
শেষ আপডেট: 19 March 2019 18:30
‘‘আমার স্ত্রী শুধু নন, আমার ছ’বছরের ছেলে প্রায়নও পাখিদের বিশেষ যত্নআত্তি করে। শহরের কোলাহলে, বহুতলের বাড়বাড়ন্তে পাখিদের অবস্থা বিপন্ন। বিশেষত চড়াই তো হারিয়ে যেতেই বসেছে। তাদের ফিরিয়ে আনতেই আমাদের এই প্রচেষ্টা,’’ বলেছেন কুন্তলবাবু। বিশ্ব চড়াই দিবস তো একটা উপলক্ষ্য, দীর্ধদিন ধরেই নীরবে চড়াই-বাঁচাও অভিযান শুরু করেছেন তাঁরা। শুরুটা করেছেন নিজেদের বাড়ি থেকেই। এলাকার লোকজনকে বাড়িতে বার্ড ফিডার বানানোর পরামর্শ দেন তাঁরা। কী ভাবে বানাতে হবে তাঁর উপায়ও বাতলে দেন।
[caption id="attachment_88362" align="aligncenter" width="630"]
কুন্তল এবং পিয়ালী ঘোষ[/caption]
কুন্তলবাবু জানিয়েছেন, প্রচণ্ড গরমে পাখিরা এমনিতেই আশ্রয় খোঁজে। একমুঠো চাল যদি বাড়ির এক কোনে ফেলে রাখা যায়, তাহলে তারা ঠিকই আসবে। আর চটজলদি বাড়ির বাতিল জিনিসপত্র দিয়েই যদি বানিয়ে ফেলা যায় বার্ড ফিডার, তাহলে তো কথাই নেই। ‘‘ভোর হতেই ঝাঁকে ঝাঁকে আসে পাখির দল। মনের সুখে তারা খাবার, জল খায়। বেলা গড়াতেই কমে পাখির ভিড়, ফের বিকেলে দল বেঁধে তারা হাজির হয়,’’ কুন্তলবাবু জানিয়েছেন, কয়েক বছরের মধ্যে পাড়াগুলো একাধিক মোবাইল টাওয়ারে ঘেরাও হয়ে পড়েছে। বাতাসে সেই মোবাইলের সেই জোরাল তরঙ্গে ক্রমশ চড়ুইয়েরা বিপন্ন হয়ে প্রাণ হারিয়েছে। প্রভাব পড়েছে তাদের প্রজননেও। জলপাইগুড়িতে চড়াইয়ের সংখ্যা অনেক কমে গেছে।
https://www.youtube.com/watch?v=y0VMz9u_VnE&feature=youtu.be
বাজারে একটি ফিডারের দাম প্রায় ৫০০ টাকার কাছাকাছি, কুন্তলবাবুর কথায়, ‘‘বেশিরভাগ লোকজনই দাম দেখে পিছিয়ে যায়। অথচ আমি ঘরোয়া উপকরণ দিয়েই মাত্র ২৫ টাকায় ফিডার বানানো শেখাই। ছোটদের বিভিন্ন নেচার স্টাডি ক্যাম্পে গিয়েও এমন আধার বানানো শিখিয়ে এসেছি। বাচ্চারা খুবই উৎসাহ নিয়ে এই কাজ করে।’’
চড়াই হারিয়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ নগরায়ন। এমনটাই জানিয়েছেন পরিবেশ বিজ্ঞানীরা। পুরনো বাড়ি ভেঙে ফেলা ছাড়াও মোবাইল টাওয়ারগুলো চড়াইয়ের জন্য সমস্যা তৈরি করেছে। পক্ষী বিশেষজ্ঞদের মতে, চড়াইয়ের শরীরে মোবাইল টাওয়ারের ইলেকট্রোম্যাগনেটিক রশ্মি নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। প্রজননে প্রভাব ফেলে। দেখা গেছে, ডিম পুষ্ট না হওয়ার দরুণ ছানা ফুটে বের হওয়ার আগে চড়াইয়ের ডিম ফেটে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। তা ছাড়া চাষের জমিতে কীটনাশকের অত্যধিক ব্যবহার পাখিদের জন্য খাদ্য সঙ্কট তৈরি করছে। গবেষণায় দেখা গেছে, কীটনাশকের ব্যবহারে ছোট কীটপতঙ্গ মরে গিয়ে খাবারে টান পড়েছে।
চড়াই বাঁচাবার তাগিদেই ২০১০ সাল থেকে এই দিনে বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে চড়াই দিবস। ২০১৩ সালে বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমার চড়াইকে ‘রাজ্য-পাখি’ ঘোষণা করে সংরক্ষণের বার্তা দেন। ব্রিটেনের ‘রয়্যাল সোসাইটি অব প্রোটেকশন অব বার্ডস’ লাল তালিকাভুক্ত করেছে চড়াইকে। ব্রিটিশ ট্রাস্ট ফর ওরনিথোলজি-র পক্ষ থেকেও বছর কয়েক আগে লন্ডনের বাসিন্দাদের মধ্যে বিশেষ প্রচার চালানো হয়েছিল। তবে ছবিটা ধীরে ধীরে বদলাচ্ছে বলেই মত পরিবেশপ্রেমীদের। লন্ডন, কলকাতা-সহ ভারতের বেশ কিছু বড় শহরেই চড়াইয়ের সংখ্যা আবার বেড়েছে। বাংলার ঘরে ঘরে আবার কবে পরিচিত কিচিরমিচির ফিরে আসবে চলছে তারই প্রতীক্ষা।