
শেষ আপডেট: 24 December 2018 11:46
অবিভক্ত বাংলায় বর্ধমানের রাজার খ্যাতি ছিল দেশজোড়া। রাজা ছিলেন প্রজা অন্ত প্রাণ। রাজা ছিলেন বিদ্যানুরাগী। রাজার নাম বিজয়চাঁদ মহতাব। রাজামশাই হাসপাতাল, কলেজ, রাস্তা অনেক কিছুই করেছিলেন। আর সারা শহরজুড়ে বসিয়েছিলেন ঘড়ি। সালটা ১৮৯৩। রাজার যখন নিতান্ত অল্প বয়স। রাজবাড়ির আঞ্জুমান কাছারির তোরণে বসিয়েছিলেন বিদেশি বেনসন টাওয়ার ক্লক। চর্তুমখ ঘড়ি। সুমিষ্ট জোরালো আওয়াজ তুলে শহরের দিন রাত জানান দিত সে ঘড়ি। বহু দূর থেকে নজরে আসতো সেই পেল্লায় ঘড়ি। তখন আর ক’জনেরই বা হাতে ঘড়ি ছিল! সবাই সময়ের হদিশ পেত সেই ঘড়ির আওয়াজে।
১৯২৭। হঠাৎ একদিন ঘড়ির হৃদস্পন্দন গেল থমকে। রাজ এস্টেট থেকে সঙ্গে সঙ্গে খবর গেল ওয়েস্ট এন্ড ওয়াচ কোম্পানিতে। কারিগর হিসেবে এলেন দুজন। যাদের একজন শেখ আবু তাহের। আঞ্জুমান কাছাড়ির ঘড়ি আবার সচল করলেন তিনি। রাজার আনন্দ আর ধরে না। বললেন, তাহের থেকে যাও। থাকবেন কি! তিনি যে তখন বেতন পান ৫৫ টাকা। রাজা প্রস্তাব দিলেন তাহের মাইনে পাবেন ৩০ টাকা। সঙ্গে রাজার সমস্ত শখের ঘড়ি দেখভাল করার জন্য আলাদা পারিশ্রমিক। থেকে গেলেন তাহের। তারপর থেকে রাজন্যপ্রথা বিলোপ পর্যন্ত রাজার ঘড়িওয়ালা তাহেরই।
গল্প আছে আরও অনেক। একদিন রাজা উদ্বিগ্ন হয়ে তলব করলেন তাহের সাহেবকে। তাহের যখন এলেন, একটা ট্যাঁক ঘড়ি নিয়ে পায়চারি করছেন রাজামশাই। ঘড়ির যান্ত্রিক টিকটিক আওয়াজ বন্ধ। ওই আওয়াজ না শুনলে না কি রাজার চোখে ঘুম আসে না। রাজার ঘুমের ব্যাঘাত তো চাট্টিখানি কথা নয়! তাহের রাত জেগে যন্ত্রপাতি এনে সারিয়ে দিলেন সেই সুইস মেড ঘড়ি। রাজার আনন্দ আর ধরে না। খুশি হয়ে রাজা দিলেন একমুঠো টাকা। বাড়ি এসে তাহের দেখেন পুরো সাতশো টাকা। তখন একভরি সোনা পনেরো টাকা। শহরে একবিঘে জমিও মেলে পনেরো বা সতেরো টাকায়।
বিজয়চাঁদের পর রাজা হলেন উদয়চাঁদ। তিনিও ঘড়িভক্ত। বেনসন টাওয়ার ক্লকের দম দেওয়া, দেখভাল সবই করতেন তাহের সাহেব আর তাঁর উত্তরসূরি। নজর রাখতেন অন্য ঘড়ির স্বাস্থ্যের উপরেও।
রাজপ্রথা বিলোপ হল৷ রাজা চলে যাবেন বর্ধমান ছেড়ে। যাওয়ার আগে কর্মচারীদের ডেকে বিলিয়ে দিলেন যে যা চাইল সব। টাকা জমি দামিদামি আসবাব। কিছু জমি পেল সরকার। যাতে গড়ে উঠল বিশ্ববিদ্যালয়, মহিলা কলেজ আরও অনেক কিছুই। আঞ্জুমান কাছারি এখন ভূমিবিভাগের দফতর। সবাইকে যখন সবকিছু দিলেন তখন তাহেরের কাছেও জানতে চাইলেন, তাঁর কী চাই? বিনয়ী তাহের নিরুত্তর। অনেক সাধ্যসাধনায় মুখ খুললেন। "আমি তো রাজার ইচ্ছেয় সবই পেয়েছি মহারাজ। আমার কিছুই চাই না। শুধু আপনার বাবার একটা ছবি দিন আমায়।" অভিভূত রাজা এক বহুমূল্য ফোটো দিলেন তাকে। বিলেতে তোলা রাজা বিজয়চাঁদের ছবি। সেই ছবি আজও সযত্নে রাখা এস এ তাহেরের দোকানে। আর রাখা সব শংসাপত্র।
মোবাইল ফোন এসে ঘড়ির দিন গেছে। এস এ তাহেরের স্মৃতি কিন্তু বেঁচে আছে। বিজয়চাঁদ রোডে তাঁর দোকানে এখন বসেন তাঁর নাতির ছেলে সৈয়দ মনিবুর রহিম। তবে লোকে তাঁকে তাহের সাহেব নামেই ডাকে। শিক্ষিত, আধুনিক। কিন্তু সবাই বলে ঘড়িওয়ালা। তাতে গর্বিত তিনি। এটাই যে তাঁর উত্তরাধিকার।
আর আঞ্জুমান কাছারির সেই বেনসন টাওয়ার ক্লক ? তার কী হল?
২০০৫ সালে একবার এই বন্ধ হয়ে যাওয়া ঘড়ি উদ্যোগ নিয়ে সারিয়েছিল বর্ধমান উন্নয়ন সংস্থা। ২০১৬ তে আবার ঘড়ি খারাপ হয়ে গেলে সংস্থার তরফে তা সারিয়ে চালু করা হয়। কিন্তু সম্প্রতি আবার থমকে গেছে হৃদস্পন্দন। তার ঘন্টাধ্বনি আর বাজে না। তবে এখন আর তাহের সাহেবের উত্তরপুরুষদের রাজার ঘড়ি সারাতে ডাকে না জেলা প্রশাসন। টেন্ডার ডেকে কাজ দেওয়া হয় বড় কোম্পানিকে।
বর্ধমান উন্নয়ন সংস্থার চেয়ারম্যান রবিরঞ্জন চট্টোপাধ্যায় অবশ্য জানান, আগেও এই ঘড়ি সারিয়েছেন তাঁরা। কিন্তু দুষ্কৃতীরা বারবার ঘড়ি নষ্ট করে দেয়। তাই পুলিশকে জানিয়েছেন। তিনি বলেন, “বর্ধমানের মানুষ চান। তাই আবার এই ঘড়ি সারানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে।”