শোভন চক্রবর্তী ও রফিকুল জামাদার
আড়াই ঘণ্টা হেঁটেছেন সকালে। তারপর ফিরে পায়জামা-পাঞ্জাবিটা ছেড়ে শর্টস আর টিশার্ট পরে ক্লান্ত শরীরটা এলিয়ে দিয়েছেন চেয়ারে। শ্রীরামপুরে গঙ্গা দর্শন আবাসনের এসি চেম্বারে ঠোঁটে কিং সাইজ সিগারেটটা চেপে শ্রীরামপুরের তৃণমূল প্রার্থী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় বললেন, "এই এখন কিন্তু ছবি তুলো না!" তারপর সিগারেট শেষ না হওয়া পর্যন্ত নানান গল্প। একদম বৈঠকি আমেজ।
কিন্তু ক্যামেরা অন হতেই অন্য কল্যাণ। স্পষ্ট কথায় কষ্ট নেই। শক্ত শক্ত ভাষা নেই। অকপটে বলে দিলেন, "চণ্ডীতলায় নরেন্দ্র মোদী সভা করতে এসে যতবার মমতাদির নাম নিয়েছে, তার এক চতুর্থাংশ নিজের বাবার নাম নেয়নি কোনওদিন। মমতাদি মোদীকে নয়। বরং মোদী ভয় পাচ্ছে মমতাদিকে।"
চোদ্দর ভোটে এই কেন্দ্রেই বিজেপি প্রার্থী করেছিল বাপ্পী লাহিড়ীকে। কিন্তু এ বার সেই তুলনায় প্রার্থী তেমন হেভিওয়েট নন। দলের যুব মোর্চার রাজ্য সভাপতি দেবজিৎ সরকারকে হুগলির এই কেন্দ্রে প্রার্থী করেছে গেরুয়া শিবির। কিন্তু এ সব কোনও কিছুতেই আমল দিতে রাজি নন দুঁদে আইনজীবী। বললেন, "যতবার দাঁড়াব, ততবার জিতব।" বিজেপি-র হাওয়া নেই বলে গত দশ বছরের সাংসদের বক্তব্য, "বিজেপির কোনও হাওয়া আমি দেখতে পাচ্ছি না। ওরা শূন্য হয়ে গিয়েছে।" অবিকল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথা।
শ্রীরামপুর কেন্দ্রে একটা মিথ আছে, তৃতীয়বার দাঁড়িয়ে কেউ জেতেননি। সর্বশেষ উদাহরণ তাঁর দলেরই প্রয়াত আকবর আলি খন্দকার। কিন্তু কল্যাণ যেন মিথ ভাঙার পণ করেছেন। তাঁর কথায়, "শ্রীরামপুরে যাঁরা সাংসদ ছিলেন, সে সিপিএম হোক বা কংগ্রেস, তাঁরা কেউই ৫৫-৬০ হাজারের বেশি ভোটে জেতেননি। আমি প্রথমবার এক লাখ ৩৭ হাজার। পরের বার এক লাখ ৫৩ হাজার।" এ বার? ঠোঁটে একটা তাচ্ছিল্যের শব্দ করে, অভিব্যক্তি দিয়ে বুঝিয়ে দিলেন মার্জিন বাড়বে। তাঁর কেন্দ্রে হাওড়ার দুটি বিধানসভা পড়ে। জগৎবল্লভপুর আর ডোমজুড়। সেখানকার সমীকরণ কী হবে? তারা মায়ের ভক্ত কল্যাণবাবু যেন পলিটিকাল অ্যাস্ট্রোলজার! মুহূর্তে হিসেব কষে বলে দিলেন, "জগৎবল্লভপুর থেকে ৩০হাজারের লিড নেব। আর ডোমজুড়ে ৭০।"
এরপর সাংসদ থাকার সময়ে কী কী করেছেন সেই গল্প শুরু করলেন। বললেন কী ভাবে স্পটে ফয়সলা করে দিয়েছেন স্বামী-স্ত্রীর বিবাদ। কিন্তু কল্যাণের টার্গেট সেই বিজেপি-ই। নির্বাচক মণ্ডলীর কাছে আবেদন জানাতে গিয়ে বললেন, "আরও বেশি আশীর্বাদ চাই। যাতে একটা করে বাউন্ডারি মারি আর বলগুলো টকাটক টকাটক গিয়ে অমিত শাহের টাকে পড়ে।"
রাজনৈতিক মহলের অনেকেই বলেন, এই হুগলি জেলায় তৃণমূলের গোষ্ঠী কোন্দল প্রবল। তৃণমূলের অনেক নেতাই বলেন, যত জন বিধায়ক, ততগুলি গোষ্ঠী। কিন্তু কল্যাণ বললেন, "শ্রীরামপুর কেন্দ্র নিয়ে কেউ একটা কথা বলতে পারবে না। আসলে এ সব ট্যাকল করতে স্ট্রং লোক লাগে। আমি এ সব হতে দিই না। খারাপ কাজ করলে ধমকাই, আবার ভাল করলে বুকে টেনে নিই।" পরোক্ষে বুঝিয়ে দিলেন, যেখানে যেখানে এ সব প্রকাশ্যে চলে আসে, সেখানে স্ট্রং লোকের অভাব।
তাঁর ব্যবহার খারাপ, কথা বলার ধরণ নিয়ে কম অভিযোগ নেই। চোদ্দর ভোটের সময় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রচার করতে এসে বলেছিলেন, "কল্যাণের একটু গলার জোর বেশি। আসলে ও উকিল তো তাই! উকিলদের একটু জোরে কথা বলতে হয়।" বিরোধীদের সম্পর্কেও একাধিক আক্রমণকে রাজনৈতিক মহল ভাল চোখে নেয়নি। একবার তো কংগ্রেস নেত্রী দীপা দাসমুন্সিকে নিয়ে 'কুরুচিকর' মন্তব্য করে বিতর্কে জড়িয়েছিলেন। কিন্তু গত কয়েক বছরে সে সব বিশেষ শোনা যায়নি। তাহলে কি পরিণত হয়ে গিয়েছেন? এখানেও কোনও ঢাকাঢাক গুড়গুড় নেই। বললেন, "আই ওয়াজ নট পারফেক্ট। আই অ্যাম নট পারফেক্ট। অ্যান্ড আই উইল বি নট পারফেক্ট।"
https://www.youtube.com/watch?v=oo0_PPw_-3U&feature=youtu.be