দ্য ওয়াল ব্যুরো: ছ’মাস ধরে মোস্ট ওয়ান্টেড জঙ্গি রিয়াজ নাইকুর পিছনে ছায়ার মত লেগে ছিল জম্মু ও কাশ্মীর পুলিশের একটি দল। রিয়াজের প্রতিটি পদক্ষেপ, গতিবিধির খুঁটিনাটিতে নজর ছিল তাদের। কারণ এর আগে বেশ কয়েকবার একদম শেষ মুহূর্তে হাতছাড়া হয়েছিল নাইকু। তবে এবারের অভিযান আর ব্যর্থ হতে দেননি নিরাপত্তারক্ষীরা। বুধবার দক্ষিণ কাশ্মীরের পুলওয়ামা জেলার বেইঘপোরায় নিজের গ্রামেই এনকাউন্টারে খতম হয়েছে হিজবুল মুজাহিদিনের কুখ্যাত কম্যান্ডার রিয়াজ নাইকু।
জম্মু ও কাশ্মীর পুলিশের ডিজি দিলবাগ সিং জানিয়েছেন, এর আগে যতবারই রিয়াজের কাছাকাছি পৌঁছনোর চেষ্টা করা হয়েছে, ততবারই অপারেশনের একদম শেষ মুহূর্তে পালিয়ে গিয়েছে সে। কোনওভাবেই তার নাগাল পাওয়া যায়নি। দিলবাগ সিং এও জানিয়েছেন, যে একাধিক গোপন ডেরা ছিল রিয়াজের, যেসব জায়গায় সে অনায়াসেই গা-ঢাকা দিত। নিজের এলাকায় অসংখ্য সুড়ঙ্গ খুঁড়ে এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে যাওয়ার রাস্তাও তৈরি করে রেখেছিল সে।
তবে এবারের অভিযানে আর কোনও ভুল হোক সেটা চাননি নিরাপত্তারক্ষীরা। এনকাউন্টারের আগের ১৫ দিন তাই দিবা-রাত্রি নাইকুর প্রতিটি পদক্ষেপের কড়া নজর রেখেছিল জম্মু-কাশ্মীর পুলিশের একটি টিম। এনকাউন্টারের মাত্র তিনদিন আগে খবর আসে যে বেইঘপোরায় নিজের গ্রামে যাবে রিয়াজ। ডিজি দিলবাগ সিংয়ের কথায়, “আমরা নাইকুর ঘনিষ্ঠ কয়েকজনের খোঁজ পেয়েছিলাম। যারা এই ক’দিনে নিয়মিত ভাবে ওর সঙ্গে যোগাযোগ রাখছিল। রিয়াজের খাবার পৌঁছে দেওয়া থেকে গোপন ডেরার ব্যবস্থাও করেছিল এদের মধ্যেই একজন।“ ওই ব্যক্তির থেকেই পুলিশ খবর পায় যে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় বেইঘপোরায় আসবে রিয়াজ।
এরপরেই ১০০ শতাংশ নিশ্চিত হয়ে রিয়াজ নাইকুকে খতম করার অভিযানে নামে ভারতীয় সেনাবাহিনী, সিআরপিএফ এবং জম্মু ও কাশ্মীর পুলিশ। তবে সেদিনের এনকাউন্টারের সময় নিরাপত্তাবাহিনীর গুলির জবাব সেভাবে দিতে পারেনি রিয়াজ, এমনটাই দাবি করেছেন দিলবাগ সিং। তাঁর কথায়, “এনকাউন্টার শুরুর কিছুক্ষণের মধ্যেই একে একে ঘায়েল হয় রিয়াজের সঙ্গীরা। তখনও অবশ্য গ্রামের এক বাড়ি থেকে আর এক বাড়িতে পালিয়ে বেড়াচ্ছিল রিয়াজ। তবে শেষ পর্যন্ত একটা বাড়ির ভিতরে ঢোকার পরেই ওকে ঘিরে ফেলা হয়। তখন অবশ্য জওয়ানদের উপর অনবরত গুলি চালাচ্ছিল রিয়াজ। তবে সেনাবাহিনীর সামনে সেসব ধোপে টেকেনি। রিয়াজকে যতটা খতরনাক হিসেবে আমরা চিনি ওর সেই আক্রমণাত্মক লড়াইয়ের মনোভাব সেদিন ছিল না।“
