দ্য ওয়াল ব্যুরো: ২০১২ সাল। ২৩ বছরের প্যারামেডিক্যাল ছাত্রীর উপরে নৃশংস নির্যাতনের ঘটনায় স্তব্ধ দেশ। প্রতিবাদের ঝড় বইছে সর্বত্র। ছেঁড়াখোঁড়া শরীর নিয়ে জীবনের লড়াই লড়ছেন যিনি সেই নির্যাতিতার নাম হল ‘নির্ভয়া।’ সুপ্রিম কোর্টে তখন সবে প্র্যাকটিস শুরু করছেন আরও এক সাহসিনী। নির্ভয়ার যন্ত্রণায় কেঁপে উঠেছিলেন তিনিও। “আইএএস পরীক্ষার প্রস্তুতিও নিচ্ছি তখন। হোস্টেলের মেয়েরা বলাবলি করছিল এমন জঘন্য অপরাধীদের কী শাস্তি দেবে দেশ? আমরা মেয়েরাও কি রাতের বেলা রাস্তায় সুরক্ষিত?” লড়াই করার সিদ্ধান্তটা নিতে কয়েক সেকেন্ড সময় লেগেছিল, জানিয়েছেন নির্ভয়া মামলায় গোটা দেশে সাড়া ফেলে দেওয়া সেই তরুণী আইনজীবী সীমা সমৃদ্ধি কুশওয়াহা।
সাত বছরের লড়াই। প্রতিবাদের আগুন বইয়ে দিয়েছেন গোটা দেশে। এক পয়সাও পারিশ্রমিক নেননি নির্ভয়ার পরিবারের থেকে। এপি সিংয়ের মতো দুঁদে আইনজীবীকে পাল্লা দিয়েছেন সমানে। জীবনের প্রথম মামলায় জেতার আনন্দ নেই সীমার, নির্ভয়ার অপরাধীদের যোগ্য শাস্তি দিতে পেরেই গর্বিত তিনি। প্রচারের আলো জুড়ে এখন যে আইনজীবী তরুণী সীমা কুশওয়াহা দেশের মন জিতেছেন, তাঁর ক্ষেত্রেও এই সাত বছরের লড়াইটা কিন্তু সহজ ছিল না। একের পর এক চরাই-উৎরাই পার হওয়ার পরেই এসেছে কাঙ্খিত জয়।
নির্ভয়ার কেস তখন লড়ছেন দয়ান কৃষ্ণাণ, আশাদেবীর পক্ষ থেকে লড়াইয়ের ময়দানে নামলেন সীমা
২০১২ সালের ১৭ ডিসেম্বর। নির্ভয়ার সঙ্গীর বয়ানের ভিত্তিতে এফআইআর দায়ের হয় ছয় ধর্ষকের বিরুদ্ধে। প্রথম ধরা পড়ে রাম সিং। পরে তার ভাই মুকেশ সিং। একে একে বিনয় সর্মা, পবন গুপ্ত, অক্ষয় ঠাকুর ও এক নাবালক অপরাধী। ২৫ ডিসেম্বর আদালতে রুজু হয় নির্ভয়া ধর্ষণ মামলা। পাঁচ অপরাধীর বিরুদ্ধে চার্জশিট গঠন করা হয়। ষষ্ঠ ও নাবালক অপরাধীর বিচার চলতে থাকে জুভেনাইল জাস্টিস কোর্টে। দায়রা আদালতে প্রথম শুনানি শেষে তিহাড় জেলে পাঠানো হয় পাঁচ অপরাধীকে। এই সময় দিল্লি পুলিশের নিয়োগ করা হয় সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী দয়ান কৃষ্ণাণকে। তাঁর সঙ্গেই সরকার পক্ষের হয়ে লড়ছিলেন আইনজীবী রাজীব মোহন এবং এটি আনসারি। পাঁচ অপরাধীর বিরুদ্ধে জোরালো চার্জশিট পেশ করেন তাঁরা। জানা গেছে, এই মামলায় আইনজীবী দয়ান কৃষ্ণাণও নাকি এক পয়সা পারিশ্রমিক নেননি।

মামলা যখন চরম পর্যায়ে জেলের ভিতরে অপরাধী রাম সিংয়ের আত্মহত্যা খবর সামনে আসে। সেটা ২০১৩ সালের ১১ মার্চ। অগস্টে নাবালক অপরাধীকে তিন বছরের জন্য জুভেনাইল কারাগারে পাঠানো হয়। দেশজুড়ে প্রতিবাদের ঝড় তখন সপ্তমে। বিচারের দাবিতে গর্জে উঠেছেন নির্ভয়ার মা আশাদেবী। তাঁর হাত ধরলেন এক তরুণী। রাস্তায় নেমে যোগ দিলেন প্রতিবাদ মিছিলে। স্লোগান তুললেন, “জাস্টিস ফর নির্ভয়া”। আদালতে অপরাধীদের মৃত্যুদণ্ডের দাবি তুললেন দৃপ্ত কণ্ঠে। সীমা কুশওয়াহাই সওয়াল করেছিলেন এই অপরাধ বিরলের মধ্যে বিরলতম, তা হলে দোষীদের মৃত্যুদণ্ড দিতে এত দেরি করছে কেন আদালত! সীমার লড়াইয়ের জোরে ওই বছরের সেপ্টেম্বরেই চার অপরাধীর ফাঁসি সাজা ঘোষণা করে দায়রা আদালত।
