দ্য ওয়াল ব্যুরো: মুম্বই সন্ত্রাসের ঘটনা মনে পড়ে! ২৬ নভেম্বর, ২০০৮। অভিশপ্ত সে রাতে সমুদ্র পথে এসে দশ জন লস্কর জঙ্গি অতর্কিতে হামলা চালিয়েছিল ভারতের বাণিজ্য নগরী। লস্কর জঙ্গিদের হামলায় প্রাণ হারিয়েছিলেন ১৬০ জনেরও বেশি নিরীহ মানুষ। পুলওয়ামার ঘটনার তুলনায় আড়েবহরে সেই হানা কম ছিল না।
একে তো লস্কর ই তৈবা ঘটনার দায় স্বীকার করেছিল। তা ছাড়া পাক গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের সরাসরি মদতের অকাট্য প্রমাণও ছিল নয়াদিল্লির হাতে। কিন্তু ইসলামাবাদকে কূটনৈতিক ভাবে কোণঠাসা করা ও পাকিস্তানের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা বন্ধ করে দেওয়ার অতিরিক্ত সে বার মনমোহন সিংহ সরকার কিছুই করেনি।
কিন্তু প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী করে দেখালেন।
পুলওয়ামার ঘটনার ঠিক পর দিনই মোদী ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, জঙ্গি হামলার কড়ায় গণ্ডায় জবাব দেবে নয়াদিল্লি। এ বার সেনাবাহিনীকে অনুমতিও দিয়ে দিয়েছেন। তার পর ১৩ দিনের মাথায় পাক অধিকৃত কাশ্মীরের বালাকোটে জইশ ই মহম্মদের অন্যতম ঘাঁটিই গুড়িয়ে দিল ভারতীয় বায়ুসেনা। যা দেখার পর কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধী থেকে শুরু করে তামাম বিরোধী নেতারাও এখন তারিফ করতে শুরু করেছেন বায়ুসেনার।
পর্যবেক্ষকরা তাই বলছেন, মনমোহন ও মোদীর মধ্যে তাই তুলনা তো হবেই। এবং স্বাভাবিক কারণেই সেই সুযোগ রাজনৈতিক ভাবে নিতে চাইবে বিজেপি।
বস্তুত, বালাকোটে বায়ুসেনা হানার পর মঙ্গলবারই রাজস্থানের চুরুতে সভা করে নিজেকে ‘মজবুত’ নেতা বলে তুলে ধরেন। এবং গলায় আবেগ ঢেলে নাটকীয় ভাবে বলেন, “সৌগন্ধ হ্যায় মেরে মিট্টি কি, ইয়ে দেশ নেহি মিটনে দেঙ্গে।” এও বলেন, “কোনও চিন্তা নেই, দেশ নিরাপদ হাতে রয়েছে।”
মুম্বইয়ে সন্ত্রাসবাদী হামলা যখন হয়েছিল, তার তিন মাস পরই লোকসভা ভোট ঘোষণা করেছিল জাতীয় নির্বাচন কমিশন। কম বেশি পরিস্থিতি ছিল এখনকার মতই। পিছনে হাঁটলে দেখা যাবে, ওই ভয়াবহ ঘটনার পর পরই আন্তর্জাতিক মহলে পাকিস্তানকে একঘরে করতে হই হই করে নেমে পড়েছিল নয়াদিল্লি। কংগ্রেস শীর্ষ সূত্রে তখনও জানা গিয়েছিল, এবং এখন ফের শোনা যাচ্ছে, পাকিস্তানের উপর প্রত্যাঘাতের জন্য সেই সময়েও দাবি উঠেছিল মন্ত্রিসভার নিরাপত্তা বিষয়ক কমিটির বৈঠকে। তৎকালীন অর্থমন্ত্রী প্রণব মুখোপাধ্যায়, প্রতিরক্ষা মন্ত্রী এ কে অ্যান্টনি দু’জনেই প্রত্যাঘাতের পক্ষে ছিলেন বলে জানা গিয়েছিল সরকারের শীর্ষ সূত্রে। এ সব ব্যাপারে প্রণববাবু বরাবরই কট্টরপন্থী। অন্যদিকে এ কে অ্যান্টনির উপর সেনাবাহিনীর চাপ ছিল প্রত্যাঘাতের। এবং দু’জনেরই বক্তব্য ছিল, পাকিস্তানের সীমান্ত পেরিয়ে জঙ্গি ঘাঁটিগুলো গুড়িয়ে দেওয়া হল সময়ের দাবি।
