
শেষ আপডেট: 12 November 2019 18:30
এখন মন্দির নগরী অযোধ্যা মসজিদেরও। সুপ্রিম কোর্টের রায়ে সমাধান পেয়েছে অযোধ্যা। এই সমাধান গোটা দেশের কাছে। কিন্তু অযোধ্যার যেন এই রায় নিয়ে কিছুই যায় আসে না। এই যে এত সাজ তা কিন্তু আদৌ রায়ের জন্য নয়। নিজের জন্যই সাজতে জানে। আসলে সাড়াটা বছর হাজার পরব নিয়ে কাটাতে হয় এই ধর্মনগরীকে। আষাঢ়ে রথ, ভাদ্রে লক্ষ্মীজির মেলা, আশ্বিনে নবরাত্রি, রামলীলা, মাঘীপূর্ণিমা, হোলি, শিবরাত্রি, রামনবমী, সীতাষ্টমী অনেক অনেক পরব পালনের ভার রয়েছে অযোধ্যার। আর তাই নিয়েই বারোটা মাস সেজে থাকে সে।
এই মঙ্গলবারই ছিল কার্তিক পূর্ণিমা। অগনিত ভক্ত এসেছেন সরযূ নদীতে ডুব দিতে। এটাই পরম্পরা। প্রতি পূর্ণিমাতেই ভিড় জমে অযোধ্যায়। পুণ্যস্নানের ভিড়। অনেক আন্দোলনের ভিড় সওয়া অযোধ্যার কাছে সে সব অবশ্য নস্যি। এই তো রায় বের হওয়ার দু’দিন আগে ছিল পঞ্চকোশি পরিক্রমা। এক কোশ মানে তিন কিলোমিটার। পঞ্চকোশি মানে ১৫ কিলোমিটার। কার্তিকের শুক্লা একাদশীর দিনে পঞ্চকোশির আগে নবমীতে ছিল চোদ্দকোশি পরিক্রমা। অযোধ্যা শহর ঘিরে রয়েছে পরিক্রমা মার্গ। সেই পথ উপচে যায় ভক্তদের ভিড়ে। রাম নাম করতে করতে পরিক্রমায় যোগ দেন ভক্তরা।
মঙ্গলবার একটু বেশি রাতেই পৌঁছেছি অযোধ্যায়। লখনৌ থেকে ফৈজাবাদ যাওয়ার বাসে উঠে থেকে মনে নানা আশঙ্কা তৈরি হচ্ছিল। এখনও তো ১৪৪ ধারা লাগু রয়েছে। কঠোর নিরাপত্তায় মোড়া অযোধ্যা। এত রাতে কত না ঝক্কি সামলাতে হবে। কিন্তু না। অযোধ্যার চৌকাঠ দূর থেকে যতটা কঠিন মনে হয়েছে কাছে এসে দেখি ততটা কিছুই নয়। সামান্য পুছতাছের পরেই পার হওয়া গেল। আসলে এই শহরকে নিত্যদিন স্বাগত জানাতে হয় অগণিত ভক্তকে, পর্যটককে। বেশি কড়াকড়ি হলে চলবে কেন! কেউ আসেন ইতিহাসের টানে, কেউ ধর্মের টানে। আবার ধর্মও একটা নয়। এই শহরে সব ধর্মেরই কিছু না কিছু আকর্ষণ রয়েছে। বাকি ক’টা দিনে সেই সব নিদর্শন দেখব এবং দেখাবও। আজ বরং, শুধু অযোধ্যা নগরীর কথাই হোক।
অযোধ্যায় ঢোকা নিয়ে আশঙ্কা অবশ্য দূর হয়ে গিয়েছিল পথেই। সহযাত্রীদের কথায়। আর সেই কথার মধ্যেই অযোধ্যা দর্শন হয়ে যায়। অযোধ্যা ঢোকার আগেই অযোধ্যা দর্শন। পরিচয় হল এক বাবা ও ছেলের সঙ্গে। ছেলের নাম অযোধ্যা গুপ্তা। জন্ম ৬ ডিসেম্বর, ১৯৯২।
বাবা অশোক গুপ্তার কাছে শোনা গেল ছেলের জন্মকাহিনী। রামভক্ত অশোক সে বার করসেবায় গিয়েছিলেন। প্রসূতি স্ত্রীকে ঘরে রেখে। তখন তো আর টেলিফোনের যুগ নয়। জানতেও পারেননি পুত্রসন্তান হয়েছে। সে বার তো অযোধ্যায় হুলুস্থূল কাণ্ড। সে সবের পরে জেল খাটা। বাড়ি যখন ফিরলেন তখন ছেলের বয়স প্রায় পাঁচ মাস। আগে থেকেই বাড়ির লোকেরা নাম রেখে দেন অযোধ্যা। সেই ছেলেও এখন রামভক্ত। বাবা-বেটায় চলেছেন পুজো দিতে।
এটা কি সুপ্রিম কোর্টের রায়ের জন্য পুজো দেওয়া নাকি! অশোক গুপ্ত জানালেন, “অনেক লড়াই হয়েছে। আমি প্রথম থেকেই এই লড়াইয়ে ছিলাম। এখন তাই খুব আনন্দ হচ্ছে। তাই ভাবলাম যাই রামলালার দর্শন করে আসি।” একই রকম আনন্দ ছেলে অযোধ্যারও। নতুন প্রজন্মও কি একইরকম ভাবে মন্দির নিয়ে উল্লসিত? এমন কৌতূহল নিয়ে জানতে চাইলাম রক্ত-মাংসের অযোধ্যার কাছে, কেমন লাগছে নতুন করে মন্দির তৈরি হওয়ার খবরে? বাবার চেয়েও এক কাঠি এগিয়ে ছেলে। বলল, “মনে মনে মন্দির হয়েছে অনেক আগে। এবার সত্যিই হবে। সেই ছোট বেলা থেকে নতুন মন্দিরের ছবি দেখতে দেখতে সেটা মনে বসে গেছে। চোখ বুজলেই দেখতে পাই।“
আরও অনেক কথা হল। অনেক জানা হল অযোধ্যা সম্পর্কে। আর সেই সব শুনতে শুনতেই এসে গেল ফৈজাবাদ। সেখান থেকে অটোয় অযোধ্যা। এক সঙ্গে অনেকটা পথ হাঁটার মাঝে আবার দেখা হওয়ার কথা দিলেন অযোধ্যা ও অশোক। এক সঙ্গে প্রবেশ করলাম ইতিহাসের নগরীতে। ওরা রামলালার দর্শনে। আমি অযোধ্যাচরিতের খোঁজে।