দ্য ওয়াল ব্যুরো: ডেকেছিলেন উদ্যোক্তারাই। একটি নয় তিনটে সংস্থা। তাই অসমের দুলিয়াজান ও তিনসুকিয়ায় মল্লিকা সেনগুপ্তর উপন্যাস নিয়ে করা নাট্যপ্রযোজনা ‘সীতায়ন’-এর চারটে শো করার কথা ছিল ‘পূর্বরঙ্গ’ নাট্য গোষ্ঠীর। নাটক করতে অসম যাওয়ার প্রস্তুতিও নিয়ে ফেলেছিলেন তাঁরা। কিন্তু তারপরেই ঘটল তিনসুকিয়ার পাঁচ জন বাঙালির গণহত্যার ঘটনা। আর পিছিয়ে গেলেন নাটকের উদ্যোক্তারা। তাঁর জন্য কেউ কারণ দেখালেন ‘কমিউনিকেশন গ্যাপকে।’ কেউ বা সব দায় ঠেলে দিলেন অন্য উদ্যোক্তা সংস্থার ওপর।
বাল্মীকি রামায়ণের সীতা যেন এক ট্র্যাজিক চরিত্র। জন্মের মুহূর্ত থেকে জীবনের শেষ পর্যন্ত দুর্ভাগ্য যাঁকে ঘিরে রেখেছে সব সময়েই।
যে স্বামীর সঙ্গে বনবাসে গিয়েছিলেন সীতা, রাজা হওয়ার পর লোক অপবাদের ভয়ে সেই রামই তাঁকে নির্বাসণ দিয়েছিলেন অরণ্যে। সন্তাবসম্ভবা স্ত্রীর থেকেও তাঁর কাছে তখন বেশি বড় রাষ্ট্রনীতি। এই কাহিনীকে যেমন কেউ ভাবতে পারেন আদর্শ রাজার উদাহরণ হিসেবে। তেমনই পালটা নারীবাদী দৃষ্টিতে এটাই হয়ে উঠতে পারে পুরুষতান্ত্রিক শাসনকাঠামোর হৃদয়হীনতার উপাখ্যান। প্রয়াত লেখক মল্লিকা সেনগুপ্তর ‘সীতায়ন’ আসলে রামায়ণেরই বিনির্মিত নারীবাদী এক পাঠ। এই উপন্যাসের সীতার মুখে তাই উচ্চারণ, ‘অনার্যদের আমি বিপজ্জনক মনে করি না, বিপজ্জনক তোমাদের আর্যসভ্যতার আত্মগর্বী রীতিনীতি।’
দেশে বিদেশে সাড়া ফেলা মল্লিকা সেনগুপ্তর এই উপন্যাস নিয়েই পূর্বরঙ্গের ‘সীতায়ন’ নাটকটি।
স্বভাবতই তিনসুকিয়ার উদ্যোক্তাদের পিছিয়ে যাওয়ার ঘটনাকে নাট্যপ্রেমীদের একাংশ মোটে কাকতালীয় বলে মনে করছেন না। বরং তাঁরা দায়ী করছেন দেশের বর্তমান রাজনৈতিক আবহাওয়াকেই। তাঁদের বক্তব্য, দেশের জনসংখ্যার একটা বড় অংশের মানুষের কাছেই রামায়ণ গৃহীত হয় ধর্মগ্রন্থ হিসেবে। তাই এই মহাকাব্যের এই বিনির্মিত পাঠ নিয়ে বিতর্ক দানা বাঁধতে পারে খুব সহজেই। সেই জন্যই হয়ত সামগ্রিক পরিস্থিতির কথা ভেবেও শেষ অবধি পিছিয়ে গেছেন উদ্যোক্তারা।
কারও কারও আবার মনে হচ্ছে জাতীয় নাগরিকপঞ্জি নিয়ে বিভাজিত অসমের মেরুকরণের পরিস্থিতির কথা। কদিন আগেই অসমে বাংলা গান গাইতে গিয়ে একাংশের রোষের মুখে পড়েন গায়ক শানও।
‘সীতায়ন’ নাটকের নির্দেশক মলয় রায়ের সঙ্গে এই বিষয়ে যোগাযোগ করে দ্য ওয়াল। এই নাটকের বিষয় নিয়ে উদ্যোক্তাদের যে আপত্তি ছিল এমন মানতে চান না তিনি। তাঁর মতে, তাহলে উদ্যোক্তারা প্রথমেই নাটকটিকে ডাকতেন না। মলয় বাবুর বরং মনে হচ্ছে, উদ্যোক্তাদের আসল ভয় নিরাপত্তা নিয়েই। তিনি জানাচ্ছেন, হয়ত অপ্রীতিকর কোনও পরিস্থিতির আশঙ্কা করেই পিছিয়ে গেছেন উদ্যোক্তারা।
দ্য ওয়ালের তরফ থেকে যোগাযোগ করা হয় একটি উদ্যোক্তা সংস্থা ‘নিখিল ভারত বঙ্গ সাহিত্য সম্মেলন’এর কীর্তি রঞ্জন দের সঙ্গে। তিনি অবশ্য নাটকটি বাতিল হওয়ার জন্য দায়ী করেন দুলিয়াজানের নাট্য উৎসবকে। কীর্তি রঞ্জন বাবু জানান, নাটকটা ধুলিয়াজানের নাট্য উৎসবে অভিনীত হওয়ার কথা ছিল। সেই সঙ্গে অভিনীত হওয়ার কথা ছিল তিনসুকিয়াতেও। কিন্তু ধুলিয়াজানের উদ্যোক্তারাই শো টা বাতিল করে। ফলে নাট্যদলের যাতায়াত ও আনুষঙ্গিক অসুবিধার কথা ভেবে নাটকটিকে এবার না ডাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তাঁরা।
তবে ধুলিয়াজানে এই নাটকের শো বাতিল হওয়ার কারণ কী তা তিনি জানেন না এ কথাও বলেন কীর্তি রঞ্জন বাবু।
দ্য ওয়ালের তরফ থেকে অবশ্য দুলিয়াজানের নাট্য উৎসবের উদ্যোক্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।