কিন্তু মনমোহন-চিদম্বরমরা সেই দাবি মানতে চাননি। কংগ্রেস হাইকম্যান্ডেরও তাতে বিশেষ সায় ছিল না বলেই দলের অনেকের মত। কারণ, আর কিছু না। কংগ্রেসের সেই বরাবরের দ্বন্দ্ব। ভোটের আগে এ ধরনের কোনও হামলা করলে তাদের সংখ্যালঘু ভোট ব্যাঙ্কে কী প্রভাব পড়বে তা নিয়ে সমান্তরাল উদ্বেগ ছিল দলে। পরিবর্তে তাই স্থির হয়েছিল, সরাসরি কোনও আঘাত না হানলেও ক্রমাগত কূটনৈতিক চাপ বাড়ানো হবে পাকিস্তানের উপর। তা ছাড়া ধারাবাহিক ভাবে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কড়া দেবেন প্রণব মুখোপাধ্যায়, এ কে অ্যান্টনিরা। পরে অবশ্য প্রণববাবু মজা করে বলতেন, আমাকে কোনও গোলা বারুদ খরচ করতে হয়নি, কিছু শব্দ খরচ করতে হয়েছে মাত্র। তবে তাতে যে দেশের সবাইকে সন্তুষ্ট করা যায়নি, ঘরোয়া আলোচনা বহুবার তা দলের মধ্যে জানিয়েছিলেন তিনি।
বিপরীতে শুধু মোদী নন, সামগ্রিক ভাবে বিজেপি-র ঘরানাই কট্টরপন্থী। ফলে মোদী জমানায় পুলওয়ামার মতো ঘটনার পর সেনাবাহিনী যে চুপ থাকবে না, তা প্রত্যাশিতই ছিল। তা ছাড়া অজিত ডোভালরা মনে করেন, কূটনৈতিক দৌত্যে পাকিস্তানকে একঘরে করে সন্ত্রাসবাদের সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে না। কদিন বাদে যে কে সেই আচরণ করবে ইসলামাবাদ। জঙ্গি কার্যকলাপে মদত দেওয়াও বন্ধ হবে না। যেমন মুম্বই সন্ত্রাসের পর আন্তর্জাতিক স্তর থেকে চাপ তৈরি হলেও জইশ-লস্করদের মদত দেওয়া থামায়নি ইসলামাবাদ। ফলে প্রত্যাঘাতই সবক শেখানোর এক মাত্র পথ।
পর্যবেক্ষকদের একাংশের বক্তব্য, এটা ঠিক যে, লোকসভা ভোটের আগে পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি করা হতে পারে বলে বিরোধীদের অনেকেই আগে থেকে আশঙ্কা প্রকাশ করছিলেন। এমনকি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো বিরোধী নেত্রীরা এই প্রশ্নও তুলেছেন, আগাম গোয়েন্দা তথ্য থাকা সত্ত্বেও পুলওয়ামার ঘটনা কী ভাবে ঘটল সেটাই আশ্চর্যের। কিন্তু সে ক্ষেত্রে এই পাল্টা প্রশ্নও উঠতে পারে যে মুম্বই সন্ত্রাসের ঘটনার আগেও তো গোয়েন্দা তথ্য ছিল নয়াদিল্লির হাতে। তা হলে সে দিন তা ঠেকানো যায়নি কেন?
চুম্বকে বিজেপি-র এখন চেষ্টাই হবে যুক্তি দিয়ে এ সব প্রশ্ন লঘু করে দেওয়া। বরং তারা আরও বেশি করে তুলে ধরার চেষ্টা করবে, দেশের প্রয়োজন এক জন মজবুত নেতাকে। মজবুর নয়।