শান্তনু হালদার, উত্তর ২৪ পরগনা : জন্মাষ্টমীতে শ্রীকৃষ্ণের জন্মদিন পালনে মেতে ওঠে গোটা দেশ। এই বিশেষ দিনটিতেই প্রতিবছর উৎসবে মেতে ওঠে চাকলা। এবং চাকলায় এই উৎসবে শুধু হিন্দুরা নয়, একইরকম অংশগ্রহণ মুসলিমদেরও।
দেগঙ্গার চাকলা গ্রাম এক সময় ছিল মূলত মুসলিম অধ্যুষিত। খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষের বাস। সে গ্রামে খড়ের চালের এক কুঁড়ে ঘরেই নাকি জন্ম নিয়েছিলেন লোকনাথ ব্রক্ষ্মচারী। তাঁর অগণিত ভক্তের অন্তত তেমনটাই বিশ্বাস। আশির দশকের শেষ। তখনও ‘রণে বনে জলে জঙ্গলে’ লোকনাথকে স্মরণ শুরু হয়নি তেমনভাবে। কখনও সখনও এক আধজন আসতেন এই কুঁড়ে ঘরে। ত্রিকালজ্ঞ সন্ন্যাসীকে শ্রদ্ধা জানাতে, স্মরণ করতে।
৯০ দশকের শুরু থেকেই মূলত লোক মুখে ছড়াতে থাকে তাঁর মহিমা। চাকলার কুঁড়ে ঘরে ভিড় জমাতে থাকেন দূর দূরান্ত থেকে আসা বহু মানুষ। সে ভিড়ে সামিল ধর্মপ্রাণ বহু মুসলিমও। কারণ ইতিহাস থেকে বা লোকমুখে তাঁরা জেনেছেন লোকনাথ ব্রক্ষ্মচারী শুধু হিন্দুদেরই নয়, কাছে টেনে নিয়েছিলেন বহু মুসলিমকেও। গ্রামেরই যুবক রফিকুল মণ্ডল বলেন, “লোকনাথ বাবা হিন্দু কি না সে খোঁজে আর আমাদের কাজ নেই। তাঁর জন্যই এই অঞ্চলের হিন্দু-মুসলমান সবাই আমরা কিছু না কিছু করে খেয়ে পরে আছি। সেই সঙ্গে আমাদের এই অখ্যাত গ্রামের নাম সবার মুখে মুখে ঘুরছে। সে কি কম কথা?”
বর্তমান চাকলা মন্দিরের অন্যতম পুরোহিত ও এখানকার আদি বাসিন্দা সুদেব বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “ কথিত আছে ১৬০ বছর বেঁচে ছিলেন লোকনাথ বাবা। ১২৯৭ সালের ১৯ জ্যৈষ্ঠ , রবিবার দেহত্যাগ করেন তিনি। বাংলাদেশের ঢাকার বারদি গ্রামে। তাই তাঁর মৃত্যুদিনটি পুজো অর্চনার মাধ্যমে পালন করেন তাঁর ভক্তরা। আর জন্মাষ্টমীতে বিশেষ উৎসব। ”
ধীরে ধীরে চাকলা হয়ে উঠেছে তীর্থক্ষেত্র। তৈরি হয়েছে বিশাল মন্দির। উঁচু পাঁচিল দিয়ে ঘেরা দোতলা মন্দিরের নীচের তলায় মূল পুজোর জায়গা। ভক্তদের বিশ্রামের জায়গা। একসঙ্গে চার-পাঁচশো লোককে বসানোর মতো খাওয়ার ঘর। অন্য তীর্থ স্থানগুলোর মতোই মন্দিরের মূল প্রবেশদ্বারের বাইরে বিক্রি হয় ফুল মালা। সকাল থেকে হাজার হাজার মানুষ আসেন পুজো দিতে। জন্মাষ্টমীতে সেই ভিড়টাই বেড়ে যায় কয়েক গুণ। সুদেববাবু বলেন, “গড়ে প্রতিদিন আড়াই হাজার থেকে তিন হাজার মানুষ আসেন। রবিবার ও অন্য ছুটির দিন সংখ্যাটা বেড়ে দাঁড়ায় পাঁচ থেকে ছ হাজারে।"
চাকলা মন্দিরের ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য নবকুমার দাস জানান, প্রতিবছরই তাঁদের জন্মাষ্টমীর উৎসব হয় তিনদিনের। এ বছর তা চারদিনের। শুক্রবার থেকেই চাকলা মন্দিরে ঢল নেমেছে ভক্তদের। সোমবার পর্যন্ত চলবে বিশেষ পুজো-অর্চনা। তিনি বলেন, “এ দু দিনেই প্রায় ৪ থেকে ৫ লক্ষ লোকের ভিড় হয়েছে এখানে। লোকনাথ বাবার বিশেষ পুজো ও ভোগের পাশাপাশি তাঁর ভক্তদের জন্য ভোগ বিলির আয়োজনও করে মন্দির কর্তৃপক্ষ।”
নবকুমারবাবুর অভিজ্ঞতা, বারদিতে গিয়েও তিনি দেখে এসেছেন সেখানকার মুসলিম জনসাধারণের মধ্যে লোকনাথ ব্রক্ষ্মচারীকে নিয়ে ঠিক কতটা উন্মাদনা। তাই চাকলা ব্য়তিক্রম নয়।