শেষ আপডেট: 2 November 2021 07:07
আগে জেনে নেওয়া যাক ভিগানিজম বা ভেগানিজম আসলে কী? এমন এক খাদ্যাভ্যাস যেখানে প্রাণীজ দ্রব্য সম্পূর্ণ এড়িয়ে চলা হয়। ভেগানরা যে শুধু মাছ, মাংস ডিম বর্জন করেন তা নয়। দুধ যেহেতু প্রাণীর কাছ থেকে আসে, তাই দুধ ও দুগ্ধজাত দ্রব্যও এড়িয়ে চলেন। ফলে প্রাণীর দুধ থেকে তৈরি মাখন, ঘি, পনির, ছানা কিংবা মধু— সমস্ত কিছুই তাঁদের ডায়েটে ব্রাত্য। ডায়েট শুধু নয়, পোশাক-পরিচ্ছদ বা নিত্য ব্যবহার্য সামগ্রীতেও প্রাণীজ সমস্ত কিছু তাঁরা বর্জন করেছেন। পশম, সিল্ক বা চামড়ার তৈরি কোনও জিনিসই ভেগানরা ব্যবহার করা করেন না। আসলে ভেগানিজম মানে হল এমন এক সংঘবদ্ধ লড়াই যা নিষ্ঠুর পশুহত্যাকে পৃথিবী থেকে নির্মূল করতে চায়। ভেগানিজম কোনও খাদ্যাভ্যাসের নাম নয়, ভেগানিজম এক বিপ্লবেরই নাম।
এখন কথা হল, নিরামিশাষি বলতে মাড়ওয়ারি, জৈন বা গুজরাতি সম্প্রদায়ের কথাই মাথায় আসত। ভেগানদের সংখ্যাও এঁদের মধ্যেই বেশি ছিল। মাছে-ভাতে বাঙালি ভেগান হয়ে যাবে এটা ভাবনাচিন্তারও বাইরে ছিল। কিন্তু এখন এই বিশাল পরিবর্তনটাই হয়েছে। বলা যায় বাঙালি সমাজেও এক বড় বিবর্তন হয়েছে গত কয়েক বছরে।
এ শহরে ভেগানিজম নিয়ে বহুদিন ধরেই প্রচার চালাচ্ছেন পশুপ্রেমী আলতাব হোসেন। অনেক সংগঠনের সঙ্গেও তিনি জড়িত। আলতাব বলছেন, কলকাতা জুড়েই ভেগানিজমের আন্দোলন বড় আকার নিয়েছে। তাঁর কথায়, সারা দেশে এই আন্দোলনে সবচেয়ে বেশি এগিয়ে আমাদের শহরই। অন্যান্য রাজ্যে বা শহরে ভেগানিজম নিয়ে এত বড় আন্দোলন বা কার্যক্রম হয়নি, যা কলকাতায় হচ্ছে।
বাঙালি সমাজে অনেকেই ভেগান হচ্ছেন বা হওয়ার চেষ্টা করছেন। এই আন্দোলনকে এগিয়ে যাচ্ছেন যাঁরা তাঁদের সংখ্যাও বাড়ছে। এখনই কলকাতা দুশোর বেশি মানুষ রয়েছেন যাঁরা নিজেরা ভেগান এবং ভেগানিজম নিয়ে নানা কার্যক্রম, মিটিং, মিছিল, কর্মসূচী করেন শহরের নানা প্রান্তে। ধর্মতলা, লেক মলের সামনে, দাগাকুঞ্জে ইতিমধ্যেই কয়েকটি কর্মসূচী নেওয়া হয়েছে। প্রাণীহত্যার নৃশংস ও নিষ্ঠুর দিক ব্যাখ্যা করে স্লোগান তুলেছিলেন সকলে। প্ল্যাকার্ড, ব্যানারে পশুহত্যার বিরোধিতা করা হয়েছিল। তাতে সাড়াও মিলেছিল অনেক। বহু মানুষ এই আন্দোলনের সমর্থনে এগিয়ে এসেছিলেন। আলতাব বলছেন, কলকাতাবাসীর মধ্যে এই উৎসাহ দেখে বোঝাই গেছে ভেগানিজম নিয়ে চর্চা এখন আর আড়ালে হয় না। গুটিকয়েক মানুষের মধ্যেও এই ভাবনা সীমাবদ্ধ নেই। বরং আরও বৃহত্তর আকারে ছড়িয়ে পড়েছে মানুষের মনে।
ভেগান ওয়ার্ল্ডের কর্ণধার মধুজা দে বললেন, ভেগানিজমের কয়েকটা দিক দেখা গেছে আমাদের শহরে। প্রথমত, যাঁরা পুরোপুরি ভেগান, দ্বিতীয়ত যাঁরা ভেগান হওয়ার চেষ্টা করছেন, তৃতীয়ত, ভেগান এই ধারণার সঙ্গে পরিচয়ের পরে মানসিকতা ধীরে ধীরে বদলাচ্ছে যাঁদের। এই আন্দোলন এখন বহুমুখী হয়েছে। শহরে ভেগান কমিউনিটি তৈরি হয়েছে যাঁরা পশুহত্যার বিরুদ্ধে জোরদার প্রচার চালাচ্ছেন। তাঁরা ক্যাম্পেন করেন, শহরের নানা প্রান্তে ফুডস্টল করেন, বিভিন্ন রকম কর্মসূচী নেন। তাতে সাড়া দিয়ে বহু মানুষের সমাগম হয়। ভেগানিজম আসলে কী তা জানতে ও বুঝতে চান অনেকেই।
