
শেষ আপডেট: 17 June 2023 12:18
দ্য ওয়াল ব্যুরো: বুক চেপে ধরে রাস্তায় বসে পড়েছিলেন বছর সত্তরের বৃদ্ধ। ছটফট করতে করতে সাহায্য চাইছিলেন তিনি। কম্পিত হাতটা বাড়িয়ে আঁকড়ে ধরার চেষ্টা করছিলেন কাউকে। বৃদ্ধের চারপাশে জনাকয়েক লোক দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। সকলেই দেখছিল কিন্তু হাতটা বাড়িয়ে দেওয়ার মতো প্রবৃত্তি হয়নি কারও। নিদেনপক্ষে বৃদ্ধকে একটু জল দিতেও এগিয়ে আসেননি কেউ। ছটফট করতে করতেই মৃত্যু হয় বৃদ্ধের, প্রকাশ্য দিবালোকে, বহু মানুষের চোখের সামনে। খাস কলকাতা শহরেই ঘটেছে এমন ঘটনা।
খুব সম্প্রতি ঘটেছে বিশাখাপত্তনমে। প্রকাশ্য দিবালোকে রাজপথে এক মদ্যপের হাতে মহিলাকে ধর্ষিতা হতে দেখেও কেউ সাহায্যে এগিয়ে আসেনি, এক জন মোবাইলে দৃশ্যটি ক্যামেরাবন্দি করেছে। এ কি শুধুই স্বার্থপরতা, না কি তার সঙ্গে ধর্ষকামের মিশেল!

বেপরোয়া বাসের ধাক্কায় আহত রক্তাক্ত পথচারীকে দেখেও নির্লজ্জভাবে ক্যামেরাবন্দি করার প্রয়াস বা রেলে পা কাটা যাওয়া মুমূর্ষুকে কাতরাতে দেখেও কেউ সাহায্য করতে না আসা–এইসবই ঘটছে অহরহ। কোনও অন্যায় ঘটতে দেখলে চার পাশের মানুষজন ঝাঁপিয়ে পড়ে না, সেটা কি শুধুই স্বার্থপরতা নাকি ভয়? বা কোনও ট্রমা? মনোবিজ্ঞান বলছে, আমরা যারা দূর থেকে দাঁড়িয়ে সব দেখি, এগিয়ে যাই না, তাদের একটা পোশাকি নাম আছে। ‘বাইস্ট্যান্ডার’ (Bystander effect)। বাইস্ট্যান্ডার হয়ে থাকার মধ্যে যে নিশ্চিন্ত নিরাপত্তার বোধ রয়েছে, তার মোহ এড়ানো খুব কঠিন।
মনোবিদরা বলেন, চোখের সামনে কোনও দুর্ঘটনা ঘটতে দেখে বা কেনও অন্যায় বা অপরাধমূলক ঘটনা ঘটতে দেখে অনেকেরই ট্রমা হয়। মানসিকভাবে পঙ্গুত্ব এসে বাসা বাঁধে, এটা এমন একধরনের মেন্টাল প্যারালাইসিস যা থেকে বেরিয়ে আসা খুব কঠিন। মনে মনে এগিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা থাকলেও, মন থেকে সেই সাহস বা উদ্যমটা থাকে না। এটা হল একটা দিক। আবার অন্য দিকও আছে। চোখের সামনে অপরাধ হতে দেখে বা কাউকে বিপদে পড়তে দেখেও সাহায্য করার মতো চিন্তা মাথাতেই আসে না অনেকের। এটাও একধরনের মানসিক প্রতিবন্ধকতা যা মনকে অনেক জটিল করে তোলে। আবার অপরাধ চোখের সামনে ঘটতে দেখে তাতে মজাও পান অনেকে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ধ্বংস করতে পারে মানবসভ্যতাকে! আর ১০ বছরের মধ্যেই ঘনিয়ে আসবে বিপদ

