
শেষ আপডেট: 10 May 2019 13:17
মধুরিমা রায় ও পিনাকপানি ঘোষ
ঘাটালে বামেরা যে দিন প্রার্থী ঘোষণা করল, পরক্ষণেই টুইটারে সৌজন্য বার্তা এসেছিল তাঁর। বিজেপি প্রার্থী ভারতী ঘোষের জন্যও সৌজন্যের কোনও কার্পণ্য করেননি তিনি। সিলভার স্ক্রিনের নায়ক দেব। রাজনীতির ককপিটেও তেমনই নায়কোচিত কথা বলছেন কে জানত! ঘাটালের বিদায়ী সাংসদ তথা উনিশের লোকসভা ভোটে সেখানে আবার তৃণমূলের প্রার্থী দীপক অধিকারী যেন কপিবুক। রাজনীতির তর্জা ইদানীং যখন খেউড়ে পরিণত হয়েছে, থাপ্পড়-ওঠবোস-তুই তোকারি--- মলিন করুণ চেহারা, দেব তখন সপাটে বলে দিলেন, “মাফ করুন, ভোট আদায় করতে অত নীচে নামতে পারব না”। ঘাটালের শিলাবতী নদীর ধারে পেল্লায় বাড়ি ‘রিভার ভিউ’। দুপুরের গনগনে রোদে ঝলসে তার কিছুক্ষণ আগেই ফিরেছেন। খাকি প্যান্টের উপর ব্ল্যাক হাফ স্লিভ টি শার্ট পরা। ফের বেরিয়ে পড়তে হবে এক্ষুনি। তবু মুখে সেই সিগনেচার হাসি মাখা। গলার স্বরও নামিয়ে রেখেছেন কয়েক দাগ। কথা প্রসঙ্গে সৌজন্যের বিষয়টি এল গোড়াতেই। দেবের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, সৌজন্যের প্রশ্নে আপনি সত্যিই কি আপসহীন? দিদি বলছেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে মাটির রসগোল্লা দেবেন! সুযোগ পেলে আপনিও কি তাই করবেন, নাকি বাগবাজারের রসগোল্লা..? জবাবটা অত দ্রুত আসবে ভাবা যায়নি। দীপক অধিকারী জবাব দিলেন চকিতে, “দেবের সৌজন্য দেব জানে। অন্যের সৌজন্য বার্তা আমি কী করে ক্যারি অন করব? আমার মাথার উপর আমার কাঁধের উপর তো তা ক্যারি করতে পারব না”। এই জবাবের মোদ্দা বার্তা, দিদি মাটির রসগোল্লার কথা বললেও দেব বলবেন না। এটা বুঝতে রকেট বিজ্ঞানের প্রয়োজন নেই। কিন্তু উপর্যুপরি ছবির শুটিং, প্রযোজনা, আর টলি পাড়া ও সিনেমা হলের স্ক্রিন পাওয়া নিয়ে রাজনীতির সঙ্গে যুঝতে যুঝতে এই দেব আগের থেকে অনেক পরিণতও। সম্ভবত বুঝে গেছেন, ব্যালেন্সটাও। তাই পরক্ষণেই বললেন, “দেখুন, প্রধানমন্ত্রী যখন স্পিডব্রেকার বলছেন, প্রধানমন্ত্রী যখন বলছেন চল্লিশটা এমএলএ নিয়ে যাবেন, সেটায় তো অভ্যস্থ নই। রাজীব গান্ধীকে যখন চোর বলছেন, সেটাতেও তো অভ্যস্থ নেই। আজকের রাজনীতিতে মানুষ নীচে থেকে আরও নীচে চলে যাচ্ছে। যাই হোক না কেন, রাজীব গান্ধী দেশের জন্য শহিদ হয়েছেন। এটা তো অস্বীকার করা যায় না। ” এখানেই থামলেন না দেব। বললেন, “ভোটটা শেষ হলেই দেখব, রাজীব গান্ধীর স্ট্যাচুতে প্রধানমন্ত্রী মালা দিয়ে ক্ষমা চাইছেন। কত নীচে নেমে ভোটটা আদায় করতে হবে এ বার তার প্রতিযোগিতা চলছে। এই