মধুজা বলছেন, ১৯৪৪ সালে ডোনাল্ড ওয়াটসনের উদ্যোগে ভেগান সোসাইটি গড়ে ওঠে। ২০১০ থেকে ভেগান ডায়েট নিয়ে মাতামাতি শুরু হয়েছে। এখন এ শহরে ভেগানদের সংখ্যা বাড়ছে। ভেগান কমিউনিটি মানুষকে বোঝায় কতটা নিষ্ঠুরভাবে পশুহত্যা করা হয়। আমরা যে পোলট্রির মাংস বা ডিম খাচ্ছি, সেখানেও হাঁস, মুরগিদের বেশি ডিম বা মাংসের জন্য ইঞ্জেকশন দেওয়া হয় যা তাদের জন্য ক্ষতিকর। বেশিরভাগ খামারই অস্বাস্থ্যকর, অপরিচ্ছন্ন। গাদাগাদি করে পশুদের রাখা হয়। বাণিজ্যিক পশুপালনে প্রাণীদের যে কতটা কষ্টে রাখা হয় তাই বোঝানো হয়, ভিডিও দেখানো হয়।


প্রাণীহত্যা বিরোধী অভিযান তো বটেই, ভেগানিজমের সঙ্গে স্বাস্থ্য সচেতনতা ও পরিবেশ রক্ষার দায়িত্বও জড়িত।
ভেগান ডায়েট শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়। পুষ্টিবিদরাও বলেন, প্রচুর ভিটামিন, মিনারেলস ও অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট সমৃদ্ধ ভেগান ডায়েট বিভিন্ন ধরনের ক্যানসার, টাইপ টু ডায়াবিটিস, হার্টের অসুখ, ওবেসিটি, উচ্চ রক্তচাপের মত অসুখ প্রতিরোধ করতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নিচ্ছে। মধুজা বললেন, ভেগানরা সমস্ত প্রাণীজ প্রোটিন ত্যাগ করেছেন বলে খাদ্যরসিক নন এমনটা কিন্তু নয়। বরং, নিরামিষ খাবারের নানা রকম পদ তাক লাগিয়ে দেবে। আনাজপাতি দিয়েই বানানো চিকেনের মতো হট ডগ, মক ফিস, ভেগান মিষ্টি-- সুস্বাদু তো বটেই, স্বাস্থ্যকরও।
দেখে নিন কিছু ভেগান ডিশ
[caption id="attachment_2387486" align="aligncenter" width="236"]
ভেগান চিকেন হট ডগ (মাংস নয় কিন্তু)[/caption]
[caption id="attachment_2387487" align="aligncenter" width="256"]
ভেগান মক ফিশ[/caption]


বাঁ দিক থেকে, ভেগান রসমালাই, ভেগান মিষ্টি, ভেগান ক্রিম স্যুপ (দুধ বা দুগ্ধজাত দ্রব্য ছাড়াই)
আবার পরিবেশ রক্ষার প্রসঙ্গ যদি আসে তাহলে বলতেই হয়, ভেগানরা পরোক্ষ ভাবে নিজের পরিবেশ বাঁচানোরও কাজে সাহায্য করছেন। যেহেতু ভেগান ডায়েটে শাকসব্জি-আনাজই থাকে, তাই গাছও লাগাতে হয় বেশি পরিমাণে। সবুজ বাঁচাও অভিযানের যা বড় পদক্ষেপ। এর ফলে পরোক্ষ ভাবে গ্রিন হাউস গ্যাসের কুপ্রভাব রোখা সম্ভব হয়। এক একটি খামার থেকে প্রচুর পরিমাণে মিথেন গ্যাস বের হয়, যা বাতাসে কার্বন ডাই অক্সাইডের পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়। বিশ্ব উষ্ণায়ণের যা অন্যতম বড় কারণ। ফ্যাক্টরি ফার্মিং যদি কম করা যায়, পরিবেশ দূষণের ভারও অনেকটাই কমতে পারে।
পড়ুন দ্য ওয়ালের সাহিত্য পত্রিকা 'সুখপাঠ'