দ্য ওয়াল ব্যুরো: শনিবার ভোর ৪টে। শেষবার স্বামীর গলা শোনেন অন্তঃসত্ত্বা। তিন সন্তানের মা তখনও জানতেন না স্বামী শাকির আর কোনওদিনও ফিরবেন না। কান্নায় ভেঙে পড়ে প্রসূতি জানিয়েছেন স্বামী শেষবার তাঁকে বলেছিলেন, ‘‘চারপাশে আগুন। দমবন্ধ হয়ে আসছে আমার। আর মনে হয় বাঁচব না।’’ শাকিরের ঝলসানো দেহটা কারখানার ভিতর থেকে বার করার সময় ভাই জাকির বলেছেন, দুই মেয়ে, এক ছেলে রয়েছে শাকিরের। বড় পরিবার। একটু বেশি রোজগারের জন্যই এই কারখানায় কাজ নিয়েছিল। এবার খাব কী?
দিল্লির রানি ঝাঁসি রোডের আনাজ মান্ডি এলাকার চারতলা বাড়ির তিনতলায় যখন আগুন লাগে তখন গভীর ঘুমে ছিলেন শ্রমিকরা। ব্যাগ, জুতো তৈরির ওই কারখানায় প্লাস্টিক, রেক্সিনের মতো দাহ্য বস্তু জমা করা ছিল প্রচুর পরিমাণে। দ্রুত আগুন ছড়িয়ে পড়ে তিনতলা ও চারতলায়। দরজা, জানলা বন্ধ থাকার কারণে বাইরে বেরিয়ে আসতে পারেননি অধিকাংশই। ঝলসে যান অন্তত ৬৩ জন। হাসপাতালে নিয়ে গেলে তাঁদের মধ্যে মৃত্যু হয় ৪৩ জনের। মৃতদের মধ্যে রয়েছে এক কিশোরও। মৃতের সংখ্যা আরও বাড়র সম্ভাবনা রয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, বিহার, উত্তরপ্রদেশের গ্রাম থেকে শ্রমিকরা কাজ করতে এসেছিলেন এই কারখানায়। শীতের রাতে সকলেই জানলা বন্ধ করে ঘুমোচ্ছিলেন। আগুন লেগেছে টের পাননি অনেকেই। ধীরে ধীরে আগুন বিরাট আকার নিয়ে ছড়িয়ে পড়লে বেরনোর চেষ্টা করেন শ্রমিকরা। শেষবার আত্মীয়, বন্ধুদের ফোন করে সাহায্য চেয়েছিলেন অনেকেই। বন্ধুর শেষ কথাগুলো মনে করে হাহুতাশ করছেন উত্তরপ্রদেশের বাসিন্দা মনু আগরওয়াল। তাঁর কাছে বন্ধু মহম্মদ মুশারফের ফোনটা এসেছিল ভোর সাড়ে ৪টে নাগাদ। মুশারফ বলেছিলেন, “ধোঁয়ায় ভরে গেছে ঘর। আগুন ছড়িয়ে পড়ছে বেরোনোর রাস্তা নেই। পরিবারের খেয়াল রেখো।” মনু বলেছেন, ফোনে যখন মুশারফ কান্নাকাটি করছিলেন পিছন থেকে বহু মানুষের আর্তনাদের ভেসে আসছিল। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ফোন কেটে যায়। ভোর হতেই দিল্লিতে ছুটে এসেছিলেন মনু। তবে বন্ধুকে আর ফিরে পাননি। মুশারফের ঝলসানো দেহ শনাক্ত করেছেন তিনিই।

উত্তরপ্রদেশের মোরাদাবাদের বাসিন্দা শাহজাদ। পরিবার জানিয়েছে ভোর ৫টা নাগাদ ছেলের ফোন আসে। ওপারে আর্ত কণ্ঠ জানায়, “কারখানায় আগু লেগে গেছে। বাবা বাঁচাও।” এই কয়েকটা শব্দ, তারপরেই ফোন কেটে যায়। ছেলের দেহ এখনও শনাক্ত করে উঠতে পারেননি বৃদ্ধ বাবা।
বিহার থেকে দিল্লিতে কাজ করতে এসেছিলেন রাজু। শেষবার বন্ধু ফুরকান আহমেদকে ফোন করে সাহায্য চেয়েছিলেন। ফুরকান জানিয়েছেন, তিনিও দিল্লিরই একটি কারখানায় কাজ করেন। ফোন পেয়েই ছুটে গিয়েছিলেন। কিন্তু ততক্ষণে আগুন গ্রাম করে নিয়েছিল বাড়িটাকে।

২৮ বছরের শাকির হুসেন ফোন করেছিলেন তাঁর অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে। বিহারের গ্রামে স্ত্রী, মা, ভাই আর তিন সন্তানের পরিবারে নতুন অতিথির জন্যই এত পরিশ্রম তাঁর। ভাই জাকিরের দাবি, এত বড় কারখানায় কোনও অগ্নিনির্বাপনের ব্যবস্থা নেই। এতগুলো গরিব মানুষের নিরাপত্তার দায়িত্ব তাহলে কে নেবে!
পুলিশ ও দমকল বাহিনীর কর্তারা জানিয়েছেন, প্রাথমিক ভাবে মনে হচ্ছে, কারখানার ভিতরে বিদ্যুতের লাইনে শর্ট সার্কিট থেকেই আগুন লেগে যায়। তারপর দাহ্য বস্তু থেকে সেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে। কারখানার মালিক রেহান ও ম্যানেজার ফুরকানকে গ্রেফতার করা হয়েছে।