
শেষ আপডেট: 3 February 2022 15:01
সুকমল শীল
কলকাতা মেট্রোরেল (Metro Rail) সম্প্রসারিত হচ্ছে, আধুনিক হচ্ছে পরিষেবা (Service)। কিন্ত দশকের পর দশক ধরে একটা বড় সমস্যা রয়েই গেছে, তা হল গণ শৌচাগার বা পাবলিক টয়লেট (Public Toilet)। আদি মেট্রোয় যাত্রীদের জন্য এখনও স্টেশনে যাত্রীদের জন্য পাবলিক টয়লেট নেই। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের নির্দেশের পরেও শৌচাগার তৈরির কোনও উদ্যোগই নেয়নি কলকাতা মেট্রো কর্তৃপক্ষ ৷ শৌচাগারের অভাবে প্রতিদিন চরম অস্বস্তিতে পড়তে হয় মেট্রোর লক্ষাধিক যাত্রীকে ৷ দক্ষিণেশ্বর থেকে কবি সুভাষ পর্যন্ত প্রায় এক ঘণ্টার যাত্রাপথ শেষে ট্রেন থেকে নামার পর শৌচাগারের সন্ধানে রীতিমতো নাকাল হতে হয় তাদের৷ সবচেয়ে বেশি সমস্যা হয় বয়স্ক ও মহিলাদের।
সময় এবং অন্যান্য গণপরিবহণের ঝক্কি এড়াতে বহু মানুষ টালিগঞ্জ থেকে দমদম বা দক্ষিণেশ্বর থেকে গড়িয়া যাতায়াত করেন। এই দীর্ঘ সময়ের পর খুব স্বাভাবিকভাবেই অনেকের শৌচাগারের প্রয়োজন হয়। মেট্রো স্টেশন থেকে বেরিয়ে বহু মানুষকেই ‘পে অ্যান্ড ইউজ’ টয়লেটের খোঁজ করতে হয়। সব জায়গায় তা মেলে না, তাই দুর্বিষহ পরিস্থিতিতে পড়তে হয়।
কয়েক বছর আগে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন কলকাতা মেট্রো রেল কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছিল যাত্রীদের জন্য প্রতিটি স্টেশনে পাবলিক টয়লেট বানাতে হবে। রেল সে পথে হাঁটেনি। রেলকর্মীদের জন্য নির্দিষ্ট শৌচাগার অবশ্য ব্যবহার করতে দেওয়া হয় যাত্রীদের। কিন্তু সাধারণ যাত্রীদের পক্ষে মেট্রো কর্মীদের শৌচাগার পর্যন্ত যাওয়া বা অনুমতির বিষয়টি সহজ নয়। প্রথমে স্টেশনে কর্মরত আরফিএফ কর্মীকে বিষয়টি জানাতে হয়। তারপর খুলে দেওয়া হয় মেট্রো কর্মীদের শৌচাগার। খুব প্রয়োজনে পুরুষ যাত্রীরা তা ব্যবহার করলেও সমস্যায় পড়েন মহিলারা। বেশিরভাগ মহিলাই বিষয়টিতে সংকোচবোধ করেন।
বিষয়টিতে পেশায় চিকিৎসক সংঘমিত্রা মুখোপাধ্যায় বললেন, ‘বহু মহিলাই বিষয়টি বলতে দ্বিধাবোধ করেন। শৌচাগার যদি তৈরি হত, তাহলে ভালো হত। আর মেট্রো কর্মীদের শৌচাগার যদি সাধারণ যাত্রীরা ব্যবহার করতেই পারে, তাহলে টয়লেট কোনদিকে তার দিক নির্দেশ করুক মেট্রো। প্রয়োজন হলে কোনদিকে জানতে চাওয়া, তারপর অনুমতি মিলবে কী না, সে কথা ভেবেই আমরা সমস্যা নিয়ে মেট্রোয় সফর করছি।’