১৯৬৪ সালে বাড়ি ফেরার পথে নিউ ইয়র্কের রাস্তায় গুন্ডাদের হাতে আক্রান্ত হন কিটি জেনোভেস নামের তরুণী। অন্তত আধ ঘণ্টা এলোপাথাড়ি ছুরির আঘাত নেমে এসেছিল তাঁর উপর। আটত্রিশ জন প্রত্যক্ষদর্শীর কেউ ছুটে আসেনি সাহায্য করতে। পুলিশ ডাকেনি। মানুষের বিপদে পথচলতি মানুষের এড়িয়ে যাওয়ার সেই ঘটনা স্তম্ভিত করেছিল বিশ্বকে। মনোবিজ্ঞান সেই সময় এমন মানসিক ব্য়ধির নাম দিয়েছিল ‘বাইস্ট্যান্ডার এফেক্ট।’
১৯৬০ সালে জাপানের সোশ্যালিস্ট নেতা ইনজিমো আসানুমা টিভি ক্যামেরার সামনে বক্তৃতা দিতে দিতে খুন হয়ে যান। জনসভায় বহু মানুষ ভিড় করে সেই দৃশ্য দেখেছিলেন নীরবে। সাংবাদিকরা ফটাফট ছবি তুলে দ্রুত খবর করেছিলেন। কিন্তু একজনও বাঁচাতে ছুটে যাননি।

২০১৮ সালের ২৯ এপ্রিল ঝাড়খণ্ডে প্রকাশ্য দিবালোকে একটি বাচ্চা মেয়ের উপর নির্যাতন চালায় কয়েকজন গুণ্ডা, পথচারীরা দেখেও মুখ ফিরিয়ে চলে যান। ২০২১ সালে মুম্বই লোকালে সকলের সামনেই এক মহিলাকে নির্যাতিত হতে দেখেও মুখে কুলুপ এঁটেছিলেন সকলে। এমন ঘটনা রোজই ঘটছে, আকছার ঘটছে।
আবার উল্টোটাও দেখা যায়। অনেক সময় আমাদের চারপাশে এমন মানুষও দেখা যায়, যারা নিজেরা ঝুঁকি নিয়ে অন্যের বিপদে এগিয়ে আসেন। প্রাণ দিয়েও উপকার করেন। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয়, অবেডিয়েন্স এক্সপেরিমেন্টস’ (obedience experiments)। মার্কিন মনোবিজ্ঞানী স্টেনলি মিলগ্রাম প্রথমে বিষয়টি নিয়ে গবেষণা করেন। এজন্য একে মিলগ্রাম এক্সপেরিমেন্টসও বলা হয়ে থাকে।
আসলে আমরা শুধু বিস্মিতই হই। বাহবা যেটুকু দেওয়ার, দিই দূর থেকেই। নিজে তো নয়ই, নিজের পরিবারের কেউ এতটুকু ঝুঁকি নিলে তার হাত ধরে টানতে আমাদের তিলমাত্র দ্বিধা থাকে না। আবার উল্টোটাও ঘটে। বিপদে পড়তে দেখে প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে ছুটে যান অনেকেই। তবে তা নেহাতই কম। মনোবিজ্ঞান বলছেন, বাইস্ট্যান্ডার এফেক্ট কি শুধু মানসিক প্রতিবন্ধকতা নাকি সামাজিক ব্যধি, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। মানুষ নিজেকে নিয়েই চিন্তিত, ভীত, আতঙ্কগ্রস্ত। নিজের চারদিকে নিরাপত্তার প্রাচীর তুলে রাখতে চায়। বর্তমান সমাজব্যবস্থায় প্রায় প্রতি মানুষই অবসাদ, একাকীত্বে ভুগছে। উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা নিত্যদিনের সঙ্গী। সেডেন্টারি জীবনের ঘোড়দৌড়ে মানুষ এতটাই ব্যস্ত ও উদভ্রান্ত যে সেখানে নিজেরটুকু ছাড়া আর অন্য কিছু ভাবার পরিসরই নেই। বর্তমান সমাজব্যবস্থাই পরোক্ষে স্বার্থপরতার বীজ বপন করছে আর সেটাই হয়ে উঠছে মানসিক ব্যধির অন্যতম কারণ।