উপত্যকায় জঙ্গিদমনের ক্ষেত্রে রিয়াজ নাইকুর খতম হওয়া নিঃসন্দেহে নিরাপত্তাবাহিনীর কাছে বড় সাফল্য। দীর্ঘ ৮ বছর ধরে মোস্ট ওয়ান্টেড তালিকায় ছিল সে। ২০১২ সালে হিজবুল মুজাহিদিনে যোগ দেওয়ার পর সময় যত এগিয়েছে ততই ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছিল নাইকু। অঙ্কের শিক্ষক থেকে হিজবুলের কম্যান্ডার হয়ে ওঠা রিয়াজ নাইকুর মাথার দাম ছিল ১২ লাখ টাকা। তরুণ প্রজন্মকে জঙ্গি সংগঠনে যোগ দেওয়ানো থেকে শুরু করে হুমকি চিঠি পাঠানো, এইসব কুকর্মে তুখোড় ছিল রিয়াজ নাইকু। বছর ৩৫-এর এই হিজবুল কম্যান্ডার প্রযুক্তগত দিক থেকেও ছিল উন্নত। আর দক্ষিণ কাশ্মীরেই জন্ম হওয়ায় আঁটঘাট নখদর্পণে ছিল তার। তাই বার তিনেক ধরা পড়েও সেনার নাকের ডগা দিয়ে চম্পট দিয়েছিল সে।
তবে এবার আর ভাগ্য সহায় হয়নি এই কুখ্যাত জঙ্গির। দিলবাগ সিং জানিয়েছেন, দীর্ঘদিনের কঠোর পরিশ্রমের ফলেই শেষ পর্যন্ত খতম করা গিয়েছে তাকে। রিয়াজের গ্রামের একচিলতে অংশও তল্লাশি করতে বাকি রাখেননি নিরাপত্তারক্ষীরা। আর তাতেই ফাঁস হয় রিয়াজের পালিয়ে যাওয়ার দুটি গোপন রাস্তা। এর আগে বারবার এইসব সুড়ঙ্গের জন্যই অভিযান থেকে খালি হাতে ফিরতে হয়েছিল সেনাকে। তবে এবার আর পালাবার সুযোগ পায়নি রিয়াজ নাইকু। যদিও মঙ্গলবার এনকাউন্টার শুরুর আগে দিনভর তল্লাশির পরও বেইঘপোরায় রিয়াজের চিহ্ন মেলেনি। নিরাপত্তারক্ষীদের একটি দল ভেবেছিলেন এবারেও বোধহয় পালিয়েছে নাইকু। তবে এনকাউন্টার শুরু হতেই হিজবুল কম্যান্ডারের উপস্থিতি টের পাওয়া যায়। রিয়াজ যে গ্রামেই লুকিয়ে ছিল এ ব্যাপারে ১০০ শতাংশ নিশ্চিত ছিল কাশ্মীর পুলিশের একটি দল। দিলবাগ সিং নিজেও জানিয়েছেন যে নিজের অফিসারদের উপর তাঁর পূর্ণ আস্থা ছিল। আর রিয়াজের ঘনিষ্ঠরা যে পাকা খবরই দিয়েছিল তা প্রমাণ হয়ে যায় এনকাউন্টার শুরু হতেই।
দিলবাগ সিং জানিয়েছেন, “এবারের অভিযানের লক্ষ্য ছিল একটাই। রিয়াজকে না নিয়ে কোনওভাবেই ফেরা চলবে না। উপত্যকায় জঙ্গিদমনের ক্ষেত্রে রিয়াজকে খতম করাটা অত্যন্ত প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছিল। সেই কাজে আমরা সফল হয়েছিল। সাধারণ নাগরিক, পুলিশকর্মী, ভিনরাজ্যের শ্রমিকদের অপহরণ করে খুন করা ওই হত্যাকারী অবশেষে খতম হয়েছে।“ পুলিশের অনুমান রিয়াজ নাইকুর মৃত্যুতে জম্মু-কাশ্মীরে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে জঙ্গি সংগঠনে যোগ দেওয়ার এবার হয়তো কিছুটা হলেও কমবে।