দ্য ওয়াল ব্যুরো: পূর্ব লাদাখে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখায় চিনের সঙ্গে যে সামরিক চাপানউতোর তৈরি হয়েছে তা নিয়ে মুখ খুললেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং। শনিবার একটি বৈদ্যুতিন মাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে রাজনাথ স্পষ্ট বলেন, ভারতের গর্বে আঘাত হানবে এমন কোনও কিছুকে সরকার বরদাস্ত করা হবে না। কিন্তু উত্তেজনা প্রশমনের জন্য চিনের সঙ্গে সেনা ও কূটনৈতিক স্তরে আলোচনা চলছে।
গত কয়েক সপ্তাহ ধরেই চিনের সঙ্গে ভারতের সংঘাতের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে পূর্ব লাদাখে। চিন যেমন সীমান্ত লাগোয়া অঞ্চলে সেনা মোতায়েন বাড়িয়েছে। নয়াদিল্লিও লাদাখে মোতায়েন করেছে অতিরিক্ত কয়েক হাজার সেনাকে। এমনকি সেনা প্রধান জেনারেল এমএম নারাবানে লে-তে গিয়ে পরিস্থিতি খতিয়ে দেখে একপ্রস্থ বৈঠকও সেরে ফেলেন। প্রধানমন্ত্রী বৈঠক করেন নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল এবং বিপিন রাওয়াতের সঙ্গে।
বেজিংয়ের সঙ্গে যখন নয়াদিল্লির সম্পর্কের পারদ চড়তে শুরু করেছে ঠিক তখনই কয়েকদিন আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, তিনি ভারত-চিনের মধ্যেকার দ্বন্দ্ব মীমাংসা করে দেবেন। মধ্যস্থতা করতে তিনি তৈরি। এ ব্যাপারে আগেই বিদেশমন্ত্রক ট্রাম্পের প্রস্তাব খারিজ করেছিল। শনিবার ওই সাক্ষাৎকারে রাজনাথ বলেন, "শুক্রবার আমার সঙ্গে মার্কিন প্রতিরক্ষাসচিব মার্ক টি এসপারের টেলিফোনে কথা হয়েছে। আমি তাঁকে বলেছি, সমস্যা সমাধানে ভারত এবং চিন সেনা ও কূটনৈতিক স্তরে কথোপকথন চালাচ্ছে।"
রাজনাথ আরও বলেছেন, "আমি দেশবাসীকে আশ্বস্ত করতে চাই, কোনও ভাবেই ভারতের গর্বে আঘাত হানবে এমন কিছুকে সরকার বরদাস্ত করবে না। প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার ব্যাপারে ভারতের স্বচ্ছ নীতি রয়েছে। এবং তা নতুন নয়, দীর্ঘদিনের।"
চিনের সঙ্গে সংঘাত এই প্রথম নয়। রাজনাথ সেই প্রসঙ্গও ব্যাখ্যা করেন। ২০১৭ সালে ডোকালামে যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল সে কথা স্মরণ করিয়ে দেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী। সেবার টানা ৬৯ দিন চিনা সেনা এবং ভারতীয় সেনারা চোখে চোখ রেখে দাঁড়িয়েছিলেন। রাজনাথ বলেন, "আমরা সে সময়ে পিছিয়ে আসিনি। একই সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমধানও করেছিলাম।"
প্রতিরক্ষামন্ত্রী আরও বলেন, "ভারত কখনওই চায় না যে, সীমান্তে উত্তেজনা বজায় থাকুক। নয়াদিল্লি সবসময় আশাবাদী কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমেই দ্বিপাক্ষিক সমস্যার সমাধান হবে।"
প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখায় চিনের পিপলস লিবারেশন আর্মি এবং ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর সংঘাত নতুন নয়। মাঝেমধ্যেই দু'-দেশের সেনারা বচসা, হাতাহাতিতে জড়িয়ে পড়েন। তারপর আবার কম্যান্ডর স্তরে বৈঠক করে তা মিটেও যায়।
কিন্তু এবার পরিস্থিতি ঘোরালো হয়। সরকারকে দেওয়া সেনাবাহিনীর রিপোর্ট থেকে জানা যায়, চিনের সেনারা ভারতীয় নিরাপত্তাবাহিনীর জওয়ানদের আটক করে রেখেছিল। কেড়ে নেওয়া হয়েছিল অস্ত্রও। পরে ছেড়ে দিলেও উত্তেজনা বাড়তে থাকে। তার মধ্যেই স্যাটেলাইটে চাঞ্চল্যকর ছবি দেখা যায়। উপগ্রহচিত্রে ধরা পড়ে, সীমান্তের ওপারে সামরিক প্রস্তুতি পুরোদমে শুরু করেছে বেজিং। বিমানঘাঁটি সাজাচ্ছে চিনের বায়ুসেনা। টারম্যাকে দাঁড় করিয়ে রেখেছে যুদ্ধবিমান। তা ছাড়া গালওয়ান উপত্যকায় চিনা সেনারা ক্যাম্প করেছে বলেও জানা যায়। এরই মধ্যে চিনের ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলিতে বক্তৃতা করতে গিয়ে চিনা প্রেসিডেন্ট তথা সিপিসি-র প্রধান শি চিনফিং সেনাবাহিনীকে বলেন' "অতিশয় খারাপ পরিস্থিতির জন্য তৈরি থাকতে হবে।" অনেকের মনেই প্রশ্ন ওঠে, কোভিডের কারণে আন্তর্জাতিক উঠোনে কোণঠাসা চিন কি তাহলে যুদ্ধজিগির তুলে নজর ঘোরাতে চাইছে? এর মধ্যেই পাল্টা একাধিক পদক্ষেপে নয়াদিল্লির তরফে বুঝিয়ে দেওয়া হয়, জমি ছাড়া হবে না। বেজিং যদি মনে করে উত্তেজনা বাড়াবে তাহলে চোখে চোখ রেখে লড়াই হবে। একতরফা কিছু হবে না।
তাৎপর্যপূর্ণ হল, তারপরই নয়াদিল্লি স্থিত চিনা দূতাবাসের প্রধান বিবৃতি দিয়ে বলেন, "দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক নষ্ট হোক এমন কিছু বেজিং চায় না। ড্রাগন আর হাতি হাত ধরাধরি করে নাচছে।" শনিবার প্রতিরক্ষামন্ত্রী স্পষ্ট করে দিলেন, ভারত সব কিছুর জন্য প্রস্তুত। কিন্তু নয়াদিল্লি চায় না উত্তেজনা বাড়ুক।