দ্য ওয়াল ব্যুরো, বর্ধমান: ধর্ষণের মিথ্যা মামলা করে, এখন নিজের জালে নিজেই জড়িয়েছেন অভিযোগকারী। মিথ্যা অভিযোগ দায়ের করে পুলিশ প্রশাসনকে নাজেহাল করার অপরাধে অভিযোগকারী মহিলার বিরুদ্ধে মামলা করার অনুমতি চেয়ে আদালতে আবেদন জানায় এক পুলিশ অফিসার।সেই আবেদন মঞ্জুর করেছেন বিচারক।
বর্ধমান আদালতে মহিলা থানার দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিক ডিএসপি নন্দিতা সাহা মজুমদার অভিযোগকারী যুবতীর বিরুদ্ধে ভারতীয় দণ্ডবিধির ২১১ ধারায় মিথ্যা অভিযোগ করার জন্য মামলা করার অনুমতি চেয়ে আবেদন জানান। এ বিষয়ে আদালতে তাঁর চূড়ান্ত রিপোর্ট পেশ করেছেন কেসের তদন্তকারী অফিসার। মঙ্গলবার ১৫ই সেপ্টেম্বর তদন্তকারী অফিসারের রিপোর্ট গ্রহণ করেন বর্ধমান আদালত। পরের দিন, অর্থাৎ বুধবার শুনানির পর অভিযোগকারীর বিরুদ্ধে কেস রুজু করার আবেদনে সায় দিয়েছেন সিজেএম রতন কুমার গুপ্তা।
এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে, বর্ধমান আদালতের আইনজীবী বিশ্বজিৎ দাস বলেন, এ ধরণের ঘটনা খুবই অস্বাভাবিক। সচরাচর এমন ঘটে না। অভিযোগকারীর বিরুদ্ধে দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ আধিকারিকের উল্টে মামলা করার নজির খুব একটা নেই। তবে, মিথ্যা মামলা করা হয়ে থাকলে, বা কোনও রকম সত্যগোপনের চেষ্টা হয়ে থাকলে অভিযোগকারীর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। তাহলে আগামী দিনে এভাবে মিথ্যা মামলা করে অন্যকে ব্যতিব্যস্ত করার সাহস কেউ পাবে না। এর ফলে আদালতের উপর মামলার চাপও কমবে।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, বর্ধমান শহরের রাধানগর পাড়ায় বসবাস করেন বছর পঁচিশের ওই যুবতী। তাঁর স্বামী দীর্ঘদিন ধরেই কোনও কাজ করেন না। ঘটনার মাস ছয়েক আগে ওই মহিলার সঙ্গে কলকাতার পার্কস্ট্রিট থানা এলাকার বাসিন্দা শেখ আসিফ আলির পরিচয় হয় সোস্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে। আসিফের কলকাতায় ব্যাগ তৈরির কারখানা রয়েছে।
কিছুদিন আগে ওই যুবতীকে কারখানায় কাজ দেওয়ার প্রস্তাব দেন আসিফ। তাতে রাজি হয়ে যুবতী আসিফের কারখানায় যান। সেখানে যুবতীকে ঠাণ্ডা পানীয় খেতে দেওয়া হয়। ওই পানীয় খাওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই যুবতী অচৈতন্য হয়ে পড়েন। এরপর তাঁকে ধর্ষণ করা হয় বলে অভিযোগে জানায় যুবতী। এমনকি ধর্ষণের ঘটনার ভিডিও রেকর্ডিংও করা হয় বলে যুবতীর দাবি।
পরের দিন জ্ঞান ফিরলে নিজেকে বিবস্ত্র অবস্থায় দেখতে পান যুবতী। এর কারণ জানতে চাইলে অভিযুক্ত আসিফ আলি তাঁকে মারধর করে বলেও অভিযোগ। মাথায় বন্দুক ঠেকিয়ে তাঁকে মেরে ফেলার হুমকিও দেওয়া হয়। কোনও রকমে নিজেকে সেখান থেকে মুক্ত করে যুবতী বাড়ি ফেরেন। তার পরের দিন আসিফ, তার ভাই এবং কয়েকজন গুণ্ডা প্রকৃতির লোক ওই মহিলার বাড়িতে চড়াও হয়ে তাকে বন্দুক দেখিয়ে ভয় দেখায়। পরিবারের লোকজনকে খুনের হুমকি দেওয়া হয়। প্রতিবাদ করলে ফের একপ্রস্থ মারধর করা হয় ওই যুবতীকে।
যুবতীর তরফে এই অভিযোগ পেয়ে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে ধর্ষণের মামলা রুজু করে মহিলা থানার পুলিশ। তদন্তে নেমে পুলিস যুবতীর ও অভিযুক্তদের মোবাইলের টাওয়ার লোকেশন সংগ্রহ করে। কিন্তু তাতে দেখা যায়, ঘটনার দিন যুবতীর উল্লেখ করা এলাকায় অভিযুক্তরা ছিলনা। এমনকি টাওয়ার লোকেশন বলছে যুবতীও সেখানে যান নি। তাঁর বাড়িতে হামলার বিষয়ে যে অভিযোগ করা হয়েছে তাও তদন্তে সঠিক নয় বলে জানা যায়। অভিযুক্তদের টাওয়ার লোকেশনের সঙ্গে ঘটনাস্থলের মিল খুঁজে পায়নি পুলিস।
ধর্ষণের ক্ষেত্রে যা দস্তুর, সেই নিয়ম মেনে ওই মহিলার মেডিকেল পরীক্ষার ব্যবস্থা করেন পুলিশ৷ কিন্তু যুবতী মেডিক্যাল পরীক্ষা করাতে অস্বীকার করেন। স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথাবাঁতা বলেও মহিলার অভিযোগের সারবত্তা পায়নি পুলিশ। এরপরই মিথ্যা মামলা করার কথা জানিয়ে আদালতে চূড়ান্ত রিপোর্ট পেশ করেন তদন্তকারী অফিসার।
এই ঘটনাকে একটি বিরল অপরাধমনোবৃত্তির দৃষ্টান্ত হিসাবেই তুলে ধরতে চাইছেন বর্ধমানের পুলিশ প্রশাসন। মহিলা থানার দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিক মিথ্যা অভিযোগ দায়ের করে পুলিশকে নাকাল করার জন্য ওই মহিলার বিরুদ্ধে মামলা রুজুর আবেদন জানিয়েছিলেন। সে আবেদনে শিলমোহর দিলেন এবার বর্ধমান আদালতের বিচারকেরা।