
শেষ আপডেট: 17 May 2023 07:15
দ্য ওয়াল ব্যুরো, পূর্ব মেদিনীপুর: মঙ্গলবার তখন দুপুর ১২.৩০ হবে। বিকট শব্দে কেঁপে উঠেছিল এগরার খাদিকুল গ্রামের বাজি কারখানা (Egra blast)। বিস্ফোরণে ইতিমধ্যেই মৃত্যু হয়েছে ৯ জনের। মৃতদের পরিবারপিছু আড়াই লক্ষ করে ক্ষতিপূরণ ঘোষণা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। সেই ঘটনার পর থেকেই লোকের মুখে মুখে ফিরছে একটাই নাম, কৃষ্ণপদ ওরফে ভানু বাগ। কিন্তু নাম কানে শুনলেও চোখে দেখা যাচ্ছে না ভানুকে। কারণ, দুর্ঘটনার পর থেকেই বেপাত্তা সে। আর এটাই প্রথমবার নয়, পালিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে নাকি রীতিমতো সিদ্ধহস্ত ভানু বাগ (Egra blast)। গ্রামে কান পাতলে শোনা যাচ্ছে, বাগের ব্যাগ নাকি গোছানোই থাকে। একটা করে বিস্ফোরণ, কয়েকটা মৃত্যু- ব্যস, ব্যাগ নিয়ে ভানু ভাগলবা।
খাদিকুল গ্রামে বাজির রাজা ভানুর উত্থানও খুবই চমকপ্রদ। পুলিশ ইতিমধ্যেই দাবি করেছে, বিস্ফোরণে উড়ে যাওয়া ভানুর কারখানাটি নাকি বেআইনি ছিল। কিন্তু এক-দু বছর নয়, গত ৩০ বছর ধরেই নাকি এই বেআইনি ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছিল সে। বাজি ছিল তার ধ্যানজ্ঞান। রংমশাল, তুবড়ি, ছুঁচোবাজি, রকেট, হাউই, গাছবোমা, সবই নাকি ভানুর হাতের কারসাজিতে কথা বলত। তার বাজি তৈরির সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল পূর্ব মেদিনীপুরের সীমানা ছাড়িয়ে অন্য রাজ্যেও। বিপুল চাহিদা ছিল ভানুর হাতে তৈরি বাজির। বাজির কারিগর হিসাবে একাধিক পুরস্কারও পেয়েছিল সে। এলাকার বর্ধিষ্ণু ব্যবসায়ী হিসেবে নাম ছড়িয়েছিল তার।
৩ দশক আগে যখন ভানু প্রথম বাজির ব্যবসা শুরু করে, তখন তার কারখানা ছিল গ্রামের বাড়িতে। কিন্তু সেখানেও নাকি বিস্ফোরণ ঘটেছে একাধিকবার। এমনকী, ৫ বছর আগে বাড়ির ওই কারখানাতেই বিস্ফোরণে মৃত্যু হয়েছিল ভানুর ভাই এবং তাঁর স্ত্রীর। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে ১৯৯৫ সালে ভানু বাগের বাজি কারখানায় বিস্ফোরণে মৃত্যু হয়েছিল পাঁচজনের। পরবর্তীতে আবারও বিস্ফোরণ হয়। কিন্তু বাজি বানানোর মোহ এমনই ছিল ভানুর যে, ব্যবসার সুবিধার্থে রাজনীতির আড়ালে আশ্রয় নেয় ভানু ওরফে কৃষ্ণপদ। ২০১১ সালে রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পর তৃণমূলের ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠতে শুরু করে ভানু। একটা সময় গ্রামের পঞ্চায়েত সদস্যও ছিল সে। সূত্রের খবর, এরপর থেকেই আরও দ্রুত উত্থান শুরু হয় ভানুর। ভাই ও তাঁর স্ত্রীর মৃত্যুর পর অজ্ঞাতবাস থেকে ফিরে এসে নতুন উদ্যমে গ্রামে কারখানা খুলে বাজি বানানো শুরু করে সে। কারখানার সামনের প্রায় ১৫০ মিটার কাঁচা রাস্তা ঢালাই করে নেয় সে। কারখানার ভিতরেই তৈরি হয় গুপ্তঘর, যার ভেতর লুকোনো থাকত বাজি তৈরির মশলা।
তবে এতসব করেও বিস্ফোরণ আটকানো যায়নি। সেই ঘটনার পরেও ছোটখাটো দুর্ঘটনা ঘটেছে। ২০২২ সালের নভেম্বর মাসে অবৈধ বাজি উদ্ধারে নেমে ভানুকে গ্রেফতার করেছিল পুলিশ। বিপুল পরিমাণ নিষিদ্ধ বাজি উদ্ধার হয়েছিল তার কারখানা থেকে। তবে কিছুদিন পরেই জামিনে মুক্তি পেয়ে ফের ব্যবসা শুরু করে কৃষ্ণপদ। তারপর তো মঙ্গলবারের ভয়াবহ দুর্ঘটনা, এবং ভানু ফের উধাও।
এলাকার বাসিন্দারা দাবি করেন, মঙ্গলবার বিস্ফোরণের সময়ও বাড়িতেই ছিল ভানু। সে সময় কারখানায় ১৮ থেকে ২০ জন কাজ করছিলেন। তাঁদের মধ্যে সিংহভাগই মহিলা। বিস্ফোরণের পরেই ঘটনাস্থল থেকে পরিবার নিয়ে সরে পড়ে ভানু। ঘর লাগোয়া কারখানায় তখন আর্তনাদ আর বাঁচার আর্তি। সেসবে কান না দিয়েই গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে যায় বাজির রাজা কৃষ্ণপদ বাগ।
এগরায় তৃণমূলের প্রাক্তন পঞ্চায়েত সদস্যের বিরুদ্ধে ফুঁসছে গ্রাম, বিস্ফোরণের পরই পালিয়েছে মালিক