নকিবউদ্দিন গাজি, দক্ষিণ ২৪ পরগনা : সমুদ্রের জলস্তর বাড়ছে। এবং এই বৃদ্ধির শীর্ষে নাকি পশ্চিমবঙ্গ। সম্প্রতি কেন্দ্রীয় ভূবিজ্ঞান মন্ত্রকের পেশ করা রিপোর্টে সামনে এসেছে এই তথ্য।
সম্প্রতি লোকসভায় তৃণমূল সাংসদ সৌগত রায় এবং কংগ্রেস সাংসদ অ্যান্টো অ্যান্টনির প্রশ্ন তোলার পর ভূবিজ্ঞান মন্ত্রক যে-তথ্য দিয়েছে, তাতে দেখা যাচ্ছে, ডায়মন্ড হারবারে সমুদ্রের জলস্তর বাড়ছে সব থেকে বেশি। তার এক ধাপ পিছনেই রয়েছে হলদিয়া। দ্বিতীয় এবং পঞ্চম স্থানে যথাক্রমে গুজরাতের কান্ডলা এবং ওখা বন্দর। উপকূল এলাকায় জলস্তরের এই বৃদ্ধি যে জলোচ্ছ্বাস, বন্যা, ভূমিক্ষয় ও সুনামির বিপদ ডেকে আনছে, তা-ও জানিয়েছে কেন্দ্র। ভূ বিজ্ঞান মন্ত্রকের তরফে এও জানানো হয়েছে, উপকূলের বেশ কিছু এলাকা এবং দ্বীপের মাটি ক্ষয়ে যাচ্ছে ক্রমশ।
জোয়ার এলেই বুক কাঁপতে থাকে মৌসুনি দ্বীপের বাসিন্দাদের। কারণ নদীর জলের টানে ক্রমশ ক্ষয়ে যাচ্ছে মৌসুনির ভিটেমাটি। পরিবেশবিদেরা জানান, শুধু মৌসুনি নয়, ওই এলাকায় ছড়িয়ে থাকা ঘোড়ামারা, জম্বুদ্বীপ, নয়াচরের মতো বিভিন্ন দ্বীপ ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যাচ্ছে। বিপদের আশঙ্কা বাড়ছে সাগরদ্বীপেও। উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনার সুন্দরবন এলাকায় ৪০ লক্ষেরও বেশি মানুষের বাস। রয়েছে বিপন্ন রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারও। ২০০৯ সালের ঘূর্ণিঝড় আয়লার দাপটে লন্ডভন্ড হয়ে গিয়েছিল সুন্দরবন। ফের কোনও বড় মাপের ঘূর্ণিঝড় আছড়ে পড়লে কী অবস্থা হবে, তা ভেবে শিউরে উঠছেন অনেক পরিবেশবিজ্ঞানী।
ভূবিজ্ঞান মন্ত্রকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১৯৪৮ থেকে ২০০৫ সালের পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ডায়মন্ডহারবারে সমুদ্রের জলস্তর বছরে গড়ে ৫. ১৬ মিলিমিটার করে বাড়ছে। গত ৪০-৫০ বছরে দেশে সমুদ্রের জলস্তরের সার্বিক গড় বৃদ্ধির বার্ষিক পরিমাণ ১.৩ মিলিমিটার। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সমুদ্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সুগত হাজরা বলছেন, ‘‘আমরা দীর্ঘদিন ধরেই এই বিষয়ে সতর্ক করছিলাম। কেন্দ্রীয় সরকার অবশেষে তা মানল।’’ তাঁর বক্তব্য, ২০০৬ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত হিসেব করলে দেখা যাবে, এই বৃদ্ধির পরিমাণ বছরে প্রায় ১২ মিলিমিটার।
সমুদ্রবিজ্ঞানী ও পরিবেশবিদদের মতে, বিশ্ব উষ্ণায়নের ফলে সাগরের জলস্তর যে বাড়ছে, তা বলাইবাহুল্য। সে-কথা বলা হয়েছে রাষ্ট্রপুঞ্জের অধীন সংস্থা ‘ইন্টার-গভর্নমেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জ’ বা আইপিসিসি-র রিপোর্টেও। সমুদ্রবিজ্ঞানী অভিজিৎ মিত্রের মতে, বঙ্গে সমুদ্রের জলতল বৃদ্ধির কারণ শুধু বিশ্ব উষ্ণায়ন নয়। তাঁর ব্যাখ্যা, বিশ্ব উষ্ণায়নের জন্য সাগরের জলস্তর তো বাড়ছেই। তার উপরে নির্বিচারে পলি ও বালি তোলা হচ্ছে ডায়মন্ড হারবার-সহ সুন্দরবনের বিভিন্ন জায়গায়। তার ফলে তলদেশ বসে যাচ্ছে। ফলে দু’দিক থেকেই বিপদ ঘনিয়ে আসছে। অভিজিৎবাবু বলেন, ‘‘আন্দামান ও অন্ধ্রপ্রদেশে পলি নেই। তাই সেখানে জলস্তর বৃদ্ধির কারণ শুধুই বিশ্ব উষ্ণায়ন।’’
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিদ্যার শিক্ষক পুনর্বসু চৌধুরী বলছেন, এই জলস্তর বাড়তে থাকলে নদীর জলে নোনতা ভাব বৃদ্ধি পাবে। তার ফলে জীববৈচিত্র ক্ষতিগ্রস্ত হবে, ম্যানগ্রোভ অরণ্যের বিন্যাস যাবে বদলে। শুধু তা-ই নয়, আগামী দিনে এই বিপদ আরও উত্তরে অর্থাৎ কলকাতার দিকে এগিয়ে আসবে।
খুব সম্প্রতি হাওড়ার বোটানিক্যাল গার্ডেন লাগোয়া গঙ্গার ধারে মিলেছে বাইন, ওঁরাও, হারগোজা সহ নানা ধরণের ম্যানগ্রোভের খোঁজ। এই ঘটনায় চমকিত বোটানিক্যাল গার্ডেন কর্তৃপক্ষ গঙ্গার পাড়ে প্রায় দু হাজার বিভিন্ন ধরণের ম্যানগ্রোভ প্রজাতির গাছও বসিয়েছেন। সমুদ্রের জলস্তর বাড়ায় গঙ্গার জলও যে লবনাক্ত হয়ে পড়ছে এবং সেই কারণেই যে ম্যানগ্রোভ অরণ্যের বিন্যাস বদলে যাচ্ছে, সে ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন বোটানিক্যাল গার্ডেনের উদ্ভিদবিজ্ঞানীরাও।