বুদ্ধদেব বেরা, ঝাড়গ্রাম : ফের নেকড়ে কামড়ানোর পর ভ্যাকসিন চলাকালীন মৃত্যু হল এক প্রৌঢ়ার। এ বারও ঘটনাস্থল সেই ঝাড়গ্রাম। এবং জলাতঙ্কেই ওই মহিলার মৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগ।
গত ১৪ ফেব্রুয়ারি ঘৃতখামের জঙ্গলে বউমা বালিকা মাহাতকে নিয়ে শালপাতা কুড়োতে গিয়েছিলেন বছর ষাটের সুশীলা মাহাত। তখনই নেকড়ের হামলার মুখে পড়েন তাঁরা। দুজনকেই কামড়ে ক্ষতবিক্ষত করে দেয় নেকড়েটি। দুজনকেই ঝাড়গ্রাম সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ২২ ফেব্রুয়ারি হাসপাতাল থেকে ছুটি দেওয়া হয় শাশুড়ি ও বউমাকে। ২৮ তারিখ তাঁরা হাসপাতালে গিয়ে অ্যান্টি র্যাবিস ভ্যাকসিনের আরও একটি ডোজও নিয়ে আসেন বলেও জানিয়েছেন বাড়ির লোকজন। তারপরেও শনিবার ফের বমি করতে শুরু করায় আবার ঝাড়গ্রাম হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় সুশীলা মাহাতকে। জলাতঙ্কের উপসর্গ টের পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে বেলেঘাটা আইডি হাসপাতালে রেফার করে দেওয়া হয়। সেখানেই রবিবার ভোর সাড়ে চারটে নাগাদ মৃত্যু হয় সুশীলার।
ওই প্রৌঢ়ার নাতি পাপন মাহাত বলেন, “বেলেঘাটা হাসপাতালের চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, ঝাড়গ্রাম হাসপাতালে চিকিৎসা ঠিকমতো হয়নি। ওঁদের শরীরে যে সমস্ত জায়গায় নেকড়ের কামড়ে ক্ষত হয়েছিল, সেই সব জায়গায় ইঞ্জেকশন দেওয়া দরকার ছিল। তা দেওয়া হয়নি। ঠাকুরমাকে দেখে ভয়ে আমার মাকেও বেলেঘাটা হাসপাতালে দেখাতে নিয়ে গিয়েছিলাম।”
জানুয়ারি মাসের শেষে একইভাবে মৃত্যু হয়েছিল জামবনির বাঁকাশোল গ্রামের বাসিন্দা ললিত হেমব্রমের। নেকড়ে কামড় দেওয়ার ২০ দিন পর। ভ্যাকসিন চলাকালীন। গত ৭ জানুয়ারি সন্ধের সময় বাড়ির সামনে বসে আগুন পোহাচ্ছিলেন ললিত ও তাঁর কাকা সনাতন হেমব্রম। আচমকাই একটি নেকড়ে এসে ক্ষতবিক্ষত করে দেয় তাঁদের। ঝাড়গ্রাম জেলা সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালে চিকিৎসার পর সুস্থ হয়ে ১৭ তারিখ বাড়ি যান তাঁরা। ২৪ তারিখ আচমকাই অসুস্থ হয়ে পড়েন ললিত। সঙ্গে সঙ্গেই তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় ঝাড়গ্রাম হাসপাতালে। পরের দিন সেখান থেকে তাঁকে পাঠানো হয় মেদিনীপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। কিন্ত জলাতঙ্ক সন্দেহ করেই ললিতকে রেফার করা হয় বেলেঘাটা আইডি হাসপাতালে। রেফারের সময় ‘সাসপেক্টেড র্যাবিস’ বলেই উল্লেখ করেন সেখানকার চিকিৎসকরা। কিন্ত নিয়ে যাওয়ার আগেই মৃত্যু হয় ললিতের।
ভ্যাকসিন নেওয়া সত্ত্বেও কী ভাবে মৃত্যু, তার উত্তর খুঁজছিলেন ললিতের পরিবার। এ ব্যাপারে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ডঃ রণবীর ভৌমিকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানিয়েছিলেন, এমন ঘটনা একেবারে অস্বাভাবিক নয়। কুকুর বেড়াল হোক আর নেকড়ে বা বাঘই হোক, কামড়ে ক্ষত যখন খুব গভীর হয় তখন বুঝতে হবে তা ডিপ টিস্যু পর্যন্ত গিয়েছে। অ্যান্টি র্যাবিস ভ্যাকসিন তো নিতেই হবে, কিন্তু প্রথমেই কলের জলের তোড়ে জায়গাটা ধুয়ে দেওয়া দরকার। ক্ষতের চারপাশে ইমিউনো গ্লোবিউলিন ইঞ্জেকশন দিয়ে দ্রুত জীবাণুমুক্ত করাটাও অন্যতম কর্তব্য। না হলে ভ্যাকসিনের কাজ শুরু হওয়ার আগে র্যাবিসে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এ ক্ষেত্রে এমন কিছু হয়েছে কি না দেখা দরকার বলেও মন্তব্য করেছিলেন তিনি।
তবে ঝাড়গ্রাম সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালের সুপার ডঃ মলয় আদক দাবি করেছিলেন, ললিত ও সনাতনকে নেকড়ে কামড়ানোর পর যখন এই হাসপাতালে আনা হয়েছিল তখন নিয়মমাফিকই তাঁদের সমস্ত রকম চিকিৎসা হয়। সুশীলা মাহাত ও তাঁর পুত্রবধূকেও নিয়মমাফিক চিকিৎসা করেছেন তাঁরা। ইমিউনো গ্লোবিউলিন ইঞ্জেকশন দেওয়া হয়েছে বলেও তাঁর দাবি। তারপরেও কি ভাবে এমন ঘটনা ঘটছে তা খতিয়ে দেখা দরকার বলে জানান তিনি। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “এমন হিংস্র পশু কামড় দেওয়ার পর হাসপাতালে আনতে দেরি হলেও অনেক সময় বিপদের সম্ভাবনা থাকে। এ ক্ষেত্রে তেমন কিছু হয়েছিল কি না দেখা দরকার।”
এ দিকে ঝাড়গ্রামের ডিএফও বাসবরাজ হেলোইচ্চি বলেন, যে মহিলা মারা গিয়েছেন, ক্ষতিপূরণ বাবদ তাঁর পরিবারকে চার লক্ষ টাকা দেওয়া হবে।