
শেষ আপডেট: 29 December 2019 05:30
এই সমাধির মধ্যে মিলেছে হায়রোগ্লিফিক লিপিতে নানা লেখা। তা থেকেই এই তথ্য জেনেছেন পুরাবিদরা। তিনি ফারাওয়ের খুবই নিকটজন ছিলেন, বলা যেতে পারে তিনি ছিলেন সেই সময়ের ওভারসিয়ার পদের এক আধিকারিক। উজান মিশরের প্রথম দশজনের মধ্যে তিনি ছিলেন।
এসব হল শুকনো তথ্যমাত্র। যে কথা লিখে বোঝানো যাবে না তা হল এর ভিতরের বর্ণময়তা। যেসব দেওয়ালচিত্র সমাধির ভিতরে পাওয়া গেছে তার মধ্যে রয়েছে জাহাজের যাত্রার অনুপুঙ্খ বিবরণ, মিশরীয়দের মাঠেঘাটে কাজ করার অনবদ্য ছবি যা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। চার চারটি সহস্রাব্দ পার করেও এখনও এই ছবিগুলি একেবারে আগের অবস্থাতেই রয়েছে যা সচরাচর দেখা যায় না। এটা দেখেই সবচেয়ে অবাক হয়েছেন পুরাবিদরা।
ভ্যালি অফ কিংস
রাজ-উপত্যতা বললে হয়তো কিছুই বোঝা যায় না কিন্তু ভ্যালি অফ কিংস কোথায় সেকথা সকলেই জানেন। তবে এ বছর অক্টোবর মাসে মিশরের পশ্চিমে তিন হাজার বছরের পুরনো একের পর এক সমাধি আবিষ্কৃত হয় যেগুলি রাজবংশীয়দের। এই সমাধির মধ্যে এমন জায়গা খুঁজে পান পুরাবিদরা যেখানে বসে মাটির পাত্রে রং করতেন শিল্পীরা, আসবাবপত্র বানাতেন এবং সোনার জিনিসপত্র পরিষ্কার করতেন।
ঠিক যে জায়গায় মৃতদেহকে মমিতে পরিণত করা হত সেই জায়গার সন্ধানও পেয়েছেন পুরাবিদরা। সেখানে মমি বানানোর জন্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন জিনিসের সঙ্গে বাড়তি লিনেন, দড়ি প্রভৃতিও তাঁরা পেয়েছেন। আসবাব সরানোর জন্য যে ধরনের কাঠের দরকার হয়, সেই ধরনের কাঠও তাঁরা পেয়েছেন এই জায়গা থেকে।
এই জায়গা থেকে ওস্ট্রাকা পেয়েছেন পুরাতত্ত্ববিদরা। যে মাটির পাত্রের গায়ে কোনও ব্যক্তির নাম খোদিত রয়েছে তাকে বলে ওস্ট্রাকা। যা থেকেই তাঁরা বুঝেছেন এই জায়গাটি ছিল রাজ-শিল্পীদের। খাবার ও জল সংরক্ষিত থাকত এমন জায়গার সন্ধানও পাওয়া গেছে এই উপত্যকায়। ক্ষমতাশালী মহিলা ফারাও হাটশেপশুটের মমি যেখান থেকে পাওয়া গেছে তার কাছে মহিলাদের বহু মমিও পেয়েছেন পুরাতত্ত্ববিদরা। আগামী বছরে এই জায়গা থেকে আরও অনেক চমকপ্রদ জিনিস আবিষ্কার হবে বলে আশা করছেন গবেষকরা।
ব্রোঞ্জ যুগের মহানগর
পাঁচ হাজার বছরের পুরনো এক মহানগরের সন্ধানও এ বছরই পেয়েছেন পুরাতত্ত্ববিদরা। এখানে ছ’হাজার মানুষের বাস ছিল। সেই সময়ের হিসাবে এত জনবহুল শহর খুব কমই ছিল। জায়গাটি ইজরায়েলের এন এসুরে। এই শহর থেকে বিপুল সংখ্যায় ভাঙা পাত্র, চকমকি পাথর, ব্যাসল্ট পাথরের পাত্র, এবং একটি মন্দির আবিষ্কৃত হয়েছে। মন্দিরের ভিতরে প্রচুর পরিমাণে বিভিন্ন প্রাণীর পোড়া হাড় এবং মূর্তি পাওয়া গেছে।
একটি নিদর্শন ছিল মানুষের মাথা যার উপরে মোহর লাগানো, তার হাত দু’টি আকাশের দিকে তোলা। মনে করা হচ্ছে এখানে যে জলাধারটি ছিল সেটি ধর্মীর কারণে ব্যবহার করা হত। শহরের মন্দির, রাস্তাঘাট, আবাস সবই খুব সুচারু ভাবে পরিকল্পনা করে স্থাপন করা হয়েছিল।
