিলেন পিকে। এর মধ্যে ৬২-র জাকার্তা এশিয়াডে চুনি গোস্বামী, তুলসীদাস বলরাম, জার্নাল সিং, পিটার থঙ্গরাজদের সঙ্গে নিয়ে সোনা জিতেছিলেন পিকে।
১৯৬১ সালে অর্জুন এবং ১৯৯৪ সালে পদ্মশ্রী পুরস্কার পান পিকে। খেলা ছাড়ার পর কোচিংয়েও ব্যাপক সাফল্য পেয়েছিলেন প্রদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়। ভারতীয় দলের কোচিং করার দায়িত্ব সামলানোর পাশাপাশি কোচিং করিয়েছিলেন ময়দানেও। ১৯৯৭ সালের ফেডারেশন কাপ সেমিফাইনালে ইস্টবেঙ্গলের কোচ হিসেবে পিকে এবং মোহনবাগানের কোচ অমল দত্তর লড়াই ইতিহাস হয়ে রয়েছে ময়দানে। ওই ম্যাচেই যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে ১ লক্ষ ২০ হাজার দর্শক হয়েছিল। এখনও পর্যন্ত যা ভারতীয় ফুটবলে রেকর্ড। সেই ম্যাচে অমল দত্তর ডায়মন্ড সিস্টেমকে মাটিতে মিশিয়ে ছেড়েছিল পিকের ছক। ইস্টবেঙ্গল জার্সিতে হ্যাটট্রিক করেছিলেন বাইচুং ভুটিয়া। মোহনবাগানকে ৪-১ গোলে হারিয়েছিল পিকের লাল-হলুদ।
ওই সময়ের পর থেকেই কোচিং থেকে নিজেকে আস্তে আস্তে সরিয়ে নেন। ততদিনে ময়দানে কোচিং করতে শুরু করেছেন সুভাষ ভৌমিক, মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য, সুব্রত ভট্টাচার্য, মিহির বসুর মতো তাঁর একঝাঁক দিকপাল ছাত্র।
সন্দেহ নেই পিকের মৃত্যু ময়দানের অপূরনীয় ক্ষতি। ময়দান শুধু একজন প্রাক্তন ফুটবলার বা কোচকে হারাল না, হারাল তার অভিভাবককে। কিন্তু তাঁর ধমক, বুকে জড়িয়ে ধরা, বকুনি, আদর আর বিখ্যাত ভোকালটনিক—থেকে যাবে ময়দানের ঘাসে। আজীবন।