দ্য ওয়াল ব্যুরো: ১৯৬৭ সালের পর চিনের তরফে এত ভয়ঙ্কর আগ্রাসন নাকি দেখা যায়নি। ভারতীয় জওয়ানদের খুঁজে খুঁজে মেরেছে চিনের পিপলস লিবারেশন আর্মি, এমনটাই জানাচ্ছেন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন জওয়ানরা। চিনা সেনার হাতে ছিল লোহার রড, কাঁটা লাগানো ব্যাট। খুনে মানসিকতা নিয়ে আক্রমণ চালিয়েছিল তারা।
এই ঘটনায় ১৬ নম্বর বিহার রেজিমেন্টের সবথেকে বেশি জওয়ান শহিদ হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে কর্নেল সন্তোষ বাবুও রয়েছেন। এখনও পর্যন্ত অন্তত ২৩ জনের প্রাণ গিয়েছে। লাদাখের মাইনাস তাপমাত্রা এই জওয়ানদের মৃত্যুর জন্য কিছুটা হলেও দায়ী বলে মনে করা হচ্ছে।
হাসপাতালে ভর্তি এক সেনা অফিসার জানাচ্ছেন, যাঁদের হতে অস্ত্র ছিল, তাঁরা চিনা সেনার আক্রমণ প্রতিরোধ করেছিলেন। কিন্তু অনেকের হাতেই অস্ত্র ছিল না। তাঁরা পালিয়ে পাথরের পিছনে আশ্রয় নেন। সেখান থেকে তাঁদের খুঁজে বের করে মারে পিপলস লিবারেশন আর্মি। অনেকে আবার প্রাণ বাঁচাতে গালওয়ান নদীতে ঝাঁপ মারেন।
সেনার আর এক আধিকারিক জানিয়েছেন, এখনও অন্তত ২৪ জন জওয়ান মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন। আরও অন্তত ১১০ জন জওয়ান আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি। ১৯৯৯ সালের পর শত্রুপক্ষের হতে এভাবে পর্যদুস্ত হতে হয়নি ভারতীয় সেনাকে।
কিন্তু কী ভাবে শুরু হয় এই সবকিছু? কেনই বা এভাবে হামলা চালালো চিন সেনা?
পূর্ব লাদাখের গালওয়ান ও শাইওক নদীর মোহনার কাছে ১৪ নম্বর পেট্রলিং পয়েন্টে সংঘাত হয় দুই দেশের সেনার। ভারত ওই অঞ্চলে কৌশলগত কারণে দুটি গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা নির্মাণ করছে। শাইওক নদীতে সেতু তৈরি করেছে। আর তার মাধ্যমে দারবুক শাইওক-দৌলত বেগ ওলদি রাস্তা সংস্কার করে মজবুত করেছে। এই রাস্তা কারাকোরাম পাসের দক্ষিণে শেষ আউটপোস্ট পর্যন্ত যাতায়াতের ব্যবস্থা করে দিয়েছে। তারই প্রতিবাদ করতে ১৪ পয়েন্টে তাঁবু গেড়েছিল চিনা সেনা। চিনা সেনা ১৫ নম্বর পেট্রলিং পয়েন্টেও তাঁবু গেড়েছিল। তার পাল্টা হিসাবে কয়েক গজ দূরে তাঁবু গেড়েছিল ভারতীয় সেনা। কিন্তু গত কয়েকদিন ধরে দুই দেশের সেনাবাহিনীর পদস্থ কর্তা স্তরে আলোচনার পর ওই তাঁবু সরিয়ে নেওয়ার কথা ছিল পিএলএ-র।
সোমবার রাতে ১৪ নম্বর পেট্রলিং পয়েন্টে চিনা সেনার তাঁবু সরাতে গিয়েছিলেন কর্নেল সন্তোষ বাবুর নেতৃত্বাধীন ১৬ নম্বর বিহার রেজিমেন্টের জওয়ানরা। তখনই প্রথমে উঁচু জায়গা থেকে পাথর ছুড়তে শুরু করে চিনা বাহিনী। তার পর লোহার রড, কাঁটা লাগানো ব্যাট নিয়ে মারতে নেমে পড়ে।
ভারতীয় জওয়ানদের মধ্যে যাঁদের হতে অস্ত্র ছিল, তাঁরা প্রতিরোধ করেন। কিন্তু চিনা সেনা সংখ্যায় অনেক বেশি থাকায় পেরে ওঠা সম্ভব হয়নি। ফলে অনেকেই লুকিয়ে পড়েন। তাঁদেরকে খুঁজে বের করে মারে পিপলস লিবারেশন আর্মি। মঙ্গলবার পিএলএ- র তরফে বেশি কিছু জওয়ানদের দেহ ভারতীয় সেনার হাতে তুলে দেওয়া হয়। হাতাহাতির মধ্যে তাঁরা চিনা এলাকায় চলে গিয়েছিলেন বলে জানা গিয়েছে।
অন্যদিকে চিনের অভিযোগ, কর্নেল সন্তোষ বাবুর নেতৃত্বে ভারতীয় সেনা বেআইনি ভাবে তাঁদের তাঁবু জ্বালিয়ে দেন। তারই প্রতিবাদে শুরু হয় লড়াই। চিনা সেনার কতজন নিহত হয়েছেন সে ব্যাপারে সরকারি ভাবে কিছু না বলা হলেও বেতারে আড়ি পেতে জানা গিয়েছে, অন্তত ৪৩ জন চিনা সেনা হতাহত হয়েছেন।
ভারতীয় সেনার দাবি, ওই এলাকা থেকে সেনা প্রত্যাহারের ব্যাপারে রাজি হয়ে ছিল দুদেশই। সেইমতো ভারত সেনা প্রত্যাহার করেও নেয়। কিন্তু পিপলস লিবারেশন আর্মি সরে যায়নি। সেই পরিস্থিতি তদারক করতে গিয়ে নিজেদের এলাকাতেই ছিল ভারতীয় জওয়ানরা। কিন্তু আচমকা হামলা চালায় চিনা সেনা। তার জন্য ভারত প্রস্তুত ছিল না। আর তাই এত বড় খেসারত দিতে হল।