
শেষ আপডেট: 12 April 2023 15:52
বসিরহাট থেকে জিতে দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হয়েছিলেন ইন্দ্রজিৎ গুপ্ত। সেই প্রথম ও শেষবার কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী হয়েছেন কোনও বাঙালি। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি অর্থাৎ সিপিআইয়ের (CPI) এই নেতা স্বাধীনোত্তর সময়ে অন্যতম সেরা সাংসদ বলে বিবেচিত হন। পরবর্তী কালে গুরুদাস দাশগুপ্ত হয়ে উঠেছিলেন জাতীয় স্তরে সিপিআইয়ের মুখ। বাংলায় বামফ্রন্ট সরকারের সময়ে সিপিআই ছিল বড় দল। রাজ্য মন্ত্রিসভায় জ্বলজ্বল করত তাদের উপস্থিতি। কিন্তু সেই দলটা বাংলায় ‘রাজ্য পার্টি’র (State Party) মর্যাদাও (Status) হারিয়ে ফেলল।
একইভাবে ক্ষিতি গোস্বামী, অবনী রায়দের দল বিপ্লবী সমাজতান্ত্রিক পার্টি তথা আরএসপিও (RSP) বাংলায় রাজ্য পার্টির তকমা হারিয়েছে। যা নিয়ে বাম মহলে এই দু’টি দলের প্রাসঙ্গিকতা, ভবিষ্যৎ ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা, চর্চা শুরু হয়েছে।
এই মর্যাদা হারানোকে কীভাবে দেখছে সিপিআই? আরএসপি?
সিপিআইয়ের এই মুহূর্তে তরুণ মুখ সৈকত গিরি। রাজ্য পরিষদের সদস্য এবং ছাত্র আন্দোলন থেকে উঠে আসা পূর্ব মেদিনীপুরের ভূমিপুত্র সৈকত। তিনি অকপটে স্বীকার করে নিয়েছেন, ‘এই ঘটনা আমাদের পার্টির কর্মী, সমর্থক সবার জন্যই ধাক্কার এবং হতাশার।’ সেই সঙ্গে সৈকত বলেন, ‘আমাদের পার্টি কোনও ব্যক্তিকেন্দ্রিক দল নয়। তাই এই ব্যর্থতা আমাদের গোটা পার্টির।’
আরএসপি সাধারণ সম্পাদক মনোজ ভট্টাচার্য অবশ্য এই ঘটনাকে সংখ্যাতত্ত্বের অঙ্ক হিসাবে দেখতে চেয়েছেন। তাঁর কথায়, ‘এটা দুর্ভাগ্যজনক সিদ্ধান্ত। কারণ এই সিদ্ধান্ত সংখ্যাতত্ত্বের বিচারে নেওয়া হয়েছে। আমরা বাংলায় বামফ্রন্টের শরিক হিসাবে নির্বাচনে লড়ি। ২০২১ সালে আমাদের দল লড়েইছে ১১টি আসনে। সেখানে আমরা ৬ শতাংশ ভোট পাব কী করে!’
ফ্রন্টের মধ্যে থাকার কারণে ছোট শরিকদের যে কৃচ্ছসাধন করতে হচ্ছে সে ব্যাপারে প্রায় একই সুরে কথা বলেছে সিপিআই, আরএসপি। তবে সামগ্রিক লড়াই আন্দোলনের প্রশ্নে বামফ্রন্টের গুরুত্বের কথাও মেনে নিয়েছেন দু’দলের নেতারা।
সিপিআইয়ের তরুণ নেতা সৈকত জানিয়েছেন, আগামী শনি-রবিবার রাজ্য পরিষদের বৈঠক রয়েছে। সেখানে এই ইস্যুতে আলোচনা হবে। বিজেপির জমানায় সামগ্রিক রাজনীতির দৃষ্টিভঙ্গিতে এই গোটা ব্যাপারটাকে দেখতে চেয়েছেন আরএসপি সাধারণ সম্পাদক।
মনোজ ভট্টাচার্যের বক্তব্য, যেহেতু বিজেপি তথা সঙ্ঘ পরিবারের লক্ষ্য মার্ক্সবাদী দলগুলিকে শেষ করা, এটা তারই একটি ধাপ। যে কারণে অন্য অনেক ছোট দল বিভিন্ন রাজ্যে রাজ্য পার্টির মর্যাদায় থাকলেও বেছে বেছে আরএসপি, সিপিআইয়ের খাটো করা হয়েছে। এই মুহূর্তে কেরল ছাড়া আরএসপি দেশের কোনও রাজ্যেই আর রাজ্য পার্টির মর্যাদায় নেই। কেরলে আবার আরএসপি রয়েছে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউডিএফে। সেখানে এলডিএফ তাদের প্রতিপক্ষ। সিপিআই অবশ্য কেরল, তামিলনাড়ু, তেলঙ্গনার মতো রাজ্যে রাজ্য পার্টির মর্যাদা এখনও ধরে রেখেছে।
বামফ্রন্ট ক্ষমতা থেকে যাওয়ার পর বাংলায় বহু ছোট বাম দলের প্রায় সলিল সমাধি ঘটেছে। ইদানীং আরসিপিআই, মার্ক্সবাদী ফরওয়ার্ড ব্লকের মতো দলগুলির নাম শোনাই যায় না। সবচেয়ে বড় দল সিপিএমের এখনও সাংগঠনিক একটা ধাঁচা দৃঢ়ভাবে রাজনীতিতে অবস্থান করলেও তুলনামূলকভাবে তারাও দুর্বল হয়েছে। ধাপে ধাপে কমেছে সদস্য সংখ্যা। একইভাবে সিপিআই, আরএসপির ক্ষেত্রেও তাই।
বিজেপি এই ঘটনাকে বামপন্থার প্রতি মানুষের মোহভঙ্গ হিসাবেই দেখতে চেয়েছে। রাজ্য সভাপতি সুকান্ত মজুমদার বলেন, ‘এই মতাদর্শ যে আর মানুষকে টানছে না এটা তারই প্রমাণ।’
পর্যবেক্ষকদের অনেকের মতে, আরএসপি-সিপিআইয়ের রাজ্য পার্টির মর্যাদা চলে যাওয়ার দায় সিপিএমের উপরেও বর্তায়। কারণ ফ্রন্টে বড় শরিক তারাই। আসন বিন্যাসের ব্যাপারে সিপিএমই এখনও শেষ কথা বলে। অন্যদিকে নির্বাচনী আসন সমঝোতায় কংগ্রেস, আইএসএফ যুক্ত হলে শরিকদের ভাগও কমে যায়। সার্বিকভাবে তাই আলিমুদ্দিন স্ট্রিটও এর দায় এড়াতে পারে না বলে মত অনেকের।
তৃণমূল কেন জাতীয় দলের মর্যাদা হারাল, দুই রাজ্যে খোয়াল স্টেট পার্টির তকমাও