দ্য ওয়াল ব্যুরো: সরকার গঠনের জন্য কতটা তাড়া ছিল, আর কতটাই বা টানটান দৌত্য চলেছে গত রাতে শুধু একটি তথ্যেই যেন পরিষ্কার। তা হল—মহারাষ্ট্রে রাষ্ট্রপতি শাসন প্রত্যাহার হল ভোর ৫ টা ৪৭ মিনিটে!
কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র সচিব অজয় কুমার ভাল্লা একটি তিন লাইনের বিজ্ঞপ্তি জারি করে বলেন, মাননীয় রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দ মহারাষ্ট্র থেকে রাষ্ট্রপতি শাসন প্রত্যাহার করে নিয়েছেন।

এখানে বলে রাখা প্রয়োজন যে, কোনও রাজ্য থেকে ৩৫৬ ধারা প্রত্যাহারের আগে সংশ্লিষ্ট রাজ্যের রাজ্যপালের সুপরিশ প্রয়োজন। তার পর কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক সেই সুপারিশ খতিয়ে দেখে রাষ্ট্রপতির কাছে তা পাঠায়। এ ক্ষেত্রে এই গোটা প্রক্রিয়াটাই যে শুক্রবার মধ্যরাতের পর থেকে হয়েছে তা স্পষ্ট। এও স্পষ্ট এ জন্য রাইসিনা পাহাড়ে রাষ্ট্রপতি ভবনের সচিবালয় গোটা রাত জেগে ছিল। রাষ্ট্রপতিকেও ভোর রাতে উঠে পড়তে হয়েছে ঘুম থেকে।
মহারাষ্ট্রে বিধানসভা ভোটের ফলাফল ঘোষণা হয়েছিল ২৪ অক্টোবর। কিন্তু তার পর তিন সপ্তাহ কেটে গেলেও কেউ সরকার গড়তে না পারায় ১২ নভেম্বর সেখানে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি হয়েছিল। এ দিন সেটাই প্রত্যাহার করে নিলেন রাষ্ট্রপতি।
অনেকের মতে, ভারতীয় রাজনীতিতে এই খেলা আসলে শিখিয়ে গিয়েছে কংগ্রেস। বিহারের রাজ্যপাল বুটা সিংহকে ব্যবহার করে মধ্যরাতে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করে দিয়েছিলেন সনিয়া-মনমোহন। সেদিন তাঁদের পদক্ষেপ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছিল সর্বভারতীয় রাজনীতিতে। সেই ট্রাডিশনই চলছে।
এর আগে যা হয়েছে...
মহা চমক মহারাষ্ট্রে! উদ্ধব নন, ভোর হতেই মুখ্যমন্ত্রী পদে শপথ নিলেন বিজেপি-র ফড়নবীশ, উপ মুখ্যমন্ত্রী পাওয়ারের ভাইপো
এ যেন মধ্যরাতের ক্যু! নইলে কাল রাত পর্যন্ত ঠিক ছিল মহারাষ্ট্রের পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে শপথ নেবেন শিবসেনা নেতা উদ্ধব ঠাকরে। মারাঠা মুলুকে কংগ্রেস, এনসিপি এবং শিবসেনার জোট সরকার হবে। আজ শনিবার দেশের সবকটি দৈনিক সংবাদপত্রে ঢালাও করে সেটাই প্রকাশিত হয়েছে।
কিন্তু চিত্রনাট্যের একদম শেষেই যেন ট্যুইস্ট লেখা ছিল! সাত সকালে দেখা গেল, মুম্বইয়ের রাজভবনে মুখ্যমন্ত্রী পদে শপথ নিচ্ছেন বিজেপি নেতা দেবেন্দ্র ফড়নবীশ। উপ মুখ্যমন্ত্রী পদে শপথ নিচ্ছেন এনসিপি নেতা তথা শরদ পাওয়ারের ভাইপো অজিত পওয়ার।
