দ্য ওয়াল ব্যুরো, পূর্ব বর্ধমান : তাঁকে নিয়ে সিনেমা হয়নি কোনও। লেখা হয়নি কোনও গল্পও। তবে বর্ধমানের অনিমেষ হার মানিয়েছে সিনেমার চিত্রনাট্যকে।
বর্ধমান শহরের বাঁকার পাড়ে বীরহাটার এক বস্তিতে থাকে অনিমেষ মণ্ডল। ভাঙাচোরা একটা মাত্র ঘরে মা ও মামার সঙ্গে। পড়াশোনা করে ক্লাস টুয়েলভে। বছর দশেক আগে তাঁদের ছেড়ে চলে গেছেন অনিমেষের বাবা। ছোট্ট অনিমেষকে নিয়ে তারপরেই শুরু হয় তাঁর মায়ের বাঁচার লড়াই। একটু বড় হতেই মায়ের সেই লড়াইয়ে সামিল হয় অনিমেষও। পড়াশোনার ফাঁকেই প্রায় দশজন স্কুলছুটকে স্কুলমুখী করেছে অনিমেষ। আবার নিজে দাঁড়িয়ে রুখে দিয়েছে নাবালিকার বিয়েও। তাঁর এই সাফল্যকে সম্মান জানিয়েই বুধবার তাঁকে বীরপুরুষ সম্মান দিচ্ছে রাজ্য সরকার।
চাইল্ড প্রোটেকশন এণ্ড চাইন্ড রাইট কমিশনের পক্ষ থেকে প্রতি বছর এই ধরনের কাজের জন্য ছেলেদের দেওয়া হয় ‘বীরপুরুষ' পুরস্কার। আর মেয়েদের ক্ষেত্রে এই পুরস্কারের নাম ‘বীরাঙ্গনা’। গত বছর এই বীরাঙ্গনা সম্মান পেয়েছিলেন বর্ধমান শহরের তিন নম্বর ওয়ার্ডের লক্ষ্মীপুর মাঠ এলাকার বাসিন্দা দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্রী পমি মাহাতো। এই বছর ‘বীরপুরুষ’ সম্মান পাচ্ছেন এই শহরেরই অনিমেষ।
বস্তির ভাঙা ঘরে মা গীতুয়া মণ্ডল ও মামা লাল্টু মাহাতোকে নিয়ে থাকেন অনিমেষ। ২০১১ সালে তাঁর বাবা তাঁদের ছেড়ে চলে যাওয়ার পর থেকেই মা ও মামা ঠ্যালা গাড়ি করে রাস্তার ধারে রুটি বিক্রি করেন। সেই আয়েই চলে সংসার। সব সমস্যাকে পাশে নিয়েই অনিমেষ বর্ধমান বিদ্যার্থীভবন হাইস্কুলের দ্বাদশ শ্রেণিতে পড়াশোনা করছেন। পাশাপাশিই চলছে সামাজিক কাজ।
অনিমেষ জানান, ২০১১ সালে ওয়ার্ল্ড ভিশন ইণ্ডিয়া নামে একটি সংস্থা তাঁদের এলাকায় কাজ করতে আসে। মূলত বাল্যবিবাহ, শিশু সুরক্ষা নিয়ে সচেতনতা তৈরিই তাদের কাজ। এই সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন তিনি। তাঁর কাজের আগ্রহ দেখেই ২০১৫ সালে ওই সংস্থা তাঁকে নিজের এলাকার চিলড্রেন ক্লাবের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করে। প্রায় ১৫০ জনের টিম নিয়ে ২০১৬ সাল থেকে কাজ শুরু করেন অনিমেষ। ২০১৬ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত পাঁচটি বাল্যবিবাহ রুখে দিয়েছেন তিনি। নিজের বা পাশের বস্তির স্কুলছুটদের স্কুলে ফিরিয়েছেন। এছাড়াও নানা সচেতনতা কর্মসূচি ও ট্রেনিং প্রোগ্রামের আয়োজন করে পিছিয়ে পড়া এলাকায় নিয়ে এসেছেন আলো।
ওয়ার্ল্ড ভিশন ইণ্ডিয়া নামে যে সংস্থার হয়ে অনিমেষ কাজ করেছে, সেই সংস্থার অধিকারিক শৌভিক বিশ্বাস, অর্জুনকুমার রায়রা বলেন, ‘‘আমরা এলাকাগত ভাবে একটি করে চিলড্রেন ক্লাব গঠন করে সেই ক্লাবের প্রেসিডেন্টদের ট্রেনিং দিয়ে থাকি। তাঁরা সেই ট্রেনিং নিয়ে নিজের এলাকায় কাজ করেন। অনিমেষ এই ক্ষেত্রে মাত্র তিন বছরে কার্যত নজির গড়েছে। তাই তাঁর নাম জেলা শিশু সুরক্ষা ইউনিটের মাধ্যমে রাজ্যে পাঠানো হয়েছে।’’
আজ বুধবার কলকাতায় এই পুরস্কার তুলে দেওয়া হল তাঁর হাতে। জেলা শিশু সুরক্ষা আধিকারিক সুদেষ্ণাদেবী বলেন, ‘‘পূর্ব বর্ধমান থেকে অনিমেষই এই পুরস্কার পাচ্ছেন। ওঁর এই কাজ সমাজে সচেতনতা আরও বাড়াবে বলেই আশা করছি।’’ অনিমেষের স্কুলের প্রধানশিক্ষক ঈশ্বরচন্দ্র বলেন, ‘‘অনিমেষের মধ্যেই রয়েছে এই শক্তি। আমরা তাঁকে উৎসাহ যোগাই মাত্র।’’