
শেষ আপডেট: 3 June 2023 07:38
দ্য ওয়াল ব্যুরো: '১২৮৪১ আপ করমণ্ডল এক্সপ্রেস'-এর (Coromandel Express) ঘোষণা শোনামাত্র হুড়োহুড়ি পড়ে যায় শালিমার স্টেশন জুড়ে। নিজের নিজের টিকিট নম্বর মিলিয়ে নির্দিষ্ট কামরার দিকে এগিয়ে যান শয়ে শয়ে মানুষ। দুপুর ৩:১৫-য় যাত্রীবোঝাই হয়ে ছেড়ে দেয় ট্রেন।
তবে এই ট্রেন যেন আর পাঁচটা দূরপাল্লার ট্রেনের চেয়ে সামান্য আলাদা। বেড়াতে যাওয়ার আনন্দে উজ্জ্বল মুখ প্রায় চোখে পড়ে না এই ট্রেনের যাত্রীদের মধ্যে। চোখে পড়ে না বাড়ি ফেরার স্বস্তিও। বরং দুশ্চিন্তা আর দুর্ভাবনাই লেপ্টে থাকে ভিড়ে। উদ্বেগের স্বরই শোনা যায় বেশি। যাত্রীদের মধ্যে বেশিরভাগই ধীরে ধীরে ট্রেনে ওঠেন, কেউ বা হুইলচেয়ারে। কারও কারও হাতে স্যালাইনের বোতল লাগানো অবস্থাতেও দেখা যায়। তাঁদের স্টেশনে ছাড়তে আসা পরিজনদের বিদায়ও বড়ই উদ্বেগে ছেয়ে থাকে। এ ট্রেন যে 'আনন্দযাত্রা'র নয়, তা যেন শালিমার স্টেশনেই স্পষ্ট হয়ে যায়।
কারণ, করমণ্ডল এক্সপ্রেসে করে মূলত দক্ষিণ ভারতে চিকিৎসার উদ্দেশেই যান বহু মানুষ। ট্রেনটি যেহেতু হাওড়ার শালিমার স্টেশন থেকে ছাড়ে, ফলে স্বাভাবিক ভাবেই ট্রেনের যাত্রীদের মধ্যে বেশিরভাগই এ রাজ্যের মানুষ। মূলত ভেলোরে এবং তা ছাড়াও চেন্নাই অ্যাপোলো-সহ দক্ষিণ ভারতের একাধিক বড় হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য যান তাঁরা। থাকেন প্রচুর শিশু ও বয়স্ক মানুষও।
রোগীদের ট্রেন শুধু নয়, সাধারণ গরিব মানুষেরও বড় ভরসা এই করমণ্ডল এক্সপ্রেস। কলকাতা থেকে চেন্নাই স্লিপার ক্লাসের ভাড়া ৬৩০ টাকা, থ্রি-এসি ১৬৭০ টাকা। ১৬৫৯ কিলোমিটার দূরত্বের তুলনায় সস্তাই বলা চলে। ২৭ ঘণ্টা যাত্রাপথের শেষে যেন আরোগ্য নিকেতনে পৌঁছন যাত্রীরা। দুরূহ রোগের সঙ্গে যুদ্ধের মাটি যেন সেখানেই মিলবে! যেন বড় এক ভরসার নাম এই করমণ্ডল এক্সপ্রেস!
শুধু সাধারণ রোগী ও রোগী পরিবার নয়, বাংলা থেকে দক্ষিণে কাজ করতে যাওয়া বহু পরিযায়ী শ্রমিকেরও ভরসা এই ট্রেনই। দুপুরবেলা পেট ভরে ভাত খেয়ে ওঠেন তাঁরা চিঁড়েমুড়ি বেঁধে, রাতটা ট্রেনে কাটিয়ে, পরের দিন বিকেলে পৌঁছে যাওয়া গন্তব্যে।
শুক্রবার বিকেলেও এই একই উদ্বেগ, দুশ্চিন্তা, ভরসা-- সব কিছু সঙ্গে নিয়েই দীর্ঘ হুইসল বাজিয়ে ট্রেন ছেড়েছিল শালিমার স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম। বিদায়ী পরিজনরা হাত নেড়েছিলেন ট্রেনের জানলায়, কেউ বা দু'হাত কপালে ঠেকিয়ে প্রার্থনা করেছিলেন, সুস্থ হয়ে ফিরুক ঘরের মানুষটা। তখনও কি কেউ জানতেন, কয়েক হাজার মানুষকে নিয়ে শুরু করা এই মঙ্গলযাত্রা আসলে কতটা অভিশপ্ত (Karamandal Express Accident)!
বিকেল পাঁচটা নাগাদ প্রথম স্টেশন খড়্গপুর পার হওয়ার পরে সন্ধে ছ'টা নাগাদ বালেশ্বর পেরোয় ট্রেন। এর কিছু পরেই পৌনে সাতটা নাগাদ বিকট এক শব্দ। সব যেন তালগোল পাকিয়ে গেল, তার পরেই নিশ্ছিদ্র অন্ধকার। মালগাড়ির সঙ্গে ধাক্কা লেগে ট্রেনের ১৮টি কামরা বেলাইন! ইঞ্জিনের পর থেকে স্লিপার ক্লাস, প্যান্ট্রি কার-সহ একাধিক বগি দুমড়েমুচড়ে গেছে।
এখনও পর্যন্ত ট্রেনযাত্রীদের মধ্যে মৃতের সংখ্যা প্রায় ৩০০। তা আরও বাড়তে পারে বলেই অনুমান। বেশিরভাগ যাত্রীই চিকিৎসার উদ্দেশেই চলেছিলেন চেন্নাই। অনেকে আবার জনমজুরি খাটতে। প্রচুর বয়স্ক ও শিশুর লাশ ইতিমধ্যেই উদ্ধার হয়েছে, এখনও ট্রেনের ভিতরে দলা পাকিয়ে আটকে আছে বহু দেহ। যুদ্ধকালীন তৎপরতায় চলছে উদ্ধারকাজ। একের পর এক দেহ সারিসারি শোয়ানো হচ্ছে পাশের মাঠে।
আরোগ্যযাত্রা যে এমন মৃত্যুপুরীতে গিয়ে শেষ হবে, কে জানত!
করমণ্ডলের জানলা কেটে বের করা হচ্ছে একের পর এক দেহ, বালেশ্বর যেন মৃত্যুপুরী