
শেষ আপডেট: 7 June 2023 06:51
প্রভু জগন্নাথের জ্বর এসেছে। একেবারে ধুম জ্বর। শুধু জ্বরই নয়, সর্দিকাশিও কাবু করেছে তাঁকে। আর করবে নাই বা কেন জ্যৈষ্ঠের দাবদাহ সহ্য করতে না পেরে প্রভু যে স্নানযাত্রায় ১০৮ ঘড়া কনকনে ঠান্ডা জলে স্নান করেছেন!এমন অনিয়ম করলে তো ঠান্ডা-গরম লাগবেই। লাগলও। শুধু একা জগন্নাথদেব নন, তাঁর ভাই বলরাম ও বোন সুভদ্রাও একইভাবে ১০৮ ঘড়া কনকনে জলে স্নান করে জ্বরে কাতর। তিনজনেই এখন নিভৃতবাসে রয়েছেন। রাজবৈদ্যের বিধান মেনে তাঁরা আয়ুর্বেদিক পাঁচন সেবন করছেন এবং আগামী ১৫ দিন তাঁরা থাকবেন সংরক্ষিত মন্দির কক্ষে। এই 'অনসর' কালে (কোয়ারেন্টাইন পিরিয়ডে) কোনও ভক্ত প্রভু জগন্নাথের দর্শন পাবেন না। দর্শন মিলবে না বলরামদেব ও সুভদ্রা দেবীরও।
জগন্নাথস্বামীর জন্মদিন কবে? কেন এইদিনে স্নানের মহা আয়োজন?
স্কন্দপুরাণে আছে , রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন প্রথম জগন্নাথদেবের কাঠের বিগ্রহ তৈরি করিয়েছিলেন। জ্যৈষ্ঠমাসের পূর্ণিমা তিথিতে জগন্নাথদেবের এই বিগ্রহ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল মন্দিরে। এই দিনকে প্রভু জগন্নাথের আবির্ভাব দিন বা জন্মদিন বলা হয়। পরের বছর রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন এই জ্যৈষ্ঠমাসের পূর্ণিমা তিথিতে জগন্নাথদেবের মহাস্নানের আয়োজন করেছিলেন।
সেই উপলক্ষে মন্দিরের প্রাঙ্গণে বিশাল স্নানবেদী তৈরি হয়েছিল। উত্তরের সরোবরের জলে বেদী ধুয়ে পতাকা দিয়ে সাজানো হয়েছিল তোরণ ও স্নানবেদি। তারপর মন্দিরের গর্ভগৃহ থেকে তিন দেবতার বিগ্রহ আনা হয়েছিল স্নানবেদিতে।পুষ্প চন্দন ও আরও নানা অঙ্গরাগে সুসজ্জিত করা হয়েছিল তাঁদের। মন্দিরের বাইরে এই স্নানবেদিতে বসিয়ে দীপধূপ দিয়ে অর্চনা করা হয়েছিল জগন্নাথস্বামীকে। ভক্তরা প্রাণ ভরে দর্শন করেছিলেন আরাধ্য প্রভুকে।

এর পর দেবতাদের স্নানের পালা। সরোবর থেকে ১০৮টি সোনার কলসে জল এনে মন্ত্রোচ্চারণের মাধ্যমে জল শুদ্ধ করে স্নান করানো হয়েছিল জগন্নাথদেব, বলরামদেব ও সুভদ্রা দেবীকে। ভক্তরা তন্ময় হয়ে প্রাণের দেবতার স্নানদৃশ্য দেখেছিলেন।
সেই ট্র্যাডিশন সমানে চলছে।পরম্পরা মেনে আজও জ্যৈষ্ঠমাসের পূর্ণিমা তিথিতে জগন্নাথপ্রভুর জন্মদিনে স্নানযাত্রা উৎসব হয় পুরীর মন্দিরে। শুধু পুরীই নয়, সব জগন্নাথধামেই স্নানযাত্রা পালন করা হয়।
জগন্নাথদেবের স্নানযাত্রা দর্শন করলে কী হয়?
১০৮ সোনার কলস থেকে যখন দেববিগ্রহে জল ঢালা হয়, সেই স্বর্গীয় দৃশ্য দেখে ভক্তের প্রাণমন আকুল হয়ে ওঠে। প্রভু জগন্নাথের নামগান করতে করতে তাঁদের মনের সব কলুষ দূর হয়ে যায়। জলে ধুয়ে যায় মানুষের লোভ, লালসা, পাপস্পৃহা। স্কন্দপুরাণেও একই কথা বলা রয়েছে। জীবনে অন্তত একবার প্রভু জগন্নাথের স্নানযাত্রা দর্শন করলে জীবনের সব পাপ ধুয়েমুছে যায়। তাই মৃত্যুর পর স্বর্গলাভের পথ প্রশস্ত হয়। ঋষি জৈমিনি বলেছেন, স্নানযাত্রা দর্শন করলে সমস্ত তীর্থস্নানের থেকে শতগুণ বেশি পুণ্যলাভ হয়।

এ বছর স্নানযাত্রা ছিল চৌঠা জুন। পুরীর মন্দিরে নেমেছিল ভক্তের ঢল। ভক্তদের দর্শনের মাঝেই প্রতিবারের মতো এবারেও জ্বর এল প্রভু জগন্নাথ ও তাঁর ভাইবোনের। এখন তাঁরা রয়েছেন নিভৃতবাসে।
তাহলে কি এখন গর্ভগৃহে দেবতার আসন শূন্য?
জ্বরে কাতর জগন্নাথদেব এখন বিশ্রামে। তাই মন্দিরের গর্ভগৃহে জগন্নাথ বলরাম ও সুভদ্রার পটচিত্র রাখা হয়েছে এখন। এই পটচিত্রেই পুজো হবে রথের আগের রাত পর্যন্ত। নিভৃতাবাসে থাকা দেববিগ্রহে নিত্যপুজো ছাড়া আর কিছু করা হবে না এই ক'টা দিন। বারংবার বেশবদল, ভোগের বিপুল আয়োজন-- সব এখন বন্ধ। রাজবৈদ্যের দেওয়া পাঁচন সেবন করে আর বিশ্রামে থেকে ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠবেন জগন্নাথস্বামী। রথের আগের রাতে হবে নেত্রোৎসব। তিন দেবতা চোখ খুলবেন। সুস্থ হওয়া মাত্র শুরু হবে রথযাত্রার তোড়জোড়।
আষাঢ়ের শুক্লপক্ষের দ্বিতীয়া তিথিতে রথযাত্রা
পঞ্জিকা অনুযায়ী এবার রথযাত্রার সময় ২০ জুন রাত ১০টা ৪ মিনিট থেকে ২১ জুন সন্ধে ৭টা ৯ মিনিট পর্যন্ত। সে যাই হোক, ততদিনে জগন্নাথপ্রভু সুস্থ হয়ে যাবেন। রাজবেশে দেখা দেবেন ভক্তদের। রথে উঠে পাড়ি দেবেন মাসির বাড়ি। গুন্ডিচা দেবীর মন্দির জগন্নাথদেবের মাসির বাড়ি। ভক্তরা রথের রশি টেনে তাঁকে পৌঁছে দেবেন গুন্ডিচা মন্দিরে। বলরামদেব ও সুভদ্রা দেবীও নিজের নিজের রথে চেপে পৌঁছে যাবেন মাসির বাড়ি।
জগন্নাথ, তিনি জগতের নাথ। তাঁর রথের রশিতে যিনি হাত রাখেন, তিনি পাপমুক্ত হন, জীবনে শান্তি ও সমৃদ্ধি লাভ করেন।