বুদ্ধদেব বেরা, ঝাড়গ্রাম : আদিবাসীদের সামাজিক সংগঠন থেকে বহিষ্কৃত হলেন ঝাড়গ্রামের তৃণমূল প্রার্থী বীরবাহা সরেনের স্বামী রবিন টুডু। স্ত্রীকে রাজনৈতিক দলের হয়ে ভোটের লড়াইয়ে সামিল করে সংগঠনের সংবিধান অমান্য করেছেন তিনি, এমনটাই অভিযোগ তাঁর বিরুদ্ধে। তাঁর উপর বেজায় চটেছেন আদিবাসীদের সংগঠন ভারত জাকাত মাঝি পারগানা মহল সংগঠনের সদস্যরা। আদিবাসীদের ভোট টানতে বীরবাহাকে প্রার্থী করে তাই শেষবেলায় রীতিমতো প্যাঁচে রাজ্যের শাসকদল।
জাকাত মাঝির অন্যতম নেতা রবিন টুডু অবশ্য এই বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত মানতে নারাজ। তিনি বলছেন, “প্রার্থী হয়েছেন আমার স্ত্রী। আমি তো নই। আর এতে সংগঠনের সর্বভারতীয় নেতা 'দিসম পরগনা' নিত্যানন্দ হেমব্রমের কোনও সিলমোহর নেই। তাঁকে বাদ দিয়ে কেউ কোনও সিদ্ধান্ত নিলে তা মানার কোনও প্রশ্ন নেই।”
অন্যদিকে নিত্যানন্দ বলেন, “আমাকে বাদ দিয়ে রাজ্য নেতৃত্ব এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আমি কিছুই জানি না। খোঁজ নেব।”
লোকসভা ভোটে আদিবাসীদের মন পেতে এ বার সাঁওতালদের সর্বোচ্চ সামাজিক সংগঠন ভারত জাকাত মাঝি পারগানা মহলের পশ্চিম মেদিনীপুর, পূর্ব মেদিনীপুর ও ঝাড়গ্রাম জেলার নেতা 'জেলা পারগানা' রবিন টুডুর স্ত্রী বিরবাহা সরেনকে প্রার্থী করে তৃণমূল। সূত্রের খবর, আদিবাসী সমাজের সর্বভারতীয় নেতা নিত্যানন্দ হেমব্রম এবং রবিন টুডু তৃণমূলের মহাসচিব পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের প্রস্তাব লুফে নিয়েই বীরবাহাকে প্রার্থী করেন। তারপরেই গোলমাল শুরু হয় সংগঠনে। রবিন টুডুর স্ত্রী প্রার্থী হওয়ায় বেজায় চটে যায় পারগানা মহলের রাজ্য নেতৃত্ব। এই আদিবাসী সংগঠনের সংবিধান অনুযায়ী, কোনও সামাজিক নেতা কোনও রাজনৈতিক দলের সঙ্গে প্রত্যক্ষ যোগাযোগ রাখতে পারেন না। ভোটেও দাঁড়াতে পারেন না। সংগঠনের সংবিধান অনুযায়ী সামাজিক পদ ও সমাজ ছেড়ে তবেই রাজনীতি করতে হবে কোনও নেতাকে। কিন্তু রবিনের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি সংবিধানকে অস্বীকার করে তৃণমূলের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। শুধু তাই নয়, তাঁর স্ত্রীকে শাসকদলের প্রার্থীও করেছেন।
সম্প্রতি বর্ধমানে রাজ্য স্তরের এক বৈঠক ডেকে পারগানা মহল নেতৃত্ব জানিয়ে দিয়েছিলেন রবিনকে সামাজিক সংগঠনের পদ থেকে ইস্তফা দিতে হবে। যদিও রবিন ওই বৈঠকে যাননি। ওই বৈঠকের সিদ্ধান্ত লিখিতভাবে রবিনের কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল। রবিন সেই সিদ্ধান্তকেও গুরুত্ব দিতে চাননি।
এরপরেই গত ১৫ এপ্রিল ভারত জাকাত মাঝি পারগানা মহলের রাজ্য কমিটি সর্বসম্মতিক্রমে রবিনকে বহিষ্কার করে। রাজ্য নেতা ‘পনত পারগানা’ বাদল কিস্কু প্রেস বিজ্ঞপ্তি জারি করে এই সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে দিয়েছেন। বাদলবাবু বলেন, “আমাদের সমাজের নেতা যদি রাজনীতি করেন, তাহলে সমাজের নিয়ম অনুযায়ী তাঁকে সামাজিক পদ ছাড়তে হয়। রবিনবাবুকেও পদ ছাড়তে বলা হয়েছিল। উনি পদ না ছাড়ায় তাঁকে পাঁচ বছরের জন্য বহিষ্কার করা হয়েছে।”
এই নিয়ে মাঝি পারগানা মহলের সঙ্গে নিত্যানন্দ-রবিনের তুমুল সংঘাতের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ঘটনা ঘিরে মাঝি পারগানা মহলের সিংহভাগ নেতৃত্ব রবিন এবং নিত্যানন্দের বিরুদ্ধে চলে গেছে বলে খবর। তাই যে আদিবাসী ভোটের ভরসায় বীরবাহাকে প্রার্থী করেছে তৃণমূল, তা শেষপর্যন্ত কতটা তাদের সঙ্গে থাকবে তা নিয়েও দেখা দিয়েছে চরম অনিশ্চয়তা। রাজনৈতিক মহল মনে করছে, ভোট বিভাজন হয়ে এতে সমস্যা অনেকটাই বেড়ে গেল বীরবাহার। যার ফায়দা পেয়ে যেতে পারে বিরোধীরা। বিশেষ করে বিজেপি, যেহেতু এই মুহূর্তে জঙ্গলমহলে তাদের দিকেই ‘পজিটিভ হাওয়া’।