দ্য ওয়াল ব্যুরো, জলপাইগুড়ি : ধান কাটা শেষ, শীতের চাদরে মুখ ঢেকেই গ্রামবাংলার ঘরে ঘরে চলছে নবান্নের প্রস্তুতি। এমন সময়েই পৌষি পূর্ণিমার রাতে শনিবার বনদুর্গার আরাধনার মাতলো দিল্লি ভিটা চাঁদের খাল। বৈকুণ্ঠপুরের গভীর জঙ্গলে এ নামেই পরিচয় এ জায়গার। ভবানী পাঠক আর দেবী চৌধুরানীর নামের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে দিল্লি ভিটা চাঁদের খালের নাম।
এই দুই চরিত্রকে নিয়ে নানা জনশ্রুতি ছড়িয়ে রয়েছে গোটা জেলায়। ইতিহাস আর গল্প কথায় যা মিলেমিশে একাকার। শোনা যায়, সময়টা ছিল আঠেরোশো শতকের শেষদিক (১৭৮৩)। ইংরেজদের রাজত্বে তাঁদের বশংবদ দেশীয় রাজারা খাজনা আদায়ের নামে অস্থির করে তুলেছিলেন প্রজাদের জীবন। অকথ্য অত্যাচারে জর্জরিত ছিলেন সাধারণ মানুষ। সেই সময় তাদের রক্ষক হিসেবে আবির্ভাব ভবানী পাঠকের। ডাকাতসর্দার হিসেবে তাঁর পরিচিতি হলেও জীবনযাপন ছিল সন্ন্যাসীর মতো। অত্যাচারী ইংরেজ ও দেশীয় জমিদারদের সম্পদ লুঠ করে তা বিলিয়ে দিতেন হতদরিদ্রদের মধ্যে। শ্বশুরঘর থেকে বিতাড়িত দেবী চৌধুরানীকেও আশ্রয় দিয়েছিলেন তিনিই। সন্ন্যাসী বিদ্রোহে তাঁদের বিশেষ ভূমিকা ছিল বলেও জানা যায়।
কোনও কোনও ইতিহাসবিদ বলেন, উত্তরপ্রদেশ থেকে এসেছিলেন ভবানী পাঠক। ডাকাতি করতে বের হলে গোপনীয়তা বজায় রাখতে নানা সাঙ্কেতিক ভাষায় কথাবার্তা বলতেন তাঁরা। দিল্লি ভিটা সাঙ্কেতিক শব্দের জন্মও তখন।
কথিত আছে, ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়াই শুরুর আগে ভবানী পাঠকের সঙ্গে রাজগঞ্জ ব্লকের বৈকন্ঠপুর জঙ্গলের ভিতর এই সন্ন্যাসী হাট গ্রামে সভা করেছিলেন দেবী চৌধুরানী। চাঁদের খালের ধারে সেই সভাস্থল দিল্লি ভিটাতেই আগে ঠুনঠুনির পূজো করতেন স্থানীয় মানুষজন। গত ৩৭ বছর ধরে সেখানেই হচ্ছে বনদুর্গার পুজো।

এক রাতের এই পূজো ঘিরে মেলা বসে। নামে লাখো মানুষের ঢল। আশেপাশের জেলা থেকেও আসেন মানুষজন। হাতির হামলা উপেক্ষা করে রাত যত বাড়ে, বাড়তে থাকে মানুষের ভিড়।
পূজো দিতে আসা শ্যামল বসু, অমল রায়, দিব্যেন্দু পালরা বলেন, “অদ্ভুত এক অনুভূতির টানে প্রতিবছর এখানে আসি আমরা। রাতভর জঙ্গলে বসে দেবী দুর্গার এই আরাধনা দেখার অনুভূতি বলে বোঝানো যাবে না। এই এলাকাকে ট্যুরিজম সার্কিটে জুড়ে দেওয়া হোক।”

গবেষক উমেশ শর্মা জানান, তিস্তাপারের বৈকুণ্ঠপুর জঙ্গলে দেবী চৌধুরানীর আসা যাওয়া ছিল। যেখানে এই পূজো হয়, সেখানে আট রকমের গাছ দিয়ে ঘেরা ভবানী পাঠকের ডেরায় আসতেন তিনি। স্যার জে ডি হুকার তাঁর লেখা বইতেও এর উল্লেখ করেছেন। পরে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর ‘দেবী চৌধুরানী’ উপন্যাসেও এই জায়গার কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, “আমি নিজেও এই এলাকা ঘুরে দেখেছি। এদের বর্ণনার সঙ্গে এই জায়গার মিল রয়েছে। সুতরাং ধরে নেওয়া যায়, ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়াই শুরুর আগে এখানেই ভবানী পাঠক ও অন্য দেশপ্রেমিক সন্ন্যাসীদের নিয়ে সভা করেছিলেন দেবী চৌধুরানী।”
সেই শক্তিস্থলের মাহাত্ম্য ধরে রাখতেই এখনও রীতি আর ঐতিহ্য মেনে পৌষের পূর্ণিমায় বনদুর্গার আরাধনায় মাতেন স্থানীয় রাজবংশী সম্প্রদায়ের মানুষ।