শুধু মহারাষ্ট্র নয়, গোটা দেশের কাছেই এ হল বড় চমক। কাল রাত পর্যন্ত যাঁরা জানতেন মহারাষ্ট্রে বিজেপি-কে বাদ দিয়েই সরকার গঠন হতে চলেছে, ঘুম থেকে উঠে তাঁরাই দেখলেন শপথ গ্রহণ করে ফেলেছেন ফড়নবীশ। আরও বিস্ময়, শরদ পাওয়ারকে নিয়ে। যে মানুষটা শুক্রবার সন্ধ্যায় সাংবাদিক বৈঠক করে ঘোষণা করেছিলেন, উদ্ধব ঠাকরেই মুখ্যমন্ত্রী হবেন, তাঁর দল রাতারাতি ভোল বদলে, ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে গত বিশ বছরের যাবতীয় ভাষণ বেমালুম ভুলে গিয়ে বিজেপি-র হাত ধরে ফেলল। শুধু তা নয়, কেউ কিছু জানতে পারার আগেই উপ মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে শপথও নিয়ে নিলেন পাওয়ারের ভাইপো অজিত পাওয়ার।
মুম্বইয়ের রাজভবনে এ দিন সকাল ৮ টা ৫ মিনিটে দেবেন্দ্র ফড়নবীশ ও অজিত পাওয়ারকে শপথ বাক্য পাঠ করান রাজ্যপাল ভগৎ সিংহ কোশিয়ারি।
তাৎপর্যপূর্ণ হল, মহারাষ্ট্রে রাষ্ট্রপতি শাসন চলছিল। এ দিন রাজভবনের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানের পর জানানো হয় যে, রাষ্ট্রপতি শাসন প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে।
শপথ অনুষ্ঠানের পর মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়নবীশ বলেন, মহারাষ্ট্রে সুশাসন দেওয়ার জন্য বিজেপি-কে মানুষ বিপুল ভাবে ভোট দিয়েছিলেন। জোট শরিক হিসাবে শিবসেনাও অনেক আসনে জিতেছিল। কিন্তু ভোটের পরই বেচাল শুরু করেছিল শিবসেনা। যা রাজ্যের পক্ষে শুভ ছিল না। মহারাষ্ট্রে খিচুড়ি সরকার চায় না মানুষ।
ফড়নবীশ ও অজিত পাওয়ারকে টুইট বার্তায় অভিনন্দন জানান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী অমিত শাহ।
এখন কৌতূহল হল, গত বারো ঘন্টায় কী খেলা হয়ে গেল তলায় তলায়?
কংগ্রেস নেতা অভিষেক মনু সিঙ্ঘভি বলেন, “সকালে ঘুম থেকে আমি তো ভেবেছিলাম ভুয়ো খবর। এখনও বিশ্বাস হচ্ছে না। এটা ঠিক যে সরকার গঠনের ব্যাপারে কংগ্রেস, এনসিপি, শিবসেনা অনেক সময় নিচ্ছিল”। এনসিপি প্রধানকে খোঁচা দিয়ে সিঙ্ঘভি বলেন, “তবে মানতেই হবে, পাওয়ার তুস্সি গ্রেট হো!”
অনেকের মতে, এই খেলা হঠাৎ করে হয়নি। গত মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে দেখা করেছিলেন শরদ পাওয়ার। সে দিনই তাঁদের মধ্যে আলোচনা হয়ে গিয়েছিল। এর পরেও কংগ্রেস ও শিবসেনার সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাওয়াটা ছিল শুধুই নাটক।
কিন্তু এনসিপি নেতা তারিক আনোয়ার বলেন, আমি তো শুনছি এটা অজিত পাওয়ারের খেলা। শরদ পাওয়ার জানতেনই না। দলের মধ্যে ক্যু করেছেন অজিত। এই ভয়ঙ্কর কাণ্ডটা কী করে হল, আমরাও বুঝতে পারছি না। আশা করছি, খুব শিগগিরই গোটা খেলাটা জেনে যাব।
এর আগে যা হয়েছে...