এই উৎখননের নির্দেশক ছিলেন ইতাই এলাদ, ইৎঝাক পাজ ও দিনা সালেম। তাঁদের কথায়, এই শহরটি ছিল জনবহুল। রাজ্যের বিভিন্ন স্থান থেকে এখানে মানুষজন এসে বাস করতে শুরু করেন। তাঁরা মূলত কৃষিজীবী হলেও বিভিন্ন ধরনের ব্যবসার সঙ্গে তাঁদের সম্পর্ক ছিল। এই শহরটিকে তাঁরা ব্রোঞ্জ যুগের নিউ ইয়র্ক বলে অভিহিত করেছেন।
পুরোহিতদের গোপন কথা
পুরাতত্ত্ববিদরা কাঠের অন্তত তিরিশটি শবাধারের সন্ধান পেয়েছেন মিশরের লাক্সোরের এল-আসাসিফ-এ। এগুলির বয়স কমপক্ষে তিন হাজার বছর। তাঁরা এই আবিষ্কারের নাম দিয়েছেন ক্যাশেট অফ দ্য প্রিস্টস। এর বঙ্গীকরণ করলে মানেটা দাঁড়ায় ‘পুরোহিতদের গোপন কথা’ই।
এইসব শবাধারের ভিতরে যেসব মমি পাওয়া গেছে সেগুলোও খুব ভাল ভাবে সংরক্ষিত ছিল। একটি সাংবাদিক বৈঠকে যখন এর মধ্যে দুটি শবাধার খোলা হয় তখন দেখা যায় মমির গায়ে যে চাদরের মতো জড়ানো অংশ থাকে তা একেবারে অটুট। তিরিশটি শবাধারের মধ্যে তেইশটি ছিল পূর্ণবয়স্ক পুরুষের, পাঁচটি ছিল পূর্ণবয়স্ক মহিলার এবং দুটি ছিল শিশুর মমি। এই শবাধারগুলির গায়ে হায়রোগ্লিফিকে বহু কিছু লেখা আছে। গবেষকরা মনে করছেন আগামী এক থেকে দু’বছরের মধ্যে আরও অনেক নতুন তথ্য পাওয়া যাবে সব কিছু বিশ্লেষণ করে।
এতদিন ধরে বন্ধ অবস্থায় রাখা থাকলেও মমিগুলি এতটুকু নষ্ট হয়নি বা বিকৃত হয়নি। পুরাবিদরা সবচেয়ে আশ্চর্য হয়েছেন আর একটি বিষয় দেখে – দীর্ঘদিন ধরে মিশরে কফিন থেকে চুরির ঘটনা একরকম নিয়ম হয়ে গেলেও এই শবাধারগুলি রয়ে গিয়েছিল চোরেদের নজর এড়িয়ে।
শিশুর খুলি দিয়ে তৈরি শিরস্ত্রাণ
ইকুয়াডরের উপকূলে সালাঙ্গো নামে একটি পুরাস্থানে শিশুদের একজোড়া খুলি পেয়েছেন গবেষকরা। আশ্চর্যজনক তথ্য হল, এই খুলিদুটির মাথায় একটি করে শিরস্ত্রাণ ছিল যা অন্য শিশুর খুলি দিয়ে বানানো। এই খুলির বয়স দু’হাজার একশো বছর।
শিরস্ত্রাণগুলি বেশ শক্ত করে আঁটা ছিল খুলির উপরে। পুরাতত্ত্ববিদরা মনে করছেন, যখন একটু বেশি বয়সের শিশুর খুলি দিয়ে শিরস্ত্রাণ বা হেলমেট বানানো হয়েছিল তখন তাতে মাংস লেগে ছিল। পুরাতত্ত্ববিদদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, মাংস লেগে না থাকলে ওই শিরস্ত্রাণ ঠিক ভাবে বসানো সম্ভব হত না।
বেশি বয়সের শিশুর মাথার খুলি দিয়ে সদ্যোজাত শিশুর শিরস্ত্রাণ তৈরি করে কবর দেওয়ার নজির এই প্রথম পেলেন পুরাতত্ত্ববিদরা। ওই শিশুদের মারা হয়েছিল নাকি তারা মারা গিয়েছিল তা এখনও স্পষ্ট নয়। কেন ওই হেলমেট পরানো হয়েছিল তাও এখনও স্পষ্ট হয়নি। তবে প্রাথমিক ভাবে মনে করা হচ্ছে জন্তুজানোয়ার এবং অশুভ আত্মার হাত থেকে কবরস্থ শিশুদের রক্ষা করতে এই কৌশল অবলম্বন করা হয়ে থাকতে পারে।