শুভদীপ পাল, বীরভূম : দুবরাজপুরের প্রত্যন্ত গ্রাম সাহাপুর। গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে গিয়েছে বক্রেশ্বর নদী। অনেক কিছুই নেই এই প্রত্যন্ত গ্রামে। নেই মৃতদেহ দাহ করার শ্মশানও। এই গ্রাম বা আশেপাশের কেউ মারা গেলে নিয়ে যেতে হয় ৩৭ কিলোমিটার দূরে জয়দেবের ঘাট বা ৪০ কিলোমিটার দূরে বক্রেশ্বর শ্মশানে। এত দূর নেওয়ার সাধ্য নেই যাঁদের, তাঁরা গ্রামের প্রান্তে বক্রেশ্বর নদীর পাড়েই সৎকার করতেন মৃতদেহ। এ ভাবেই চলে আসছে এতকাল। এ বার বদলে যেতে চলেছে ছবিটা। আর যে মানুষটার হাত ধরে এই পরিবর্তন, তাঁর নাম শেখ ফারুক। তাঁর দেওয়া দেড় বিঘে জমিতেই এ বার শ্মশান হচ্ছে সাহাপুর গ্রামে।
লালমাটির বীরভূমে মাটির সুর শুনে আরও অনেকেৱ মতো বড় হয়েছেন তিনি। মনে গেঁথে গেছে 'মাটির দেহ মাটি হবে'— সেই গান। তাই ধর্ম, সম্প্রদায় ,এই শব্দগুলোকে হারিয়ে দিয়েই এগোতে চান শেখ ফারুক। হিন্দুদের শ্মশান তৈরির জন্য জমি দিতে তাই দু’বার ভাবতে হয়নি তাঁকে।
দীর্ঘদিন ধরেই দেখছেন, হিন্দুদের কেউ মারা গেলে বক্রেশ্বর নদীর পাড়েই দাহ করা হয় তাঁদের। কারণ গ্রামের সকলের পক্ষে দূর বক্রেশ্বর অথবা জয়দেবের ঘাটে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়ে ওঠে না। আবার গ্রামের পাশে বক্রেশ্বর নদীর পাড়ে যেখানে মৃতদেহ দাহ করা হয় সেখানে যাওয়ার জন্য নির্দিষ্ট কোনও রাস্তা নেই। ফলে বর্ষার সময় চরম দুর্গতি মধ্যে পড়তে হয় এলাকার মানুষকে।
দুবরাজপুর পঞ্চায়েত সমিতির তরফ থেকে জানানো হয়েছিল, জায়গা পেলে শ্মশানে যাওয়ার জন্য একটি মসৃণ পথ এবং শবদাহ করতে আসা মানুষদের বিশ্রামের জন্য একটি ঘর তৈরি করে দেওয়া হবে। পঞ্চায়েত সমিতি থেকে আশ্বাস তো মিলেছিল কিন্তু অভাব ছিল জমির। এমন সমস্যায় গ্রামের মানুষেরা কোনও উপায় খুঁজে না পেয়ে গ্রামের বাসিন্দা পেশায় ছোট ব্যবসায়ী শেখ ফারুকের কাছে জমি দানের জন্য আবেদন জানান। সেই আবেদনে যে সাড়া মিলবে, তা ভাবতে পারেননি তাঁরা।
গ্রামবাসীদের আবেদনে সাড়া দিয়ে এলাকায় তাঁর প্রায় দেড় বিঘা জমি, যার বর্তমান আনুমানিক মূল্য ১০ লক্ষ টাকা সেই জমি তিনি নির্দ্বিধায় দান করে দেন। সেখানে ইতিমধ্যেই রাস্তা তৈরির প্রাথমিক কাজ শুরু হয়ে গেছে। শেখ ফারুক বললেন, "ধর্মের মধ্যে বিভেদ করে লাভ তো নেই। পৃথিবীতে মানুষই হলো সব থেকে বড় ধর্ম। আমি এলাকার সাধারণ মানুষদের অসুবিধার কথা ভেবে এই জমি দান করেছি। সেই জমিতেই ৮০০ ফুট লম্বা এবং ১২ ফুট চওড়া একটি রাস্তা তৈরি হবে। এছাড়াও আরও একটি জমি দেওয়া হয়েছে যেখানে সৎকার করতে আসা মানুষেরা বিশ্রাম নেবেন তাদের জন্য ঘর বানানো হবে।"
শেখ ফারুকের জমি দানে স্বস্তিতে এলাকার হিন্দু পরিবারগুলি। স্থানীয় বাসিন্দা জীবনকুমার মন্ডল জানান, "আমরা ওনার কাছে আবেদন করেছিলাম। উনি কোনও দ্বিধা না করেই প্রায় দেড় বিঘা জমি আমাদের শ্মশানের জন্য দান করেছেন। চারপাশের হানাহানির পরিবেশে নজির গড়লেন উনি।’’