১৯৮৪-তে যাত্রা শুরুর পর পার হয়ে গিয়েছে তিনটে দশক। মেট্রো এখন আরও ঝকঝকে। নন এসি রেক উঠে গেছে। কিন্ত মেট্রো স্টেশন চত্বরে সবচেয়ে বড় ঘাটতি শৌচাগারের৷ ফলে দীর্ঘ যাত্রাপথে প্রতিদিনই ভুগতে হয় যাত্রীদের৷ তবু এই সমস্যা চোখেই পড়ে না মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষের৷ সমস্যার সমাধানে কোনও উদ্যোগই নেই সংস্থার৷
মেট্রোয় শৌচাগার থাকা খুবই প্রয়োজন, বললেন, কুণাল দে নামে এক যাত্রী। তাঁর বক্তব্য, ‘এটা একটা অত্যাবশ্যকীয় পরিষেবা। যাত্রীদের কারও পেটখারাপ হতে পারে, বা মহিলাদের কারও ঋতুকালীন প্রয়োজনীয়তা থাকতে পারে। সেকথা মাথায় রেখেই শৌচাগারের খুবই দরকার।
তাঁর প্রশ্ন, মেট্রোয় পাবলিক টয়লেট তৈরি করতে সমস্যা কোথায়? টয়লেট তৈরি করতে তো বেশি টাকা লাগে না। ভেতরে জায়গা না থাকলে বাইরে করুক।’
গত তিন দশকে কলকাতা মেট্রোরেলের যাত্রাপথ প্রায় আটগুণ বেড়েছে৷ স্টেশন বেড়েছে। যাত্রীসংখ্যা বেড়েছে বহু গুণ৷ অস্বস্তি চেপেই যাত্রা করছেন লোকজন।
ধর্মতলা মেট্রো স্টেশনের সামনে অনিরূদ্ধ হালদার বললেন, ‘আমি দেখেছি বহু যাত্রীর সমস্যা হয়েছে। শুধু বয়স্ক নয়, বাচ্চাদেরও সমস্যা হয়। রেলের মতো মেট্রো রেলেও টয়লেট খুবই প্রয়োজন।’
‘কোনও যাত্রীর আপদকালীন শৌচাগারের প্রয়োজন হলে তা আমাদের আরপিএফ বা অন্য কর্মীকে জানালেই আমাদের শৌচাগার খুলে দেওয়া হয়’, বললেন শোভাবাজার মেট্রো–র স্টেশন মাস্টার কে কে পাল। জানালেন, আপাতত স্টেশন-চত্বরে যাত্রীদের জন্য শৌচাগার তৈরি নিয়ে ভাবা হচ্ছে বলে জানা নেই।
মেট্রো রেলের যে স্টেশনের ১০০-১৫০ মিটারের মধ্যে সুলভ শৌচালয় নেই, প্রধানত সেই স্টেশনের কাছেই শৌচাগারের ব্যবস্থা করা মেট্রো রেলে তরফে জানানো হয়েছিল। যদিও বাস্তবে তা হয়নি আজও।
প্রবীণ যাত্রী গোপাল সাহা বললেন, ‘আমাদের সমস্যা বেশি। অনেকই ডায়াবেটিক। তারা মেট্রোয় যেতে হলে অস্বস্তিবোধ করেন। মেট্রো স্টেশনগুলিতে টয়লেটের খুবই দরকার।’
এসপ্ল্যানেড মেট্রো স্টেশনের স্টেশন মাস্টার এস এন আদক বললেন, ‘আমাদের কাছে কেউ এলেই আমরা আমাদের শৌচাগার ব্যবহার করতে দিই। তবে যেহেতু মাটির অনেক নীচে, তাই পরিষ্কার–পরিচ্ছন্নের বিষয়টি খুবই জটিল। যাত্রীদের জন্য অবাধে শৌচাগার খুলে দেওয়া হয়েছিল, কিন্ত বহু মানুষ এসে নোংরা করে গিয়েছে। স্যানিটারি ন্যাপকিন ফেলে গিয়েছে।’
যাত্রীদের অনেকের অভিযোগ অনেক নতুন মেট্রো স্টেশনগুলির বাইরে শৌচাগার থাকলেও তা তালা দেওয়া থাকছে। বরাহনগর মেট্রো স্টেশনের বাইরের শৌচাগারটি সবসময়ই তালা দেওয়া থাকে বলে অভিযোগ। বিষয়টিতে মেট্রো রেলের এক আধিকারিক জানালেন, প্রতিটি মেট্রো স্টেশনেই যাত্রীরা কর্মীদের শৌচাগার ব্যবহার করতে পারবেন। ইস্ট–ওয়েস্ট মেট্রোর প্রতিটি স্টেশনে শৌচাগার রয়েছে।