
শেষ আপডেট: 16 March 2023 14:02
দ্য ওয়াল ব্যুরো: বিতর্কের ঝড় উঠেছে শিক্ষার অঙ্গনে। প্রশ্ন উঠেছে, সিভিক ভলান্টিয়াররা (Civic Police) কি প্রাথমিকের ছাত্রছাত্রীদের (Primary Students) পড়াতে পারবেন? তাঁদের কি সেই যোগ্যতা আছে? বিতর্কের কেন্দ্রে বাঁকুড়া পুলিশের (Bankura Police) একটি বিজ্ঞপ্তি ও সেই জেলার পুলিশ সুপার বৈভব তিওয়ারির বিবৃতি। প্রাথমিক স্তরে ছাত্র পড়ানোর জন্য প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সিভিক ভলান্টিয়ারদের দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে বিজ্ঞপ্তি জারি করে বাঁকুড়া পুলিশ। তার পরে তা নিয়ে এমন সমালোচনার ঝড় উঠেছে, যে বিকাশ ভবন পর্যন্ত নড়ে বসেছে। বাঁকুড়া প্রশাসনকে জানিয়েছে, এখনই উদ্যোগী হয়ে এসব করতে হবে না। এ ব্যাপারে বার্তা দিয়েছেন স্বয়ং শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসু (Bratya Basu)।
এই নিয়ে নানা মহলে নানা মত রয়েছে স্বাভাবিক ভাবেই। অনেকেই জেলা পুলিশের এই উদ্যোগকে ভাল চোখে দেখছেন না, তাঁরা মনেই করছেন না এভাবে লেখাপড়া হয়। আবার অনেকে বলছেন, শিক্ষাক্ষেত্রে এমন অন্যরকম ভাবনা ভাবা যেতেই পারে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছিল, এটি একটি সামাজিক কর্মসূচি, যার নাম ‘অঙ্কুর’। পুলিশের সম্মিলিত এই কর্মসূচিতে ঠিক হয়েছিল, স্কুলের বাইরে প্রাথমিকের ছাত্রছাত্রীদের বিশেষ পাঠ দেবেন সিভিক ভলান্টিয়াররা। জেলার পুলিশ সুপার স্পষ্ট করে এও বলেছিলেন, অঙ্ক ও ইংরাজি শেখানোর ভার তুলে দেওয়া হচ্ছে এই প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সিভিক ভলান্টিয়ারদের কাঁধে।
এখানেই উঠেছে বড়সড় প্রশ্ন, সমালোচনা ও বিতর্কের ঝড়।
এই প্রসঙ্গে রবীন্দ্রভারতীর প্রাক্তন উপাচার্য তথা ভাষাবিদ পবিত্র সরকার বলেন, ‘সমগ্র বিষয়টিতে দেখা গেল প্রশাসনের মধ্যে চূড়ান্ত অরাজকতা চলছে। জেলা পুলিশ নির্দেশিকা জারি করছে অথচ শিক্ষা দফতর জানে না। তার মানে প্রশাসনের ডান বাঁ জানে না বাঁ পা কী করছে। মাথাও জানে না কী চলছে।’

তাঁকে এও প্রশ্ন করা হয়, প্রক্রিয়াগত ত্রুটির বাইরে যদি বিষয়টি নিয়ে আলোকপাত করতে হয় তাহলে আপনি কী বলবেন? সিভিক ভলান্টিয়াররা কি এইভাবে প্রাথমিকে পড়াতে পারেন? জবাবে তিনি বলেন, ‘তাঁদের অনেকেরই শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকতে পারে। কিন্তু স্কুলে পড়ানোর জন্য বিএড, ডিএলএডের মতো বিশেষ প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। নইলে পড়ানো মুশকিল।’
সরোজিনী নাইডু কলেজ ফর উইমেন-এর ইতিহাসের অধ্যাপক আজিজুল বিশ্বাস আবার বলছেন, 'এ দেশে প্রথা এবং প্রথাবহির্ভূত শিক্ষার প্রবাহ বরাবরই চলেছে। এভাবেই নৈশকালীন শিক্ষাব্যবস্থা তৈরি হয়েছিল। এতে আমার আপত্তি নেই। কিন্তু প্রথাগত শিক্ষার প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে, শিক্ষার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত না থাকা কাউকে এই কাজে লাগালে পড়াশোনা কতটা উৎকর্ষে পৌঁছবে, তা নিয়ে আমার একটা আপত্তির জায়গা আছে।'

