দ্য ওয়াল ব্যুরো: আরও একটা প্রতীক্ষার প্রহর। চন্দ্রযান মিশনের মতোই প্রতি সেকেন্ডের উৎকণ্ঠা। কার্টোস্যাট সিরিজের তৃতীয় প্রজন্মের এই অত্যাধুনিক নজরদারি উপগ্রহের উৎক্ষেপণের সময় এগিয়ে এল। গত ২৫ নভেম্বর শ্রীহরিকোটার সতীশ ধবন মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্রে থেকে পৃথিবীর মাটি ছাড়িয়ে উড়ে যাওয়ার কথা ছিল কার্টোস্যাট ৩ স্যাটেলাইটের। কিন্তু পরে সেই সময় পিছিয়ে দেওয়া হয়। ইসরো জানিয়েছে, আগামীকাল ২৭ নভেম্বর সকাল ৯টা ২৮ মিনিটেই রয়েছে সেই মাহেন্দ্রযোগ। পোলার স্যাটেলাইট লঞ্চ ভেহিকল ‘পিএসএলভি-সি৪৭’-এর পিঠে চেপে কার্টোস্যাট ৩ হুশ করে উড়ে যাবে মহাশূন্যে।
চন্দ্রযানের পরে গগনযান। পৃথিবীর কক্ষে ভারতের স্পেস স্টেশনের বানানোর কাজও শুরু হবে। ২০২০ সালে সূর্যের দেশেও পাড়ি দিতে পারে ইসরোর মহাকাশযান ‘আদিত্য এল ১।’ তার মাঝে আরও একগুচ্ছ পরিকল্পনা রয়েছে ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থার। ২০১৭ সালে কার্টোস্যাট ২ মিশন সফল। চলতি বছরে তারই উন্নত সংস্করণ কার্টোস্যাট ৩। এই উপগ্রহকে বসানো হবে পৃথিবীর ৫০৯ কিলোমিটার কক্ষপথে, ৯৭.৫ ডিগ্রি কৌণিক অবস্থানে। একই সঙ্গে আমেরিকার ১৩টি কৃত্রিম উপগ্রহকে পাঠানো হবে ‘সান সিনক্রোনাস অরবিট (SSO)’-এ। আমেরিকার সঙ্গে ভারতের ‘নিউস্পেস ইন্ডিয়া লিমিটেড’(NSIL) চুক্তির ভিত্তিতেই এই কৃত্রিম উপগ্রহগুলি মহাকাশে পাঠাবে ইসরো।
https://twitter.com/isro/status/1199168427316805632
এখন দেখে নেওযা যাক কেন এই কার্টোস্যাট ৩ মিশনকে নিয়ে এত উৎকণ্ঠা ইসরোর। এই নজরদারি উপগ্রহের কাজ যেমন আবহাওয়ার গতিপ্রকৃতির হাল হকিকত জানানো, তেমনই দেশের প্রতিরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে চলেছে কার্টোস্যাট ৩। ইসরোর চেয়ারম্যান কে শিভন বলেছেন, ‘‘দেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আরও মজবুত করতেই কার্টোস্যাট সিরিজের এই উন্নত সংযোজন। ভারতীয় সেনাবাহিনীর কাছে শত্রুঘাঁটির গোপন খবর পৌঁছে দেবে এই উপগ্রহ। কড়া নজরদারি চালাবে সীমান্তেও।’’
কার্টোস্যাট ৩ উপগ্রহের বিশেষত্ব কী?
১৫০০ কিলোগ্রাম ওজনের কার্টোস্যাট ৩ অত্যাধুনিক স্যাটেলাইট। ইসরো চেয়ারম্যান কে শিভন জানিয়েছেন, কার্টোস্যাটের পুরনো সিরিজের উপগ্রহের ক্যামেরার রেজোলিউশন ছিল ০.৫ মিটার বা ৫০ সেন্টিমিটার। এ বার যা করা হয়েছে ০.২৫ মিটার বা ২৫ সেন্টিমিটার। যার অর্থ, এত দিন ৫০ সেন্টিমিটারের চেয়ে ছোট আকারের কোনও পদার্থকে মহাকাশ থেকে নিখুঁত ভাবে দেখতে পারত না কার্টোস্যাটের পুরনো সিরিজের উপগ্রহের ক্যামেরা। এ বার কার্টোস্যাটের নতুন সিরিজের উপগ্রহ কার্টোস্যাট-৩-এর ক্যামেরা ২৫ সেন্টিমিটার আকারের পদার্থকেও মহাকাশ থেকে ভাল ভাবে দেখতে পারবে।

৭১২ কেজির কার্টোস্যাট-২ ছিল মূলত রিমোট-সেন্সিং স্যাটেলাইট। পৃথিবীকে নিরীক্ষণ করার জন্যই পাঠানো হয়েছিল এই উপগ্রহ। কার্টোস্যাট ৩ আরও উন্নতমানের। এর হাই রেজোলিউশন লেন্সে বন্দি হবে সূক্ষাতিসূক্ষ বস্তু । পিএসএলভি-সি৪৭ (এক্সএল কনফিগারেশন) রকেটের পিঠে চাপিয়েই কার্টোস্যাট ৩ উপগ্রহকে পাঠানো হবে পৃথিবীর কক্ষপথে।
দেশের প্রতিরক্ষার অন্যতম অস্ত্র হয়ে উঠবে ইসরোর কার্টোস্যাট ৩
দেশের প্রতিরক্ষা আঁটোসাঁটো করতে এর আগেও সামরিক উপগ্রহ মহাকাশে পাঠিয়েছিল ইসরো। রিস্যাটের পুরনো সিরিজের উপগ্রহের পাঠানো ছবি ও তথ্যের ভিত্তিতেই ২০১৬ সালে হয়েছিল সার্জিক্যাল স্ট্রাইক। পুলওয়ামার জবাব দিতে বালাকোটে যে এয়ারস্ট্রাইক চালিয়েছিল ভারত সেটাও রিস্যাটের পাঠানো ছবি ও তথ্যের ভিত্তিতেই। বালাকোটে গজিয়ে ওঠা জইশ-ই-মহম্মদের জঙ্গি প্রশিক্ষণ শিবির চিহ্নিত করে ভারতীয় সেনার হাতে তথ্য তুলে দিয়েছিল রিস্যাট সিরিজের উপগ্রহ।

ইসরো জানিয়েছে, কার্টোস্যাট ৩ উপগ্রহের কাজ হবে সীমান্তে কড়া নজরদারি রাখা। নিয়ন্ত্রণরেখার ওপারে আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র ও ইজরায়েলি বোমা নিয়ে দেশে অনুপ্রবেশের চেষ্টা চালাচ্ছে জইশ, লস্করের মতো পাক মদতপুষ্ট একাধিক জঙ্গি সংগঠন। তাদের প্রতি মুহূর্তের গতিবিধি ভারতের সেনার হাতে তুলে দেবে এই উপগ্রহ।
কার্টোস্যাটের হাই রেজোলিউশন ক্যামেরা যেহেতু ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বস্তুকেও নজরে আনতে পারে, তাই শত্রুপক্ষের সেনাঘাঁটি বা জঙ্গিদের গোপন ঘাঁটিগুলির উপর মহাকাশ থেকে নিখুঁত ভাবে নজরদারি চালাতে পারবে কার্টোস্যাট ৩। এর ক্যামেরায় ধরা পড়বে জঙ্গিদের বন্দুক, বাঙ্কারও। গাছপালার আড়ালে লুকিয়ে থাকা শত্রুদের গোপন সুড়ঙ্গও চিহ্নিত করবে এই উপগ্রহ।