দ্য ওয়াল ব্যুরো: দেশে আর্থিক উদারিকরণ ও মুক্ত অর্থনীতির পথিকৃৎ বলা হয় তাঁকে। শনিবার মনমোহন সিং বোঝাতে চাইলেন, ভারতে অর্থনৈতিক সংস্কারের জনক হলেন প্রয়াত প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী নরসিংহ রাও।
রিজার্ভ ব্যাঙ্কের গভর্নর ছিলেন মনমোহন সিংহ। তাঁকে রাজনীতিতে নিয়ে এসে তাঁর সরকারের অর্থমন্ত্রী করেছিলেন নরসিংহ রাও। ১৯৯১ সালের ঐতিহাসিক ‘উদারবাদী বাজেট’ পেশ করেছিলেন এই জুটিই।
শুক্রবার তেলেঙ্গানা প্রদেশ কংগ্রেস কমিটির উদ্যোগে শুরু হয়েছে নরসিংহ রাওয়ের জন্মশতবর্ষ উদযাপন অনুষ্ঠান। চলবে এক বছর ধরে। ভার্চুয়াল বক্তৃতায় মনমোহন সেই অনুষ্ঠানেই বলেন, “এই মাটির মহান সন্তান ছিলেন নরসিংহ রাও। ভারতের অর্থনৈতিক সংস্কারের দিশা দেখিয়েছিলেন তিনি।”
প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তৃতায় বলেন, “সেই সময়ে অর্থনৈতিক সংস্কার একটি বলিষ্ঠ সিদ্ধান্ত ছিল। তা বাস্তবায়িত করতে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নরসিংহ রাও আমায় পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছিলেন। সেই সময়কার অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট বুঝেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন রাও। ভারতীয় অর্থনীতিকে নতুন পথ দেখিয়েছিলেন।”
রাওয়ের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে মনমোহন আরও বলেন “যে ভাবে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী দেশের গরিব মানুষের জন্য চিন্তা করতেন, একই কথা ভেবে নরসিংহ রাও নয়া ব্যবস্থার পথে হেঁটেছিলেন। আমাকে সাহস দিয়েছিলেন।”
নয়ের দশকের গোড়ায় সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর সারা পৃথিবীর রাজনৈতিক ভারসাম্যে যেমন বদল এসেছিল, একই ভাবে অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও আমূল বদলে যেতে শুরু করে। কার্যত একমুখী বিশ্ব অর্থনীতি গড়ে ওঠার পালা শুরু হয়। যার মূল শক্তির নাম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। সোভিয়েতের পতনের পর থেকে এশিয়া ও পূর্ব ইউরোপের অসংখ্য দেশ নয়া উদারবাদী অর্থনীতির পথে হাঁটতে শুরু করে।
সেই সময়ে অর্থনৈতিক সংস্কারের সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক ভাবে কতটা চ্যালেঞ্জের ছিল তাও উল্লেখ করেন মনমোহন। ইউপিএ এক ও দুই সরকারের প্রধানমন্ত্রী বলেন, “রাজনৈতিক প্রশ্নেও আর্থিক সংস্কারের সেই সিদ্ধান্ত ছিল চ্যালেঞ্জের। কারণ সেই সরকার ছিল সংখ্যালঘু (একক ভাবে কংগ্রেসের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল না)। বাইরের সমর্থন নিয়ে চলছিল সরকার। কিন্তু অন্য দলগুলিকে বুঝিয়ে, এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে অনন্য ভূমিকা নিয়েছিলেন রাও। আমি শুধু আমার কাজটুকু করেছিলাম।”
নোবেল জয়ী ফরাসি কবি ভিক্টর হুগোকে উদ্ধৃত করে মনমোহন বলেন, “পৃথিবীতে এমন কোনও শক্তি নেই যা আদর্শকে দমিয়ে দিতে পারে।” তিনি আরও বলেন, “সারা বিশ্বে সেই সময়ে যে নতুন অর্থনৈতিক যাত্রা শুরু হয়েছিল তাতে ভারতও ছিল জাগ্রত শক্তি। ৯১ থেকে এ পর্যন্ত যাত্রাপথ পেরোতেও অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে। সে দিক থেকে নরসিংহ রাও ভারতের অর্থনৈতিক সংস্কারের জনক।”
সোভিয়েত-মার্কিন শীতযুদ্ধের অবসানের পর ভারতের সংসদীয় গণতন্ত্রে বিরোধীদের যে জায়গা রাও দিয়েছিলেন তাও ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে বলে মন্তব্য করেন মনমোহন। তিনি বলেন, “প্রয়াত প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী সব সময়ে চাইতেন বিতর্ক হোক মুক্ত মনে। তাতে অংশগ্রহণ করুক বিরোধীরা। তিনি মনের গভীর থেকে এ কথা বিশ্বাস করতেন, বিরোধীদের সমালোচনাতেই পুষ্ট হয় গণতন্ত্র। যা সরকারকে আরও ভাল কাজ করতে সাহায্য করে। রাষ্ট্রপুঞ্জের মানবাধিকার পরিষদে ভারতের প্রতিনিধি দলে অটলবিহারী বাজপেয়ীকে পাঠানোর সিদ্ধান্ত প্রমাণ করে বিরোধীদের কতটা পরিসর দিতেন তিনি। যা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অপরিহার্য অংশ।”
পর্যবেক্ষকদের মতে, আসলে এই মন্তব্যের মধ্যে দিয়ে মনমোহন বর্তমান নরেন্দ্র মোদী সরকারেরই সমালোচনা করতে চেয়েছেন। বোঝাতে চেয়েছেন, বিতর্ক, বিরোধীদের সমালোচনা করার পরিসর দেওয়ার মাধ্যমে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার যে অনুশীলন হত সেটা এখন কার্যত তুলে দেওয়া হয়েছে। তা ছাড়াও প্রযুক্তি ও মহাকাশ গবেষণায় নরসিমা রাওয়ের আগ্রহ ও সেই সময়ের একের পর এক সরকারি সিদ্ধান্তের কথা উল্লেখ করেন মনমোহন।