চৈতালী চক্রবর্তী
দপদপ করছে। ছটফট করছে। কী যেন একটা অস্বস্তি! জ্বালাপোড়া ধরেছে যেন সারা শরীরে। মহাকাশের শিকারির হাতে বিষম ব্যথা। টনটন করছে বাহুবন্ধ। খুলতেও পারছে না, আবার সইতেও পারছে না। কালপুরুষের সংসারে অশান্তির আগুন জ্বলেছে।
কালপুরুষ (Orion) নক্ষত্রমণ্ডলে একসময় একচেটিয়া রাজত্ব ছিল তার। আকারে যেমন বিশাল, উজ্জ্বলতায় হার মানাতে পারে সূর্যকেও। কালপুরুষের গর্ব তার উজ্জ্বল বাহুবন্ধ আজ কি ধ্বংসের পথে? বিজ্ঞানীরা বলছেন, অস্বাভাবিক আচরণ করছে
আলফা ওরিয়ন (Alpha Orion) বা কালপুরুষের আদ্রা নক্ষত্র। মহাকাশে তারাদের রাজত্বে আর্দ্রা নবম বৃহত্তম ও কালপুরুষের সংসারে দ্বিতীয় বৃহত্তম নক্ষত্র ছিল। এর উজ্জ্বলতা এতটাই বেশি যে খালি চোখেও আকাশে এই তারার মিটমিট চোখে পড়ে। তবে আদ্রার অবস্থা এখন খুবই খারাপ। এর উজ্জ্বলতা কমতে বসেছে, সেই সঙ্গে ছটফটানি বেড়েছে বহুগুণ। কখনও জ্বলে উঠছে, আবার পরক্ষণেই নিস্তেজ হয়ে পড়ছে।
ভিল্লানোভা ইউনিভার্সিটির জ্যোতির্বিজ্ঞানী এডওয়ার্ড গুইনান জানিয়েছেন, মহাকাশবিজ্ঞানের পাতায় আলফা ওরিয়নের নাম
বেটেলজিউস (Betelgeuse)। নিজের রিসার্চ পেপার
‘দ্য ফেন্টিং অব দ্য নিয়ার বাই সুপারজায়ান্ট বেটেলজিউস’-এ এডওয়ার্ড জানিয়েছেন, আলো কমছে এই নক্ষত্রের। অক্টোবরে শেষবার পর্যবেক্ষণে যা দেখা গিয়েছিল, ডিসেম্বরে তার চেয়েও আড়াই গুণ বেশি উজ্জ্বলতা হারিয়েছে আদ্রা। বিজ্ঞানীদের ধারণা, ধ্বংসের পথে ‘সুপারনোভা’ যেতে চলেছে এই নক্ষত্র।
কালপুরুষের অহঙ্কার, মহাকাশের লাল দানব আর্দ্রা এক বিস্ময়
ওরিয়ন বা কালপুরুষের তারা-সমষ্টির মধ্যে আলফা ওরিয়নের সংস্কৃত নাম ‘বাহু’। কালপুরুষের ডানদিকের কাঁধে জ্বলজ্বল করে এই তারা। এর আকার ও ঔজ্জ্বল্য এতটাই বেশি যে, পৃথিবী থেকে ৬০০ কোটি আলোকবর্ষের বেশি দূরে অবস্থিত এই তারাকে খালি চোখেই দেখা যায়। ইরানে পার্সিদের কাছে এর পরিচয় ছিল ‘বেসন’ নামে— যার অর্থ ‘বাহু’। ইউরোপে স্লোভেনদের (Sloven) কাছে এর নাম ছিল
‘বেটেলগেজা’ (Betelgeza)। আরব দুনিয়ায় তারাটি তিনটি নামে পরিচিত ছিল— আল ধিরা (Al Dhira) বা ‘বাহু’, আল মান্কির (Al Mankib), বা ‘স্কন্ধ’। আল ইয়দ আল ইয়ম্মা (Al Yad al Yamma), বা ডানহাত। জ্যোতির্বিজ্ঞানে এর পরিচিত নাম
Red Supergiant (স্পেকট্রাল টাইপ এম১-২)। সূর্যের থেকেও বহুগুণ বড় আদ্রা এক লহমায় গিলে খেতে পারে পৃথিবী, বুধ, শুক্র, মঙ্গল, শনি এমনকি বৃহস্পতির মত গ্রহকে।
মহাকাশে তারাদের সংসারে আদ্রা বেশ প্রবীণ নক্ষত্র। এই তারার বয়স নিয়ে জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মধ্যে বিতর্ক রয়েছে। কারও মতে আলফা ওরিয়নের বয়স প্রায় ৮৫ লক্ষ বছর। কারও মতে আরও বেশি। এত দীর্ঘ সময় ধরে এর উজ্জ্বলতায় ভাটা পড়েনি। ঠিক কবে থেকে আদ্রার ছটফটানি শুরু হয়েছে তা নিয়েও মতভেদ রয়েছে। তবে এডওয়ার্ড জানিয়েছেন, গত কয়েকবছর ধরে ক্রমাগত এই নক্ষত্রের হাবভাবে কড়া নজর রেখে দেখা গেছে, আলোক বিচ্ছুরণের তারতম্য হচ্ছে আদ্রার।
