প্রতীক সেন, বর্ধমান : রাজা নেই তাও প্রায় ছ দশক। তবুও এখনও রাজ শহর নামেই পরিচিতি। রাজার দানেই বিশ্ববিদ্যালয় এই শহরে। হাসপাতাল, অভয়ারণ্য, মায় প্রশাসনিক ভবনও। বাসিন্দাদের গর্বও আছে তাই। তবুও প্রজাতন্ত্রে সবাই রাজা, এ ভাবনাই যেন শহরের পরতে পরতে।
নিজেদের রাজার শহরের মানুষ ভেবে এখনও গর্ববোধ করেন বর্ধমানের মানুষ। প্রাচীন এ শহরের প্রতিটি ইঁটের পাজায় যেন প্রচ্ছন্ন রাজবাড়ির প্রভাব। তবুও ভোটে দাঁড়িয়ে সব সময় জয়ী হন না রাজা। আবার জনতার প্রখর চেতনার ভরসায় জনপ্রিয় বাম নেতাকে হারিয়ে ভোটে জেতেন মহারানি।
এ বারেও বেজেছে ভোটের দামামা। জন প্রতিনিধিকে বেছে নেওয়ার প্রস্তুতি শুরু করে দিয়েছেন বর্ধমান শহরের বাসিন্দারা। ইতিহাসকে ছুঁয়ে থাকতে ভালবাসেন যাঁরা, এই অবসরে একবার মুখ ফিরিয়ে দেখে নিচ্ছেন অতীতকে। প্রায় তিন শতকের পুরনো বর্ধমান রাজবাড়ির ইতিহাসকে। ভিন রাজ্যের বণিক সঙ্গম রায়ের উত্তরপুরুষরা দিল্লির সম্রাটের আনুকূল্যে লাভ করেছিলেন বর্ধমানের জমিদারি। পেয়েছিলেন রাজ খেতাবও। রাজারা ছিলেন গুণী, প্রজানুরঞ্জক, জনপ্রিয়। শহরের বাসিন্দা আইনজীবী সঞ্জয় ঘোষ বললেন, “এ শহরের সমস্ত ধূলিকণাই রাজাদের দানে ধন্য। এখানকার সমস্ত মানুষই কৃতজ্ঞ চিত্তে স্মরণ করেন তা। কিন্তু নাগরিক অধিকার প্রয়োগের সময় কিন্তু চেতনাতেই গুরুত্ব। না হলে স্বয়ং জওহরলাল নেহেরু এসে প্রচার করেছিলেন যার হয়ে সেই মহারাজা উদয়চাঁদ মহতাব কি হেরে যেতেন সাধারণের প্রার্থী বিনয় চৌধুরীর কাছে?”
১৯৩৬ এ আইনসভার ভোটে নির্দল হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন বর্ধমানের শেষ রাজা উদয়চাঁদ। হারিয়ে দিয়েছিলেন জাতীয় কংগ্রেসের প্রার্থী স্বাধীনতা সংগ্রামী বিজয় ভট্টাচার্যকে। সেই রাজাই স্বাধীনতা- উত্তর পর্বে ১৯৫২ সালে কংগ্রেসের হয়ে ভোটে দাঁড়িয়ে হেরে গিয়েছিলেন তরুণ প্রার্থী বিনয় চৌধুরীর কাছে। ভোটের আগে স্বয়ং জওহরলাল নেহেরু এসেছিলেন উদয়চাঁদের হয়ে প্রচার সভায়। বর্ধমানের ইতিহাসবিদ সর্বজিৎ যশ বলেন, “নিজের জয়ের ব্যাপারে এতটাই আত্মবিশ্বাসী ছিলেন রাজা, যে সেই প্রচার সভায় নিজেই অনুপস্থিত ছিলেন তিনি। ভোটে হারার পর অভিমানে কাশীবাসী হয়েছিলেন উদয়চাঁদ। তবে যাওয়ার আগে নিজের সমস্ত বিলিয়ে দিয়েছিলেন প্রজাদের জন্য। আর কখনও বর্ধমানে আসেননি তিনি।”
৬২র নির্বাচনে আবার সেই রাজা উদয়চাঁদের স্ত্রী রাধারানি মহতাব কংগ্রেসের হয়ে ভোটে দাঁড়িয়েছিলেন এই বর্ধমানের মাটি থেকে। সাধারণের মত থাকতেন রানি। মহন্ত-অস্তলের উপাসনালয়ে। আগেই তাঁর স্বামী বিলিয়ে দিয়েছিলেন সব, তাই রাজবাড়ি তখন প্রজাদের সম্পত্তি। বাড়ির উঠোনে স্বয়ং রানিকে দেখে উথলে উঠল পুরনো স্মৃতি। দরজায় দরজায় গিয়ে ভোট ভিক্ষে করলেন বর্ধমানের মহারানি। হার মানতে হল বিনয় চৌধুরিকে। পরে অবশ্য আরও অনেকবার ভোটে জেতেন তিনি।
বর্ধমান থেকে ভোটে জিতেছেন সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়। জিতেছেন তাঁর বাবা হিন্দু মহাসভার এন সি চ্যাটার্জি। কমিউনিস্ট সমর্থন নিয়ে। জিতেছেন সুধীর রায় থেকে মমতাজ সংঘমিতা। কেউ রাজ্যের মন্ত্রী হয়েছেন। কেউ স্পিকার। ১৯৭৭ এ লোকসভায় সবাইকে অবাক করে জিতেছিলেন সাংবাদিক রাজকৃষ্ণ দাঁ। জনতা দলের সমর্থনে।
শহরের প্রবীণ বাসিন্দা বিজয়েশ তা বলছিলেন, “ইতিহাস বরাবরই এ শহরে মুচকি হাসে, জানেন ? ১৯৩৬ এবিসি রোডে বিজয় ভট্টাচার্যের সমর্থনে প্রচারে এসেছিলেন জওহরলাল নেহেরু। আবার ৫২ তে রাজার হয়ে। দুটি সভাতেই জনতার ঢল। কিন্তু যাঁদের হয়ে প্রচারে এসেছিলেন তিনি তাঁদের কাউতেই জেতায়নি বর্ধমান।”
বর্ধমানের বাসিন্দা দাশরথি তা লিখেছিলেন ‘ঈদিলপুরের কাদের কয়/ ভোটার কারও বাপের লয়।’ রাজশহরে প্রজারা যেন বারবারই প্রমাণ করেন সে কথা।