বুদ্ধদেব বেরা, ঝাড়গ্রাম : মাটির নিকোনো উঠোন। দেওয়ালও। সাধ ও সাধ্যের রঙের পোচ রয়েছে কোথাও কোথাও। তবে বাধ্যবাধ্যকতার দেওয়াল লিখন নজরে আসে না। নিজস্ব সংস্কৃতির বাহারি পতাকা উড়লেও অনুপস্থিত লাল, গেরুয়া বা তিরঙ্গা। বাসিন্দাদের অধিকাংশই যে জানেন না ভোট আসছে আবার। জিজ্ঞেস করলেই উত্তর আসছে, “আবার কীসের ভোট, এই তো সবে পঞ্চায়েত ভোট হল।” চৈত্রের দুপুরে তাই এখানে শুধুই খর রোদের তাপ। ভোটের উত্তাপ এখনও ছুঁয়েই যায়নি বেলপাহাড়ির প্রত্যন্ত গ্রামগুলিকে।
ঝাড়গ্রাম-পুরুলিয়া ৫ নম্বর রাজ্য সড়ক লাগোয়া বাঁশপাহাড়ি, চাকাডোবার পথে এগোতে হাতে গোনা কিছু দেওয়াল লিখন নজরে এলেও ভুলাভেদা গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকায় বিভিন্ন বাড়ির দেওয়ালে সেই পঞ্চায়েত ভোটের প্রচার। বেলপাহাড়ি থেকে ১৭ কিমি দূরে ভুলাভেদা গ্রাম পঞ্চায়েতের মাজুগোড়ায় দোকান সামলাচ্ছেন অজয় সিং। দোকান বলতে দেশলাই, বিড়ি, বিস্কুট, লজেন্স, চানাচুর, চালের ইতিউতি পসরা। ভোট দেবেন কিনা জানতে চাইতে অজয়ের অবাক প্রশ্ন, “ওই তো ভোট হল পঞ্চায়েতে। ভোট দিলাম তো। আবার কেন ভোট দেব?” বহু চেষ্টাতেও লোকসভা ভোট ঠিক কী, বোঝানো যায়নি।
বেলপাহাড়ি ব্লক সদর থেকে ৬ কিমি দূরে বালিচুয়া, খুদিমহুল পর্যন্ত দু’ এক জায়গায় তৃণমূল প্রার্থী বীরবাহা সরেন টুডুর সমর্থনে দেওয়াল লিখন রয়েছে। কিন্তু যত এগোনো গেছে খট্টাধারা থেকে ওদলচুয়া, মাকড়ভুলা, বুড়িঝোড়, কাঁকড়াঝোড় হয়ে আমলাশোল ও আমঝর্নার পথে, প্রতিদিনের যন্ত্রণায় ক্লিষ্ট মুখ আর নিরুত্তাপ জীবনের ছবি।
বিস্তীর্ণ এলাকায় বর্ষার মরসুমে একবার চাষ। বাকি সারা বছর জঙ্গল থেকে কখনও পাতা কখনও মহুল ফল কুড়িয়ে, কখনও বাবুই ঘাসের দড়ি বুনে পেটের ভাত জোগাড়ের চেষ্টা। সবসময় যে তাতে পেট ভরে, তেমনটাও নয়, তখন ভরসা জঙ্গল থেকে আনা কচু, মেটে আলু। ভোট দিলে তাঁদের উন্নয়ন হবে এমন ভাবনাটাও মাথায় আসে না। ময়ূরঝর্না, বগডুবা, চিটামটি, মিনারডি, জবলা, দলদলি, তেলিঘানা, ওড়লি কাল্লাডাবর, কাশমার, গ্রামের নাম বদলায়, কিন্তু ছবিটা বদলায় না। তাই ছুঁয়ে যায় না ভোটও।
কাশমার গ্রামে বাড়ির দাওয়ায় বসে বাবুই ঘাসের দড়ি পাকাচ্ছিলেন ভবানী সর্দার। ভোটের কথা বলতেই নিরুত্তাপ মুখে প্রশান্ত হাসি। “এখন আবার কী ভোট? কেউ তো ভোটের জন্য আসেনি। দেওয়ালেও তো কিছু লেখা হয়নি।” মিনারডি গ্রামের বিপন সরেনের কথায়, “ভোট বুঝি? দেওয়ালে তো কেউ কিছু লেখেনি।”
ওড়লি গ্রামে সর্দার পাড়ায় সিপিএম প্রার্থী দেবলীনা হেমব্রমের সমর্থনে একটি দেওয়াল লিখন রয়েছে। তবে মাহাত পাড়ার কোনও বাসিন্দা জানেন না এখন আবার কি ভোট? বাদল মাহাতর কথায়, “কবে ভোট ওসব জানি নাই। আমরা গরীব মানুষ। ভোট যেদিন দিতে যেতে বলে সেদিন ভোট দিতে যাই।”
যেখানে দেওয়াল দেখে গ্রামের মানুষ বুঝতে পারেন ভোট এসেছে, সেখানে দেওয়াল লিখনই বা নেই কেন?
বেলপাহাড়ি ব্লক তৃণমূলের সভাপতি বুবাই মাহাত বলেন, “ওই সব এলাকার কর্মীদের পোস্টার ও পতাকা দিয়েছি। আস্তে আস্তে দেওয়াল লিখন শুরু হয়েছে। প্রত্যন্ত গ্রামগুলিতে প্রচারও শুরু হবে।” সিপিএমের জেলা সম্পাদক পুলিনবিহারী বাস্কে বলেন, “আমাদের লেখার লোক কম থাকায় একটু সমস্যা হয়েছে। আমাদের প্রচার কম হলেও গরীব মানুষ আমাদেরকেই ভোট দেবেন।” ঝাড়গ্রাম জেলা কংগ্রেসের সভাপতি সুব্রত ভট্টাচার্য জানান, সামনের সপ্তাহ থেকে প্রত্যন্ত গ্রামগুলোতে প্রচার শুরু করবেন তাঁরা।
বিজেপির ঝাড়গ্রাম জেলা সাধারণ সম্পাদক অবনী ঘোষ বলেন, “বেলপাহাড়ির ওইসব এলাকা এখনও পিছিয়ে রয়েছে। বামফ্রন্ট পিছিয়ে রেখেছিল। তৃণমূলও কথা দিয়ে কথা রাখেনি। জঙ্গলমহলের নিরীহ আদিবাসী মানুষদের ভোট নিয়ে বোকা বানিয়েছে। আমরাও গিয়ে দেখেছি ভোট নিয়ে ওদের কোনও আগ্রহ নেই। তবে আমরা দেওয়াল লিখন শুরু করব। মানুষের কাছে একবার সুযোগ চাইছি।”