দ্য ওয়াল ব্যুরো: লেখা থামিয়ে দিয়েছিলেন নিজেই। যে বাংলা ভাষায় লেখকেরা সারাজীবন ধরে দিস্তে দিস্তে লেখাকেই সাফল্য মনে করেন সেখানে তিনি নিজেই নিয়েছিলেন অবসর। রবিবার জীবনকেও খারিজ করে সমুদ্রপারের অন্য কোনও টিয়ারঙ দ্বীপে চলে গেলেন রমাপদ চৌধুরী। তাঁর বয়স হয়েছিল ৯৬ বছর। দীর্ঘদিন ধরেই শ্বাসকষ্টে ভুগছিলেন তিনি।
শোনা যায় তাঁর চেয়ে প্রবীণ এক লেখক নাকি সস্নেহ পরিহাস করে রমাপদ চৌধুরী সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘না লিখেই লেখক।’ সত্যিই অনেকের তুলনায় খুব বেশি লেখেননি তিনি। তবু যা লিখেছেন তাতে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে চিরকালীন হয়ে গিয়েছে তাঁর নাম। তাঁর লেখা ‘লালবাঈ’ উপন্যাস পৌঁছেছে জনপ্রিয়তার তুঙ্গে। একসময় বাঙালি যুবক যুবতীদের মুখে মুখে ফিরত তাঁর ‘এখনই’ উপন্যাসের সংলাপ।
১৯৮৮ সালে ‘বাড়ি বদলে যায়’ উপন্যাসের জন্য পেয়েছেন সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার। ১৯৭১ সালে ‘এখনই’ উপন্যাসের জন্য রবীন্দ্র পুরস্কার। পেয়েছেন আনন্দ পুরস্কারও। তিনিই একমাত্র ভারতীয় লেখক যাঁর গল্প সংকলিত হয়েছে আমেরিকা থেকে প্রকাশিত লিটারারি অলিম্পিয়ানস গ্রন্থে। তাঁর লেখা ‘ভারতবর্ষ’ গল্পটিকে বাংলা ভাষার অন্যতম শ্রেষ্ঠ গল্প বলে ধরা হয়।
১৯২২ সালে জন্ম রেলশহর খড়গপুরে। শৈশব কেটেছে সেখানেই। তবে বাবার চাকরির সূত্রে ঘুরেছেন প্রায় গোটা ভারতবর্ষ। অল্প বয়স থেকেই চিনে ফেলেছিলেন এই দেশটাকে। আর সেই অভিজ্ঞতাই বারংবার ফিরে এসেছিল তাঁর লেখায়।
১৭-১৮ বছর বয়সে ‘যুগান্তর’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল ছোট গল্প ‘উদয়াস্ত’। তারপর পঁচিশ ছাব্বিশ বছর বয়স থেকে নিয়মিত গল্প লেখা। প্রথম উপন্যাস ‘প্রথম প্রহর’ ১৯৫৪ সালে। প্রকাশক সেই সময়ের বিখ্যাত ডিএম লাইব্রেরি। তার আগে অবশ্য প্রকাশিত হয়েছে চারটে গল্পগ্রন্থ। প্রথম তিনটে ছাপিয়েছিলেন নিজের কষ্টার্জিত টাকা দিয়েই। বলা বাহুল্য সেইগুলো পাঠক মহলে তেমন সমাদর পায়নি। অসম্ভব জনপ্রিয় হয় চতুর্থ গল্পগ্রন্থ ‘দরবারী’।
১৯৬০ সালে গ্রন্থ আকারে প্রকাশিত হয় তাঁর সব থেকে আলোচিত উপন্যাস ‘বন পলাশির পদাবলী।’ এর আগে এটা ধারাবাহিক ভাবে ‘দেশ’ পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল।
পরিচালক হিসেবে এই উপন্যাসকেই চলচ্চিত্রায়িত করেছিলেন উত্তম কুমার।
বেঙ্গল ট্রিনিটির অন্যতম মৃণাল সেন তাঁর ‘খারিজ’ সিনেমাটি করেছিল রমাপদ চৌধুরীর লেখা থেকে। পরে ‘বীজ’ উপন্যাস থেকে তিনিই করেছিলেন ‘একদিন অচানক’ ছবিটি। ‘এখনই’ সিনেমা করেছিলেন তপন সিনহা। তাঁর ‘এক ডক্টর কি মত’ ছবিটিও করা ‘অভিমন্যু’ গল্প থেকে।
প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে স্নাতক। পরে ইংরাজি নিয়ে স্নাতকোত্তর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে। চাকরি করেছেন আনন্দবাজার পত্রিকায়। সেখানে ‘রবিবাসরীয়’ পাতার সম্পাদকও ছিলেন তিনি।
সেই সময় বহু নবীন লেখককে খুঁজে নিয়ে তাঁদের লেখা ছাপাতেন তিনি।
রমাপদ চৌধুরীর মৃত্যুতে বাংলা সাহিত্যের পরিমণ্ডলে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। তাঁর মৃত্যুতে শোক ব্যক্ত করেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও।