
শেষ আপডেট: 2 July 2018 10:30
দ্য ওয়াল ব্যুরো: বাইরের লোক মানেই ছেলেধরা। তাই পিটিয়ে খুন।
পাঁচ জন এই ভাবেই মারা গেলেন মহারাষ্ট্রের রেনপাড়া গ্রামে। সেখানে ভিক্ষে করতে এসেছিলেন গোঁসাই সম্প্রদায়ের সাত জন। গ্রামবাসীরা ছেলেধরা সন্দেহে তাঁদের তাড়া করে। কোনও মতে পালিয়ে যান দু’জন। ধরা পড়ে যান বাকিরা। তাঁদের ধরে গ্রাম পঞ্চায়েত অফিসে নিয়ে আসা হয়। শুরু হয় গণপিটুনি। মারা যান সকলেই।
ছেলেধরার ভয় ভারতীয় মননে বহু দিন ধরেই প্রোথিত। রবীন্দ্রনাথের কাবুলিওয়ালা রহমত শেখের সঙ্গে ছোট্ট মিনির বন্ধুত্ব, সে নিয়েও তো ভয় পেয়েছিল মিনির মা। রহমত যদি ছেলেধরা হয়।
সত্যজিৎ রায়ের সোন্নার কেল্লা? দুই ভিলেন মন্দার বোস আর নকল ডাক্তার হাজরা, তারাও তো ছেলেধরাই।
‘আমাদের একটু দেখিয়ে দেবে খোকা? আমরা বেলুচিস্তান থেকে আসছি কিনা, তাই কলকাতার রাস্তা ঘাট ঠিক...’ এইভাবেই ভুল মুকুলকে কলকাতার রাস্তা থেকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল তাঁরা। পরে আসল ডাক্তার হাজরাকে পাহাড় থেকে ফেলে দিয়ে ভুলিয়ে ভালিয়ে জাতিস্মর মুকুলকেও অপহরণ করে এই দুই দুষ্টু লোক।
আরও পড়ুন: BREAKING: বিপন্ন সুষমাকে দেখছে না বিজেপি, পাশে দাঁড়ালেন মমতাসাতের দশকের এই ছবিতে ধরা পড়েছিল ভারতীয়দের অচেতনের মনের গভীরে প্রোথিত সেই ছেলেধরার ভয়ই ছোটবাচ্চাদের অপরিচিত লোকের সঙ্গে কথা বলতে বারণ করতেন মা ঠাকুমারা। তারা নাকি সুযোগ পেলেই হাতমুখ বেঁধে বস্তায় পুরে ফেলবে। খাবারে ওষুধ মিশিয়ে অপহরণ করবে। তার পর বিক্রি করে দেবে।
সেই সন্দেহই এখন চারিয়ে দেওয়া হচ্ছে হোয়াটস্যাপ, সোশ্যাল মিডিয়ায়। শুধু বিক্রির ভয়ই নয়, এখন তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অঙ্গ ব্যবসার আতঙ্কও। সেই ভীতিকে আরও শক্তিশালী করতে সঙ্গে দেওয়া হচ্ছে জাল ছবি। তাই সত্যি শিশু অপহরণের ঘটনা না ঘটলেও নেহাতই উত্তেজনার বসে কাউকে সন্দেহ হলেই পিটিয়ে মারছেন মানুষ।
সেই ছেলেধরা সন্দেহেই মে-র ২০ তারিখ থেকে এই অবধি গণপিটুনিতে মারা গেছেন মোট ১৯ জন। দেশের বিভিন্ন প্রদেশে। বাদ নেই পশ্চিমবঙ্গও। কখনও অসমের উপজাতি অধ্যুষিত অঞ্চলে বাইরে থেকে আসা শহুরে যুবক। কখনও বা উত্তরপ্রদেশ থেকে কাজ করতে আসা শ্রমিক। কখনও নিতান্তই শাড়ি পরে মহিলা সেজে ভিক্ষা করা বহুরূপী। এমনকী সম্বন্ধ করে মেয়ে দেখতে আসা পরিবারও। ছেলেধরা সন্দেহে বাদ গেলেন না কেউই।
এর মধ্যে আছেন ত্রিপুরার তথ্য ও সংস্কৃতি মন্ত্রকের কর্মী সুকান্ত চক্রবর্তীও। সরকার থেকে তাঁকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল হোয়াটস্যাপ এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় ছেলেধরার মিথ্যে গুজবের ভয় কাটানোর। সেই সুকান্তকেও পিটিয়ে মারল জনতা। মিথ্যে ছেলে ধরা সন্দেহে।