আজিজুলবাবু মনে করিয়ে দিলেন, 'এমন একটা সময়ে এই আলোচনা, যখন গোটা দেশের বিভিন্ন রাজ্য নতুন জাতীয় শিক্ষানীতি চালু করেছে। এ রাজ্যেও ইতিমধ্যেই সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, ১০+২ ক্লাস স্ট্রাকচারকে ভেঙে ৫+৩+৩+৪-এই মডেল প্রয়োগের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। চাইল্ডকেয়ার নিয়ে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মানুষরাই সেক্ষেত্রে শিক্ষক হিসেবে যোগ দিতে পারবেন বলেও বলা হয়েছে। তো আমার প্রশ্ন, এই যে সিভিক ভলান্টিয়ারদের পড়াতে দেওয়া হবে প্রাথমিক স্তরে, তাঁদের কি আলাদা করে সেই প্রশিক্ষণ দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে? তা না হলে, রাজ্যের শিক্ষানীতির সঙ্গেই তো বিরোধিতা করা হয়।'
তবে বিশিষ্টজনেদের বড় একটা অংশ বাঁকুড়া পুলিশের এই সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করে দাবি করেছেন, সিভিক ভলান্টিয়ারদের দিয়ে প্রাথমিকে পড়ানো ছেলেখেলা ছাড়া কিছু নয়।
শিক্ষাবিদ মীরাতুন নাহারের কথায়, 'সিভিক ভলান্টিয়াররা যথাযথ বেতন এবং সম্মানের সঙ্গে চাকরি করেন কিনা, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। তাঁদের কাজ নিয়ে অনেক প্রশ্ন রয়েছে ইতিমধ্যেই। তাঁদের নিয়োগ নিয়ে সরকারি খামকেয়ালিপনার কথা বারবারই সামনে এসেছে। তার মধ্যে তাঁদের পড়ানোর দায়িত্ব দিয়ে এখানে-ওখানে আরও কিছু পাইয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করছে সরকার। প্রাথমিক শিক্ষা এ রাজ্যে সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ এবং সবচেয়ে উপেক্ষিতও। তাই সেখানে এঁদের কোনওরকমে যুক্ত করিয়ে খুশি করার ব্যবস্থা করা হচ্ছে বলে আমার মনে হয়।'

তিনি আরও বলেন, 'রাজ্য পুলিশের মাথায় কিন্তু রয়েছেন রাজ্যপ্রধান। তাহলে কোনও একটি জেলা পুলিশ থেকে কীভাবে এমন বিজ্ঞপ্তি বেরিয়ে গেল শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে, তা ভাবার অবকাশ আছে। এই রাজ্যের শাসকদলের নেত্রী মুখ্যমন্ত্রী পদের মর্যাদা দেন না। রাজ্য চালাতে তিনি ব্যর্থ। তিনি শিক্ষাব্যবস্থাকে ধ্বংস করছেন। তারই আরও একটি নমুনা হল সিভিক ভলান্টিয়ারদের পড়ানোর কাজ দেওয়া। আমার প্রশ্ন, শিক্ষকের কি অভাব ঘটেছে রাজ্যে? হাজার হাজার শিক্ষক যোগ্য বলে নির্ধারিত হয়েও রাস্তায় বসে আছেন দীর্ঘদিন ধরে। তাঁদের বঞ্চিত রেখে প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থাকে শেষ করার এই অধিকার সরকারকে কে দিয়েছে!'
রাজ্যে শিক্ষকের অভাব ঘটেছে কিনা, এই প্রশ্ন তুলেছেন বিদ্যাসাগর কলেজের বাংলা সাহিত্য বিভাগের অধ্যাপক অভিজিৎ লাহিড়ীও। তিনি বলছেন, পড়ানোর জন্য সিভিক কেন? যাঁদের নিয়োগ করার কথা, তাঁদের নিয়োগ করলেই তো হয়। তাঁর কথায়, 'আসলে আমাদের একটা ধারণা হয়েছে, প্রাথমিক শিক্ষা খুব সাধারণ ব্যাপার। তার জন্য কোনও দক্ষতা লাগে না। আসলে ওই কাজটিই সবচেয়ে কঠিন। এই কথাটা আমরা ভুলে যাই। শিক্ষাপরিসরে তাই এই শিক্ষাটা সবচেয়ে অবহেলিত। বুনিয়াদী শিক্ষা যদি শক্ত না হয়, তাহলে সেই গাছটা পোক্ত হবে কী করে? এই অবহেলার কারণেই ছোট থেকে মেধার মূল্যায়ন হয় না। সেখানেই সবচেয়ে বড় বিপদ।'

অভিজিৎবাবু জানিয়েছেন, শিক্ষক বলতে যা বোঝায়, তা হল, যিনি শেখান। শেখাতে গেলে নিজেকে জানতে হয়। এখন সিভিক ভলান্টিয়ার বলে যে ব্যবস্থাটি সরকার করেছে, তা হল শারীরিক ভাবে সক্ষম, কিন্তু লেখাপড়া করে হোক বা না করে, কোনও কারণে চাকরি পাননি, এরকম তরুণদের কাজ দেওয়া। তাঁদের কিছু দায়িত্ব পালন করতে দেওয়া হয়েছে, পথেঘাটে। এখন তাঁরা অঙ্ক-ইংরেজি পড়াতেই পারেন, অনেকেই হয়তো পড়াশোনায় খুব ভাল। কিন্তু প্রশ্ন, সেই সংখ্যা কত আর সেই ছাঁকনিই বা কী?
তাঁর কথায়, 'এই সিদ্ধান্ত যিনিই নিয়ে থাকুন, তাঁর উদ্দেশ্য সৎ, তাই নিয়ে আমার দ্বিমত নেই। কিন্তু তাঁর বাস্তবিক বোধ নেই। তাঁর কোনও ধারণা নেই, পড়ানো একটা ডেজিগনেটেড জব। পুলিশ, আইনজীবী, সাংবাদিকতার মতোই এটা একটা পেশা, যার জন্য নির্দিষ্ট প্রশিক্ষণ দরকার। আমার ধারণা, এই বিষয়টা বুঝেই বিকাশ ভবন নড়ে উঠেছে। এমনিতেই সামান্য বেতনে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করেন সিভিক ভলান্টিয়াররা। তাঁরা কী পড়াবেন! কেন পড়াবেন!'
অনুব্রতকে কচুরি খাওয়ানো কৃপা-তুফানকে দিল্লিতে তলব, নতুন সমন সুকন্যাকে