রাজনীতিতে বিশ্বাস করি না। ভয় দেখিয়ে নয়, মানুষকে ভালবেসে যতটুকু পাব, ততটুকুই নয় পেলাম। না হলে এমন তো নয়, দিনটা শেষ হয়ে যাবে। ” ষোড়শ লোকসভার শেষ দিনের অধিবেশনে উপস্থিত ছিলেন দেব। সে দিন সংসদ থেকে বেরোনোর আগে সতীর্থ সাংসদদের নিয়ে ফটো তুলেছিলেন। তারপর হোয়াটসঅ্যাপ স্ট্যাটাসে লিখেছিলেন, সংসদে এটাই বুঝি আমার শেষ দিন। তার পর দশ মিনিটও কাটেনি ডিলিট করে দিয়েছিলেন সেই স্ট্যাটাস। কিন্তু সেলিব্রিটি তো! দশ মিনিটই জল্পনার জন্য যথেষ্ট। হাওয়ায় ছড়িয়ে যায় জল্পনা, দেব বুঝি এ বার প্রার্থী হতে চান না। তা হলে কি দিদিকে না বলে দিয়েছেন? দীপক অধিকারী জানালেন, “না না টিকিটের জন্য কখনওই লড়াই করিনি। এই মেয়াদের শেষ দিন ছিল, তাই লিখেছিলাম। তার পিছনে রহস্য থাকতে হবে কে বলল? আমি যদি ভারতী ঘোষকে প্রথম দিন শুভেচ্ছা বার্তা পাঠাতে পারি, তা হলে পার্লামেন্টের শেষ দিন টুইটও করতে পারি। দিজ ইজ লাইক হোয়াট আই অ্যাম। ” এবং ঘাটালে তৃণমূলের বাকিরা যাই বলুন বা করুন, এই দেব ষোল আনা তাঁর মতোই। প্রচারে বিজেপি প্রার্থী ভারতী ঘোষের নাম মুখেও আনছেন না। বিজেপি-র কথাও বলছেন না। বলছেন শুধু নিজের কথা। বলাবাহুল্য তার পেছনেও কৌশল রয়েছে। খেউড়ের বাজারে নিজেকে অনন্য করে রাখার। রয়েছে রাজনীতিও। দেবের জবাবেই তা স্পষ্ট। এই দেব ২০১৪-এর দেবের থেকে অনেক পরিণত। যেমন এই দেব অকপটে স্বীকার করছেন, শুটিংয়ের কাজের জন্য সংসদে উপস্থিতির হার কম ছিল। কারণ, তিনি জানেন, ভোটে এটা তাঁর বিরুদ্ধে ইস্যু। তিনি নিজেই যখন তা স্বীকার করে নিচ্ছেন তখন বিপক্ষের অস্ত্র স্বাভাবিক ভাবেই কিছুটা ভোঁতা হয়ে যায়। তারপরই আবার বলছেন, “আমার মনে হয় পার্লামেন্টে চিৎকার চেঁচামেচির থেকে মানুষের পাশে থাকা ভাল। যে কাজগুলোর দায়িত্ব আমি নিয়েছিলাম,-ঘাটাল মাস্টার প্ল্যানের অনুমোদন হয়ে গেছে, রাজনীতি করে টাকা যদিও আটকে রেখেছে দিল্লি, বালিচক ব্রিজ নিয়ে বলেছিলাম, টাকা অনুমোদন হয়ে গেছে, কাজ শুরু হয়ে গেছে। আরও একটা ব্রিজে কাজ শুরু হয়ে গেছে। দলও অনেক কাজ করেছে এখানে। এ বার মানুষ ভাবুক”। তারপর আবার ফিরে আসছে সেই প্রসঙ্গে,-রূপে তোমায় ভোলাব না, ভালবাসা দিয়ে ভোলাব! তাই ঘুরে ফিরে বলছেন, “রাজনীতিতে একটা বদল দরকার তো বটেই। তুমি একটা দল করো। তার মানে সব দল তোমার শত্রু নয়। পাড়ার পল্টুদা তোমার শত্রু, মোদীও শত্রু, দিদিও শত্রু- যে দিন এই মিথটা ভাঙবে, সে দিন দেশকে এগোনো যাবে। নইলে...। ” শুনে নিন কী বললেন দেব: https://www.youtube.com/watch?v=xXqQhRbsxmw&feature=youtu.be