আর প্রতিটি ক্ষেত্রেই কিন্তু সেই হোয়াটস্যাপ আর সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়ানো জাল খবরেই ভূমিকা। বাচ্চাদের যারা অপহরণ করতে পারে তারা মূর্তিমান ভিলেন। বাঙালির কাছে দুষ্টু লোকের মূর্ত প্রতীক মন্দার বোস ও জাল ডাক্তার হাজরাকে খলনায়ক হিসেবে প্রতিভাত করতে সত্যজিৎ সিনেমায় যে কৌশল নিয়েছিলেন, সেই একই জিনিস এবার সামগ্রিক ঘৃণা ও গণহিংসা ছড়াতে ব্যবহার করা হচ্ছে। ‘বাইরের লোক’ বাচ্চাদের সঙ্গে কথা বললেই সে ছেলে ধরা। অতএব পিটিয়ে মারো তাকে। ঠিক যেভাবে বেদে মানেই চোর এই ধারণা গেড়ে বসেছিল বাঙালি জনমানসে, সেই একই ভাবে এবারও জনতার রোষের স্বীকার একটু চেহারায়-আচরণে আলাদা মানুষেরা। কেউ ভেবেও দেখছেন না মেলামেশার ফলেই কাবুলিওয়ালা রহমতের সঙ্গেই মানবিক সম্পর্ক গড়ে শিশু মিনির।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কলকাতা পুলিশের এক উচ্চপদস্থ কর্তাও এমনটাই মনে করেছেন। তিনি বলছেন, "ছেলেধরা শব্দটাই মানুষের মনে আতঙ্ক ও ঘৃণা ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। ফলে এই বিষয়ে গুজব ছড়ায়ও খুব তাড়াতাড়ি। সোশ্যাল মিডিয়ার আগে থেকেই এই ধরনের গুজব বহু সময়ে ছড়াত। এখন নতুন প্রযুক্তির সাহায্যে এই ধরণের মিথ্যে আরও সহজে সমাজে ছড়িয়ে দিচ্ছেন এক শ্রেণির অসাধু মানুষ।"
কিছু কাল আগে একই ধরনের গুজব ছড়ানো হয়েছিল পশ্চিমবঙ্গের কিছু জায়গাতেও। সেইবার অবশ্য পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়, শিশু অপহরণের এই সমস্ত খবর জাল।
সমাজকর্মী লেখক দোলন গঙ্গোপাধ্যায় মনে করছেন, আসলে এটা হল ভারতীয় সমাজে এত দিন চলে আসা অন্তর্ভুক্তির ঠিক উলটো প্রক্রিয়া। বহুর মধ্যে ঐক্য এখন বদলে যাচ্ছে আলাদা অতএব খারাপের সহজ সমীকরণে। চারিয়ে দেওয়া হচ্ছে হিংসা।
দেশের রাজনৈতিক মহলের অনেকেই মনে করছেন, গুজব থেকে গণপ্রহারের এই সমস্ত ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন করে দেখা ঠিক নয়। তাঁদের মতে, এমনিতেও দেশ জুড়ে বাড়ছে অসহনশীলতার আবহাওয়া। কখনও বিরুদ্ধ মতের বলেই খুন করা হচ্ছে বুদ্ধিজীবীদের। কখনও গোহত্যার সন্দেহে পিটিয়ে মারা হচ্ছে একটি সম্প্রদায়কে। মানুষের খাদ্যাভ্যাসও কারণ হয়ে উঠছে হিংসার। ফায়দা লুটতে রাজনীতির কারবারিরাও ইন্ধন দিচ্ছেন এই সামাজিক মেরুকরণের। তৈরি হচ্ছে এক অবিশ্বাসের বাতাবরণ। হোয়াটস্যাপে জাল ছবি, জাল খবর দিয়ে ছেলেধরার গুজব ছড়ানো সেই বৃহত্তর রাজনৈতিক কৌশলেরই অঙ্গ হয়ে উঠছে।
ভারতীয় রাজনীতির এক প্রথম সারির নেতা তো বলেই দিলেন, ভারতবর্ষের বহুত্বের ধারণার মূল ছিল গান্ধীর চেতনা। অথচ সেই গান্ধীর সমস্ত আদর্শকে আবদ্ধ করে ফেলা হল অঞ্চল পরিষ্কার রাখার মধ্যে। গান্ধীর ধারণা যদি ঝাঁটায় সীমাবদ্ধ হয়, তাহলে অহিংসাকে সরিয়ে ক্রমশ জায়গা নেবে হিংসা। আর এই হিংসাই এখন নতুন রাজনীতি হয়ে উঠেছে। ফলে সমাজের নানা স্তরেও বাড়ছে তার প্রকোপ।