আমিই জানতাম না সরকার হচ্ছে, বিশ্বাস করুন: বললেন শরদ পাওয়ার
মহারাষ্ট্রে শেষমেশ কী খেলা হল তা এখনও স্পষ্ট নয়। শুধু যেটা স্পষ্ট তা হল, মুখ্যমন্ত্রী পদে শপথ নিয়েছেন বিজেপি-র দেবেন্দ্র ফড়নবীশ। আর উপ মুখ্যমন্ত্রী পদে শপথ নিয়েছেন এনসিপি নেতা অজিত পাওয়ার। মহারাষ্টের বিজেপি-এনসিপি জোট সরকার হচ্ছে।
কিন্তু শরদ পাওয়ার দাবি করলেন, বিজেপি-এনসিপি যে সরকার হচ্ছে সেটা তিনিই জানতেন না। শনিবার সকাল সাতটায় ঘুম থেকে উঠে তিনি জেনেছেন যে, একটু পরই শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান হতে চলেছে রাজভবনে।
পাওয়ার জানিয়েছেন, তিনি খুব শিগগির সাংবাদিক বৈঠক করবেন এ ব্যাপারে। শিবসেনা নেতা উদ্ধব ঠাকরের সঙ্গেও তাঁর কথা হয়েছে বলে জানান পাওয়ার। তিনি বলেন, উদ্ধবও তার পর সাংবাদিক সম্মেলন করে যা বলার বলবে।
শনিবার সকালে টুইট করে পাওয়ার লিখেছেন, “মহারাষ্ট্রে সরকার গঠনের ক্ষেত্রে বিজেপিকে সমর্থন করা অজিত পাওয়ারের একান্ত ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। এর সঙ্গে এনসিপির কোনও যোগ নেই। আমরা ওঁর এই সিদ্ধান্তকে কোনওভাবেই সমর্থন করছি না।”
পাওয়ার ঘনিষ্ঠদের দাবি, ভাইপো অজিত পাওয়ার শরদ পাওয়ারের বিরুদ্ধে দলের মধ্যে ক্যু করেছেন। তাতে পূর্ণ মদত যুগিয়ে গিয়েছে অমিত শাহ বাহিনী। একদিকে যখন কংগ্রেস ও শিবসেনার সঙ্গে জোট করে সরকার গঠনের জন্য এগিয়েছেন শরদ পাওয়ার তখন, তলায় তলায় অন্য খেলা খেলেছে বিজেপি।
এখন প্রশ্ন হল, এনসিপি-র সব বিধায়কের সমর্থন কি রয়েছে অজিত পাওয়ারের সঙ্গে। মহারাষ্ট্রে সরকার গঠনের জন্য ১৪৫ জন বিধায়কের সমর্থন প্রয়োজন। বিজেপি-র ১০৫ টি আসনে জিতেছে এ বার। আরও চল্লিশ বিধায়কের সমর্থন তাদের প্রয়োজন। অন্য দিকে এনসিপি ৫৪ টি আসনে জিতেছে। অজিত পাওয়ার যদি এনসিপি দলেই ভাঙন ধরাতে চান, তা হলে অন্তত দলের দুই তৃতীয়াংশ তথা ৩৬ জন বিধায়ক তাঁর সঙ্গে থাকা দরকার। ফলে অনেকের মতে, নাটকের এখনও শেষ হয়নি। কোথাকার জল এখন কোথায় গড়ায় সেটাই দেখার।
এর আগে যা হয়েছে...