নক্ষত্রের মৃত্যু বা সুপারনোভার (Suprenova) যেটা আগাম ইঙ্গিত হতে পারে।
আদ্রায় বিস্ফোরণ হলে ছিন্নভিন্ন হতে পারে পৃথিবীর ওজন স্তর
সূর্যের চেয়ে আড়েবহরে বড় হলেও আদ্রার কিন্তু আগ্রাসী মনোভাব নেই। বেশি শান্তশিষ্ট নক্ষত্র হিসেবেই পরিচিত আলফা ওরিয়ন বা আদ্রা। সূর্যের পৃষ্ঠদেশের তাপমাত্রা যেখানে ৫৮০০ কেলভিন, আদ্রার পৃষ্ঠতলের তাপমাত্রা ৩১০০ কেলভিনের কাছাকাছি। বিজ্ঞানীদের ধারণা, এই নক্ষত্রের কেন্দ্রে হিলিয়ামের দহন চলছে অবিরত। একে ঘিরে রয়েছে গ্যাসের বলয়। এই তারার বর্ণমণ্ডলও কম বিস্ময়কর নয়। এর প্রান্তবর্তী অঞ্চলে গ্যাসের উষ্ণতা ২৬০০ কেলভিনের মতো। আবার তার পাশ দিয়েই বয়ে চলেছে ১৫০০ কেলভিন উষ্ণতার অপেক্ষাকৃত শীতল বায়ুস্রোত। এমন ঘটনা খুব কমই দেখা যায়।
জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা বলছেন, আদ্রার অস্বাভাবিক আচরণের কারণ হতে পারে এটি ক্রমশ মৃত্যুর দিকে এগোচ্ছে। অর্থাৎ বিকট বিস্ফোরণ হতে পারে আলফা ওরিয়নে। তবে সেই সম্ভাবনা এখনই হয়তো নেই। এই বিস্ফোরণ শুরু হলে তা শেষ হতেও বহু সময় লাগবে। এডওয়ার্ডের কথায়, ৩-৪ মাস ধরে নীল আলোর শিখা দেখা যাবে আর্দ্রায়। এই আলো মেলাতে এক বছরের বেশি সময় লাগবে। বিস্ফোরণের ফলে নির্গত আলো এতটাই তীব্র হবে যে দিনের বেলা খালি চোখেও তারার মৃত্যু দেখা যাবে।
আমেরিকান অ্যাসোসিয়েশন অব ভ্যারিয়েবল স্টার অজারভার্স (AAVSO)-এর বিজ্ঞানীরা বলছেন, আলফা ওরিয়নের দূরত্ব পৃথিবী থেকে বেশি নয়। এতে বিস্ফোরণ শুরু হলে যে অতিবেগুনী রশ্মি নির্গত হবে সেটা পৃথিবীর জন্যও মোটেও স্বস্তির হবে না। এমনকি পৃথিবীকে আগলে রাখা ওজন স্তরও ছিন্নভিন্ন করতে পারে এই বিস্ফোরণে নির্গত রশ্মিগুলি।
অসুস্থ আলফা ওরিয়ন, বিজ্ঞানীরা আভাস দিয়েছিলেন অনেক আগেই
২০০০ সালের একটি গবেষণায় বিজ্ঞানীরা বলেছিলেন, আকারে-আয়তনে ক্রমশ কমছে আলফা ওরিয়ন।
ইনফ্রারেড স্পেশিয়াল ইন্টারফেরোমিটারে (ISI) পরিমাপ করে দেখা গিয়েছিল ১৫ শতাংশ আকারে কমেছে এই নক্ষত্র। ২০০৯ সালে আদ্রার ছবি সামনে এনে
ইউরোপিয়ান সাদার্ন অবজারভেটরি দাবি করে, উজ্জ্বলতা ক্রমশই কমছে আর্দ্রার। সেই সঙ্গে কমছে এর ভর। এই তারার কেন্দ্রে এখন হিলিয়ামের দহন চলছে। তাপমাত্রা যখন ৬০ কোটি কেলভিনে পৌঁছবে তখন শুরু হবে কার্বনের দহন। এই পর্যায় চলবে প্রায় ৬০০ বছর ধরে। এরপরে পুড়তে শুরু করবে নিয়ন এবং তৈরি হবে ম্যাগনেসিয়াম ও অক্সিজেন। ধীরে ধীরে কেন্দ্রের তাপমাত্রা পৌঁছে যাবে প্রায় ১৫০ কোটি কেলভিনে। তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই পুড়তে শুরু করবে অক্সিজেন, তৈরি হবে সিলিকন ও হিলিয়াম। তাপমাত্রা আরও বেড়ে ২৭০ কোটি কেলভিনে পৌঁছলে সিলিকন পুড়ে তৈরি হবে নিকেল, যা পরবর্তীকালে লোহায় পরিণত হবে। বাড়বে অভিকর্ষজ চাপ। মৃত্যুর আরও কাছাকাছি পৌঁছবে আদ্রা।
ইউরোপের বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই প্রক্রিয়া হয়ত শুরু হবে আগামী ১ লক্ষ থেকে ২ লক্ষ বছর পরে। আবার হয়তো বা খুব তাড়াতাড়ি। কে বলতে পারে!