দ্য ওয়াল ব্যুরো, উত্তর ২৪ পরগনা : পরিবারের দাবিই শেষপর্যন্ত সত্যি হল। নবমীর রাতে নিমতার যুবকের মৃত্যুতে দুর্ঘটনার তত্ত্ব খারিজ করে খুন সন্দেহেই সিলমোহর দিল ময়নাতদন্তের প্রাথমিক রিপোর্ট। সামনে এসেছে পুলিশের চূড়ান্ত গাফিলতিও। তাই নিহত যুবকের বাড়ি গিয়ে তাঁর পরিবারের সঙ্গে দেখা করে পদ্ধতিগত কিছু ভুলের জন্য দুঃখপ্রকাশ করে প্রকৃত দোষীকে গ্রেফতারের আশ্বাস দিয়ে এসেছেন ব্যারাকপুরের পুলিশ কমিশনার মনোজ ভার্মা।
ইতিমধ্যেই ম্যানেজমেন্ট পড়ুয়া দেবাঞ্জন দাসের (২০) বান্ধবীকে থানায় ডেকে পাঠিয়ে কয়েক দফা জেরা করা হয়েছে। পুলিশ আধিকারিকরা জানান, ত্রিকোণ প্রেমের জেরেই দেবাঞ্জন খুন হয়েছেন বলে প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে তাঁদের। পেশাদার অপরাধীকে দিয়েই খুন করানো হয় বলেও তাঁদের সন্দেহ। দেবাঞ্জনের বান্ধবীর কথায় বেশকিছু অসঙ্গতি রয়েছে বলেও জানিয়েছেন তাঁরা।
নবমীর রাত শেষে নিমতার বঙ্কিম মোড়ে গাড়ি থেকে উদ্ধার হয়েছিল দমদমের বাসিন্দা দেবাঞ্জন দাসের দেহ। চালকের আসনে মিলেছিল তাঁর দেহ। ওই তরুণের পরিবার প্রথম থেকেই দাবি করেছিল, দেবাঞ্জনকে খুন করা হয়েছে। এর পিছনে ত্রিকোণ প্রেমই অন্যতম কারণ বলেও দাবি করেছিলেন তাঁরা। কিন্তু পুলিশ জানিয়েছিল, গাড়ি দুর্ঘটনাতেই মৃত্যু হয়েছে বছর কুড়ির ওই তরুণের। এমনকি পরিবারের অভিযোগ নিতে চাননি নিমতা থানার আইসি। বুধবার ময়নাতদন্তের প্রাথমিক রিপোর্ট হাতে আসার পরেই নড়েচড়ে বসে পুলিশ।
পুলিশ সূত্রে খবর, দেবাঞ্জনের ময়নাতদন্তের প্রাথমিক যে রিপোর্ট হাতে পাওয়া গেছে, সেখানে ওই তরুণের শরীরে দু’টি বুলেটের ক্ষতর উল্লেখ রয়েছে। একটি তাঁর ঘাড়ের বাঁ দিকে। অন্যটি ডানহাতের কনুইয়ের কাছে। গাড়ি দুর্ঘটনায় মৃত্যু হলে শরীরে যে ধরণের আঘাত থাকার কথা, তেমন কিছু মেলেনি। ময়নাতদন্তের প্রাথমিক রিপোর্ট খতিয়ে দেখার পর ব্যারাকপুর পুলিশ কমিশনারেটের শীর্ষ এক আধিকারিক বৃহস্পতিবার বলেন, ‘‘গুলি লেগেই দেবাঞ্জনের মৃত্যু হয়েছে বলে আমাদের মনে হচ্ছে। পুরোটা খতিয়ে দেখছি।” তা হলে প্রথমে কেন তাঁরা দাবি করেছিলেন, গাড়ি দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়েছে, এর কোনও সদুত্তর দিতে পারেননি ওই আধিকারিক। জানা গেছে, ঘটনার তদন্তকারী আধিকারিক নিমতা থানার আইসি শিবু ঘোষকে যে প্রাথমিক রিপোর্ট দিয়েছিলেন, সেখানে গুলির কোনও উল্লেখই করেননি তিনি। উপরন্তু তিনি লিখেছিলেন, দুর্ঘটনাতেই মৃত্যু হয়েছে ওই তরুণের। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট হাতে আসার পরেই সরিয়ে দেওয়া হয়েছে মামলার তদন্তকারী ওই অফিসারকে। শোকজ করা হয়েছে নিমতা থানার আইসিকেও।
পুলিশ জানিয়েছে, নবমীর রাতে সাড়ে ন’টা নাগাদ বান্ধবীর সঙ্গে পার্টিতে গিয়েছিলেন দেবাঞ্জন। সেখানে উপস্থিত ছিল দেবাঞ্জনের বান্ধবী উচ্চমাধ্যমিক পড়ুয়া ওই তরুণীর আরেক বন্ধু বান্টি সিংও। বান্টি দেবাঞ্জনের পূর্ব পরিচিত। কিন্তু পরে দুজনের সম্পর্কের অবনতি হয়। পুলিশের দাবি, দুজনের সঙ্গেই পাশাপাশি সম্পর্ক চালিয়ে যাচ্ছিলেন ওই তরুণী। বান্টি ওরফে প্রিন্সকে সেখানে উপস্থিত দেখে পার্টি থেকে বেরিয়ে আসতে গিয়েছিলেন দেবাঞ্জন। পরে ঘণ্টাদুয়েক সেখানে ছিলেন। বাড়ি ফেরার পথে বান্ধবীকে তার বাড়িতে নামান দেবাঞ্জন। এরপরেই খুন হন তিনি। তাঁর মোবাইল ফোনের কল রেকর্ড ঘেঁটে দেখা গেছে বাড়িতে নেমে যাওয়ার পরেও দেবাঞ্জনের সঙ্গে কথা হয়েছে ওই তরুণীর। কমিশনারেটের এক পুলিশ কর্তা জানান, দেবাঞ্জনের শেষ অবস্থান একমাত্র জানতেন তার বান্ধবী। কিন্তু জেরায় বারবার তিনি পুলিশকর্তাদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছেন। দেবাঞ্জন খুন হয়েছেন এটা স্পষ্ট হওয়ার পর থেকেই গা ঢাকা দিয়েছে বান্টি ওরফে প্রিন্স। তার খোঁজে তল্লাশি চালাচ্ছে পুলিশ।
দেবাঞ্জনের বাবা অরুণ দাস জানান, ঘটনার পর থেকেই তিনি বলেছেন খুন করা হয়েছে তাঁর ছেলেকে। কাদের তাঁরা সন্দেহ করছেন, তাও বলেছেন। কিন্তু নিমতা থানার আইসি উল্টে তাঁকেই হুমকি দিয়েছেন। বলেছেন মিথ্যা অভিযোগ করলে তাঁকেই গ্রেফতার করা হবে। অরুণবাবু বলেন, “ওই মেয়েটির সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি হওয়ার পর থেকেই বান্টি আমার ছেলেকে বেশ কয়েকবার খুনের হুমকি দেয়। ওই দিন যেখানে ডিভাইডারে আমার ছেলের গাড়ি ধাক্কা খেয়েছিল, সেখানে সবাই বলেছিলেন, সিটের উপর মাথা এলিয়ে পড়েছিল ওর। কিন্তু পুলিশ বলে স্টিয়ারিং এর উপর মাথা ছিল। ধাক্কা লেগেছিল গাড়ির বাঁদিকে। ডানদিকে চালকের আসনে বসে ও মারা যাবে কী ভাবে? কিছুতেই মানতে চায়নি পুলিশ।”