অজিত পাওয়ার ছুরি মেরেছে পিছন থেকে, এটা বেইমানি: শিবসেনা
এমন আঘাতের জন্য নিশ্চয়ই প্রস্তুত ছিল না মাতুশ্রী! ঘটনার প্রাথমিক অভিঘাত সামলে শনিবার প্রথম প্রতিক্রিয়াতেই ঝলসে উঠতে চাইলেন শিব সৈনিকরা। বললেন, এ হল বেইমানি! বিশ্বাসঘাতকতা!
শুক্রবার সন্ধ্যায় উদ্ধব ঠাকরেকে পাশে নিয়ে এনসিপি সুপ্রিমো শরদ পাওয়ার যখন ঘোষণা মহারাষ্ট্রে কংগ্রেস, শিবসেনা ও তাঁদের সরকার হচ্ছে, তার পর থেকেই বাল সাহেব ঠাকরের বাসভবন মাতুশ্রীর বাইরে বাজি ফেটেছে। দু’দশকেরও বেশি সময়ে খরা কাটিয়ে মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রীর তখত দখল করতে চলেছেন তাঁরা। মুখ্যমন্ত্রী হবেন বালাসাহেব পুত্র উদ্ধব!
কিন্তু সকালে উঠেই যেন দুঃস্বপ্ন দেখেছে শিবসেনা! ঘুমের ঘোর কাটার আগেই রাজভবনে শপথ নিয়ে ফেলেছেন বিজেপি-র দেবেন্দ্র ফড়নবীশ। সেই সঙ্গে উপ মুখ্যমন্ত্রী পদে শপথ নিয়েছেন এনসিপি নেতা তথা শরদ পাওয়ারের ভাইপো অজিত পাওয়ার।
এ ব্যাপারে সংবাদমাধ্যমের প্রশ্নের জবাবে শিবসেনা মুখপাত্র সঞ্জয় রাউত বলেন, “গত কুড়ি দিনের বেশি সময় ধরে সরকার গঠন নিয়ে আলোচনা চলছে এনসিপি-র সঙ্গে। অজিত পাওয়ারও সেই আলোচনায় সামিল ছিলেন। তার পর অজিত পাওয়ার যা করলেন তা হল পিছন থেকে ছুরি মারা। মহারাষ্ট্রের মানুষের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করলেন অজিত”।
জানা গিয়েছে, খুব শিগগির সাংবাদিক বৈঠক করবেন উদ্ধব ঠাকরেও। এ ভাবে সরকার গঠনের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থও হতে পারে শিবসেনা। কারণ, মহারাষ্ট্রে রাষ্ট্রপতি শাসন চলছিল। তা কখন প্রত্যাহার হল, কখনই বা সরকার গঠনের জন্য রাজ্যপাল ভগৎ সিংহ কোশিয়াড়ি দেবেন্দ্র ফড়নবীশকে আমন্ত্রণ জানালেন, আর তার আগে কখনই বা দেবেন্দ্র ফড়নবীশ ও অজিত পাওয়ার রাজভবনে গিয়ে বললেন, তাঁদের কাছে সংখ্যার তাকত রয়েছে তার কোনওটাই স্পষ্ট নয়। শিবসেনার কথায়, এ হল গণতন্ত্রের কালো দিন। কেন্দ্রে সরকারে থাকার সুবাদে মোদী-অমিত শাহ যা নয় তাই করছে। বেশি দিন তা ধর্মে সইবে না।
এখানেই থামেননি শিবসেনা মুখপাত্র। তিনি বলেন, অজিত পাওয়ার যা দুর্নীতিপরায়ণ, তাতে ওঁর জায়গা হওয়া উচিত আর্থার জেলে। তা হলে কি এ বার আর্থার জেলে মহারাষ্ট্রের মন্ত্রিসভার বৈঠক হবে? অজিত পাওয়ার আর বিজেপি-কে পাপ কি সওদাগর বলেও সমালোচনা করেন এই শিবসেনা নেতা। সেই সঙ্গে বলেন, মাঝ রাতে যা হয় তা সব সময়েই অশুভ। এই পাপেরও বিনাশ হবে শিগগির।