শেষ আপডেট: 17 September 2020 14:24
হীরাপুর থানার অন্তর্গত ধেনুয়া গ্রামে প্রতিবছর এই মহালয়ার দিনেই কুমারী মহামায়া রূপে পূজিতা হন দেবী। গত ৪৭ বছর ধরে এই বিশেষ দুর্গা পূজার আয়োজন হয়ে আসছে। ভাদ্র মাসের অমাবস্যা তিথিতে অর্থাৎ পিতৃপক্ষের সমাপ্তির দিন হয় এই বিশেষ পুজো। একদিনের এই অকালবোধন দুর্গাপূজা দেখতে প্রতিবছরই দূর দূরান্ত থেকে ভিড় করে আসেন দর্শনার্থীরা।
এই বছর ধেনুয়া গ্রামের পুজোয় পুরোহিতের দায়িত্ব পালন করছেন হিরাপুর থানার আশিস কুমার ঠাকুর। তার কাছ থেকেই জানা গেলো প্রায় অর্ধশতাব্দী পুরোনো এই পুজোর বেশ কিছু অজানা ইতিহাস। ইংরাজি ১৯৭৩ সাল নাগাদ ধেনুয়া গ্রামে এই দুর্গাপুজো শুরু হয়েছিল কালীকৃষ্ণ সরস্বতী ঠাকুরের হাত ধরে। গ্রামে আজও তাঁর স্বহস্তে প্রতিষ্ঠিত দক্ষিণা কালীর মন্দির ও মহাদেবের মন্দির আছে। কালীকৃষ্ণ সরস্বতী ঠাকুর মারা যাওয়ার পরে, এই গ্রামেই তাঁকে সমাধিস্থ করা হয়।
তবে, প্রথম বছর অনুষ্ঠিত হওয়ার পর কোনও এক অজানা কারণে প্রায় তিন বছর বন্ধ ছিল এই পুজো। ১৯৭৭ সালে আসাম থেকে ফিরে এসে তেজানন্দ ব্রহ্মচারীর উদ্যোগে আবার নতুন করে শুরু হয় এই পুজো। ২০০৩ সালে তাঁর মৃত্যুর পর থেকে গৌড়িয় কেদারনাথ মন্দির কমিটির নেতৃত্বে মন্দির সংলগ্ন আশ্রমে পূজার আয়োজন করা হয়।
আশিসবাবু বলেন, দুর্গা এখানে সপরিবারে আসেন না৷ অর্থাৎ মা দুর্গার সঙ্গে তার চার ছেলেমেয়ে লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক ও গণেশ এখানে নেই। এমনকি থাকেন না মহিষাসুরও। মায়ের মূর্তির দুপাশে বিরাজমান কেবল তার দুই সখী জয়া ও বিজয়া।মায়ের সঙ্গে একত্রে পূজিত হন তারা। প্রশ্নের উত্তরে আশিসবাবু বলেন, মূলত বৈষ্ণবতন্ত্র মতে এই পুজো হয়ে আসছে। ঠিক যেমনটি বহুবছর আগে কালীকৃষ্ণ সরস্বতী ঠাকুর শুরু করেছিলেন, তার বিশেষ ব্যতিক্রম হয়নি। বৈষ্ণব মতে পুজো, তাই দেবীর আরাধনায় কোনও বলি হয় না এখানে।
মা দুর্গা কুমারী রূপে পূজিত হয় এই গ্রামে। দেবী মূর্তির এই আদল পূর্ববঙ্গে, অধুনা বাংলাদেশে দেখা গেলেও এ বঙ্গে বেশ অভিনব। অবশ্য কালীকৃষ্ণ ব্রহ্মচারীর আমলে মা না কি সিংহবাহিনীরূপেই পূজিত হতেন। তিনবছর পুজো বন্ধ থাকার পর আসামের তেজানন্দ মহারাজ মা'কে কুমারীরূপে প্রতিষ্ঠা করে পূজো শুরু করেন। তেজানন্দ ব্রহ্মচারীর আমলে বিভিন্ন এলাকার ২১ জন কুমারী মেয়েকে বেছে নিয়ে তাদের আলাদা আলাদা পুজোর আয়োজন করা হত।
নির্ধারিত চারদিনের বদলে এমন আগেভাগে মহালয়ার দিন কেন এই একদিনের দুর্গাপুজো, তা অবশ্য জানেন না পুজোর দায়িত্বে থাকা আশিসবাবু নিজেও। গ্রামের বাসিন্দারাও এ ব্যাপারে বিশেষ কিছুই বলতে পারলেন না। এ সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে আশিসবাবু বলেন, এর অন্তর্নিহিত রহস্য আমাদেরও জানা নেই। হতে পারে পুজো শুরুর আগে এ ব্যাপারে মায়ের কোনও স্বপ্নাদেশ ছিল।
গ্রামের মানুষের মতে মহালয়ার দিনে এই একদিনের দুর্গাপুজোও যেন নতুনভাবে দেবীর অকালবোধন। প্রতিবছর মহালয়ার দিনে ধেনুয়া গ্রামে অকালবোধন হয় দুর্গতিনাশিনীর। এই পুজোর হাত ধরেই যেন বাংলা জুড়ে শারদীয়া দুর্গোৎসবের সূচনা হয়।অবশ্য এই বছর পিতৃপক্ষের অবসান হলেও শারদীয় দেবী আরাধনার জন্য অপেক্ষা করতে হবে একটা গোটা মাস। আশ্বিন মাস মলমাস হবার কারণে এই বছর দূর্গাপূজা হবে কার্তিক মাসে। তার উপর করোনা আতঙ্ক আর কিছুদিন আগে শেষ হওয়া দীর্ঘ লকডাউনের কুফল তো আছেই। ফলে জৌলুস হারিয়েছে একদিনের এই বিশেষ দুর্গাপুজোও। সেবাইত কৃষ্ণচন্দ্রবাবু যেমন বলেন, করোনা আবহে এবছর পুজোয় দর্শনার্থীদের ভিড় কমানো হয়েছে। শুধু পুজো ও মায়ের সামান্য ভোগ বিতরণ করা হবে।