দ্য ওয়াল ব্যুরো: প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছিলেন, জিএসটির ক্ষতিপূরণ মেটাতে কেন্দ্র ধার করুক। রাজ্য এমনিই অর্থ সংকটে রয়েছে। গলা পর্যন্ত ডুবে রয়েছে ঋণে। তাতে সাড়া দেননি প্রধানমন্ত্রী। উল্টে মোদী সরকারের শর্তে রাজি হয়ে গেল ১৩ টি রাজ্য।
জিএসটি-র বাস্তবায়নের জন্য কর আদায়ে ঘাটতি হয়েছে ৯৭ হাজার কোটি টাকা। মোদী সরকারের শর্ত ছিল, সেই ঘাটতি পূরণ করতে রাজ্যগুলি ঋণ নিতে পারে। এ ব্যাপারে অর্থমন্ত্রক একটি স্পেশ্যাল উইন্ডো তৈরি করে সমন্বয়ের কাজ করবে। দ্বিতীয় বিকল্প ছিল, জিএসটি বাস্তবায়ণ এবং কোভিডের কারণে কর আদায়ে যে মোট ২.৩৫ লক্ষ কোটি টাকা ঘাটতি হয়েছে, সেই ঘাটতি মেটাতে রাজ্য সরাসরি বাজার থেকে ঋণ নিতে পারবে।
বাজার থেকে ঋণ নেওয়ার অর্থ সুদ আরও বেশি। দেখা গেল, এখনও পর্যন্ত যে ১৩ টি রাজ্য কেন্দ্রের শর্তে সম্মত হয়েছে, তার মধ্যে ১২ টিই প্রথম বিকল্প বেছে নিয়েছে। ওই ১২ টি রাজ্য হল—উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, অন্ধ্রপ্রদেশ, বিহার, গুজরাত, হরিয়ানা, কর্নাটক, সিকিম, ওড়িশা, উত্তরাখণ্ড, মেঘালয় ও ত্রিপুরা। দ্বিতীয় বিকল্পের জন্য মত দিয়েছে শুধু মণিপুর।
অর্থমন্ত্রক সূত্রে বলা হচ্ছে, এক দু’দিনের মধ্যে আরও ৬টি রাজ্য তাদের বিকল্প জানাবে। তারা হল—গোয়া, অসম, অরুণাচল প্রদেশ, নাগাল্যান্ড, মিজোরাম ও হিমাচল প্রদেশ।
অর্থাৎ সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজ্যই কেন্দ্রের শর্তে মেনে নেওয়ার দিকে হাঁটছে। এই সব রাজ্যের অধিকাংশই বিজেপি বা এনডিএ শাসিত। কিংবা বিজেপির কোনও বন্ধু দল সেখানে ক্ষমতায় রয়েছে। স্বাভাবিক ভাবেই পশ্চিমবঙ্গ, মহারাষ্ট্র, পাঞ্জাব, কেরালা, ঝাড়খণ্ড সহ বিরোধী শাসিত রাজ্যগুলির উপর চাপ বাড়ছে।
তাদের স্পষ্ট বক্তব্য, যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর শর্তকে লঙ্ঘন করছে কেন্দ্র। জিএসটি বাস্তবায়নের সময় কেন্দ্র কথা দিয়েছিল, নতুন কর ব্যবস্থা প্রবর্তণের কারণে যে ঘাটতি হবে তা প্রথম পাঁচ বছর মেটাবে কেন্দ্র। এ ব্যাপারে কোনও আইনি বন্ধন না থাকলেও রাজ্যগুলি শুভ বুদ্ধিতে কেন্দ্রের সেই প্রস্তাবে সায় দিয়েছিল, ভরসা করেছিল। সেই দায় থেকে কেন্দ্র সরে যেতে পারে না।
প্রাক্তন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী পি চিদম্বরমের মতে, কেন্দ্রের প্রস্তাব মেনে নেওয়া যায় না। রাজ্যগুলি যেন নতি স্বীকার না করে। মোদী সরকারের আসল উদ্দেশ্য হল, রাজ্যগুলিকে আর্থিক ভাবে পঙ্গু করে দেওয়া। যাতে তারা কেন্দ্রের কাছে ভিক্ষাবৃত্তি করতে বাধ্য হয়।
অর্থমন্ত্রকের বক্তব্য, গত ২৭ অগস্ট জিএসটি কাউন্সিলের বৈঠকের আগে অ্যাটর্নি জেনারেলের মতামত নেওয়া হয়েছিল। এজি জানিয়েছেন, জিএসটি বাস্তবায়ণের জন্য ঘাটতি মেটানোর কোনও আইনি বাধ্যতা কেন্দ্রের নেই। কেন্দ্র চাইলে কর আদায়ে ঘাটতির টাকা নাও দিতে পারে।
যদিও নর্থ ব্লকের একটি সূত্রের মতে, কাউন্সিলের বৈঠকের আগে অ্যাটর্নি জেনারেল নাকি সরকারকে এও জানিয়েছিলেন, আইনি বাধ্যতা না থাকলেও কেন্দ্রের উচিত ঘাটতির টাকা মিটিয়ে দেওয়া। কিন্তু অর্থমন্ত্রকের ওই এক কথা—বর্তমানে যা আর্থিক পরিস্থিতি তাতে ঘাটতির টাকা মেটানো কেন্দ্রের পক্ষে সম্ভব নয়। ধার নেওয়াই একমাত্র পথ।
কেন্দ্রের এই অবস্থান বাংলা বিপদে পড়েছে বইকি। রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ভাবে তৃণমূল এ ব্যাপারে কেন্দ্রের বিরুদ্ধে তোপ দাগতে পারে ঠিকই, কিন্তু তাতে বাস্তবে বিশেষ সুরাহা হওয়া আশা কম। একে বিধানসভা ভোট আসন্ন। তার আগে কোথায় রাস্তা ঘাট, পরিকাঠামো খাতে রাজ্য খরচ বাড়াবে। কিন্তু একদিকে কোভিডের কারণে রাজস্ব আদায় তলানিতে, অন্যদিকে কেন্দ্রের অনমনীয় অবস্থান। ষাঁড়াশি সংকটে পড়েছে নবান্ন। এ ব্যাপারে পরিষদীয় মন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায় বলেছেন, ভোটের আগে বিজেপি তথা কেন্দ্রের সরকার অর্থনৈতিক অবরোধ তৈরি করতে চাইছে। এর জবাব বাংলার মানুষ দেবে।