দণ্ডিতদের আইনজীবী এপি সিংয়ের সঙ্গে জোর টক্কর, হার মানেননি সীমা
দিল্লি আদালত ফাঁসি রদের আর্জি খারিজ করলে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করে চার দণ্ডিত। সেটা ২০১৪ সালের ১৩ মার্চ। তখন থেকেই আইনের ফাঁক বার করে তুরুপের তাস খেলা শুরু করেছেন আইনজীবী এপি সিং। ২০১৫ সালে জুভেনাইল কারাগার থেকে নাবালক অপরাধী ছাড়া পাওয়ার পরে ২০১৭ সালে ফের সুপ্রিম কোর্টে ওঠে নির্ভয়া মামলা। এর মাঝের সময় প্রমাণ লোপাটের চেষ্টাও হয়েছে একাধিকবার। ঘটনার দিন অপরাধীরা ঘটনাস্থলে ছিল না, বিনয় শর্মা নাবালক ইত্যাদি নানা যুক্তি আদালতে পেশ করে ফেলেছেন এপি সিং। তবে সীমা কুশওয়াহার প্রখর বুদ্ধিতে এবং তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে সেই সব যুক্তিই নাকচ করে দেয় আদালত। এপি সিং প্রমাণ করার চেষ্টা করেছিলেন বিহারের বাসিন্দা অক্ষয় ঠাকুর ঘটনার দিন তাঁর গ্রামেই ছিলেন, সেই সংক্রান্ত ভুয়ো বাসের টিকিটও পেশ করা হয় আদালতে। কিন্তু সীমা প্রমাণ করে দেন, ঘটনার ঠিক আগের দিনই বিহার থেকে ফিরেছিল অক্ষয় ঠাকুর। সে রাতে বাসে বাকিদের সঙ্গেও ছিল সে। এর পরে ২০১৭ সাল থেকে লাগাতার মৃত্যুদণ্ড থেকে বাঁচার চেষ্টা চালিয়ে গেছে চার অপরাধী। সঙ্গ দিয়েছে তার আইনজীবীরা। মামলা থেকে সরে যাওয়ার জন্য নানারকম হুমকিও দেখা হয়েছে সীমাকে। তবে কোনও কিছুরই পরোয়া করেননি তিনি। জোর গলায় বলেছেন, অপরাধীদের ফাঁসি হবেই। এবং সেটা তিনি করিয়েই ছাড়বেন।
স্বপ্ন আইএএস হওয়ার, নির্ভয়ার মতো নির্যাতিতাদের জন্য লড়াই করার অঙ্গীকার নিয়েছেন সীমা
উত্তরপ্রদেশের ইটাওয়ায় জন্ম ১৯৮৬ সালে। দিল্লি ইউনিভার্সিটি থেকে এলএলবি পাশ করার পরে দায়রা আদালতে প্র্যাকটিস করছিলেন সীমা। পাশাপাশি চলছিল ইউপিএসসি পরীক্ষার প্রস্তুতি। সেটা ২০১২ সাল। সেই সময় নির্ভয়া মামলার বিচার শুরু হয় নিম্ন আদালতে। ২০১৩ সাল থেকে আশাদেবীর তরফে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। বাকিটা সাত বছরের ইতিহাস।
২০১৩ সালে রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ সীমার
আদালতে দাঁড়িয়ে সওয়াল করার আগে টানা কয়েকমাস রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন সীমা। হাতে প্ল্যাকার্ড নিয়ে, স্লোগান তুলে জনসাধারণের ভিড়েই মিশেছিলেন তিনি। অপরাধীরা যখন আইনকে ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা শুরু করেছে তখনই আসরে নামেন সীমা। হাল ধরেন মামলার। কেরিয়ারের প্রথম কেস, পূর্ব অভিজ্ঞতাও নেই, শুধুমাত্র মনের জোরে দীর্ঘ সাত বছরের লড়াই লড়ে গিয়েছেন এই সাহসিনী। একবারের জন্যও ধৈর্যচ্যুতি ঘটেনি, হুমকির ভয়ে পিছিয়েও যাননি। ‘নির্ভয়া জ্যোতি ট্রাস্ট’-এর আইনি পরামর্শদাতাও তিনি। নির্ভয়ার মতোই ধর্ষিতা, নির্যাতিতা মহিলাদের আইনি লড়াইয়ের পরামর্শ দেন সীমা কুশওয়াহা। বলেছেন, লড়াই এখনও থামেনি। এরপর বিহারের পুর্নিয়া জেলার নাবালিকা ধর্ষণকাণ্ডের মামলা লড়বেন তিনি। ১১ বছরের কিশোরীকে ধর্ষণের পরে নৃশংস নির্যাতন করে খুন করে ৬ জন। সেই অপরাধীদের সাজা দেওয়ার জন্য কোমর বেঁধে তৈরি সীমা।