
শেষ আপডেট: 13 September 2019 07:31
পরের গল্প শোনালেন বিশ্বজিৎবাবুই। বললেন, “ওয়ার্ক অর্ডারের পর আমি ডুয়ার্স থেকে রাজমিস্ত্রি, সাটারিং মিস্ত্রি ও জোগাড়ে নিয়ে ১১ জন তরুণ আদিবাসী ছেলের টিম তৈরি করে ডবল হাজিরা চুক্তিতে জুন মাসের মাঝামাঝি ঝান্ডি ইকো হাটে চলে যাই। যে দিন পৌঁছেছি সে দিন থেকেই কাজ শুরু করি আমরা। প্রথম দু’দিন কাজ করার পরেই লক্ষ করি ছেলেদের মুখ ভার। কাজে মন নেই। চেপে ধরতেই ওরা আমাকে বলে ‘নেট ওয়ার্ক নাখে, কাম নাই করবু’। বুঝুন কাণ্ড !”
তখন মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ার মতো অবস্থা বিশ্বজিৎবাবুর। বলেন, “একেই টাইম বাউন্ড কাজ। আমি কী ভাবে কাজ তুলবো। এরপরে পুরো টিমের সঙ্গে প্রায় ৪ ঘন্টা কাউন্সেলিং করি। এক এক জন একেক অছিলা দিতে থাকে। কেউ বলে নেটওয়ার্ক নেই, কেউ বলে আমি গার্ল ফ্রেন্ড এর সাথে কথা বলতে পারছি না, কেউ বলে টিকটক ভিডিও দেখতে পারছি না, কেউ বলে গেম খেলতে পারছি না। পরদিন সবাই মিলে একসঙ্গে কাজ ছেড়ে চলে যায়। আমি আবার ডুয়ার্সে ফিরি এবং এরপর কোচবিহার থেকে অপেক্ষাকৃত বয়স্কদের টিম নিয়ে ফের জুলাই মাসে কাজ শুরু করলাম। পুজোর আগে কাজ শেষ করার কথা ছিল। দেরি হয়ে গেল।”
রিসর্ট মালিক রাজেনবাবু বলেন, “ডুয়ার্সে এখন মিস্ত্রির রোজ ৪০০ টাকা, জোগাড়ে ৩০০ টাকা। পাহাড়ের হিসেবে দ্বিগুণ হাজিরা দিয়েও শুধুমাত্র নেটওয়ার্ক না পাওয়ায় কাজ ছেড়ে চলে গেল ওরা। আমি রীতিমতো চিন্তায়। যুবসমাজ কী ভাবে মোবাইল ফোনে মগ্ন, এটা ভেবেই।”
২০১৩ সাল থেকে কালিম্পং জেলার ঝান্ডি গ্রামে ডুয়ার্সের পর্যটন ব্যবসায়ী রাজেন প্রধানের হাত ধরে শুরু হয় পর্যটন ব্যবসা। শহুরে কোলাহল থেকে অনেক দূরে কয়েক দিন নিরিবিলিতে কাটানোর চমৎকার জায়গা হিসেবে এই রিসর্ট ও স্থানীয় হোমস্টেগুলি ধীরে ধীরে সুখ্যাতি অর্জন করে। অফ সিজনেও এখন ভর্তি থাকে ঝান্ডি। পুজোয় পর্যটকদের ভিড় সামাল দিতেই তাই আরও ঘর বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়েছিলেন রাজেনবাবু।
সম্প্রতি মেয়েকে নিয়ে ঝান্ডিতে তাঁরই রিসর্টে বেড়াতে এসেছিলেন সঞ্চিতা বন্দ্যোপাধ্যায় নামে কলকাতার একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের শিক্ষিকা। তিনি বলেন, “এখানে এসে নেটওয়ার্ক সমস্যায় পড়তে হয়েছিল আমাকেও। নেটওয়ার্ক না থাকায় আমার মেয়ে খুব রাগারাগি শুরু করে দেয়। আমি তাকে বোঝাই যে শহুরে কোলাহল ছেড়ে নিরিবিলিতে দু দিন কাটানোর জন্যই তো এখানে আসা। নাই বা পেলাম নেটওয়ার্ক। আসলে আমার মনে হয় আধুনিক সমাজ যে সময়টা মোবাইলের পেছনে দিচ্ছে, তা না দিয়ে সময়টা নিজের পরিবারের পেছনে দিলে অনেক ভালো হবে।”
বিশিষ্ট মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তার শান্তনু গোস্বামী বলেন, “আসলে যুব সমাজের কাছে মোবাইল ব্যবহার এখন নেশায় পরিণত হয়েছে। ফলে তুল্যমূল্য বিচার হারিয়ে ফেলছে সবাই। কোন বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে রুজি রোজগার না মোবাইল, সেই বোধও হারিয়ে ফেলছে। ডবল হাজিরার থেকেও টিকটক ভিডিওকে বেশি প্রায়োরিটি দিচ্ছে। এর থেকে বের হওয়াটাই চ্যালেঞ্জ।”
পরিসংখ্যান বলছে, দেশের প্রত্যন্ত এলাকাতে এখন ঘরে ঘরে শৌচাগারের সুবিধা হয়তো পৌঁছোয়নি, কিন্তু হাতে হাতে পৌঁছে গেছে স্মার্টফোন। আর তাতেই ডুবে আছে যুবসমাজ। প্রয়োজনীয়তার মাপকাঠির এমন বদল কি স্বস্তিদায়ক, সে প্রশ্ন তোলার সময় বোধহয় এসে গেল।